তার ঠিক সামনে লাঠিতে ভর দিয়ে একটা খুব বুড়ো মানুষ দাঁড়িয়েছিল। প্রিন্সেস তাকেই জিজ্ঞাসা করল, তোমরা কথা বলছ না কেন? তোমরা যদি মনে কর যে আরো কিছু বেশি চাও তো সেটা বল! সবকিছু করতে আমি প্রস্তুত।
যেন এ কথায় তার রাগ হয়েছে এমনিভাবে মাথাটা আরো নিচু করে সে বিড়বিড় করে বলল, আমরা একমত হব কেন? ফসল আমরা চাই না।
কেন আমরা সবকিছু ত্যাগ করব? আমরা একমত নই। কেউ একমত হয়ো না…আপনার জন্য আমরা। দুঃখিত, কিন্তু আমরা অনিচ্ছুক। আপনি চলে যান, একাকি… ভিড়ের ভিতর থেকে নানা কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
ভিড়ের সবগুলি মুখে আর একবার একই ভাব ফুটে উঠল, যদিও এবার সে ভাব কৌতূহল বা কৃতজ্ঞতার নয়, সে ভাব ক্রুদ্ধ সংকল্পের।
বিষণ্ণ হাসি হেসে প্রিন্সেস মারি বলল, কিন্তু তোমরা আমার কথা বুঝতে পারনি। কেন তোমরা যেতে চাইছ না? আমি কথা দিচ্ছি, তোমাদের ঘর দেব, খাওয়াব, আর এখানে শত্রুরা তোমাদের ধ্বংস করবে….
কিন্তু ভিড়ের কণ্ঠস্বরে তার কণ্ঠস্বর ডুবে গেল।
আমরা ইচ্ছুক নই। তারাই আমাদের ধ্বংস করুক! আপনার ফসল আমরা নেব না। আমরা রাজি নই!
প্রিন্সেস মারি পুনরায় কোনো একজনের চোখে চোখ রাখতে চেষ্টা করল, কিন্তু ভিড়ের ভিতর থেকে একটা চোখও তার দিকে তাকাল না, সকলেই তার চোখকে এড়াতে চেষ্টা করছে। তার কীরকম অদ্ভুত লাগছে।
ভিড়ের ভিতর থেকে নানা কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে : হ্যাঁ, খুব চাল চেলেছে! ওর সঙ্গে গিয়ে দাসত্বের খাঁচায় ঢুকি আর কি! নিজেদের ঘরবাড়ি ভেঙে ক্রীতদাস হতে চল! আমি ঠিকই বলছি! উনি বলছেন, তোমাদের ফসল দেব, বটেই তো!
নত মস্তকে ভিড়কে পিছনে রেখে প্রিন্সেস মারি বাড়িতে ফিরে গেল। পরদিন সকালে যাত্রার জন্য ঘোড়া প্রস্তুত রাখতে দ্রোনকে হুকুম দিয়ে সে তার ঘরে ঢুকল, সেখানে একাকি ডুবে গেল নিজের চিন্তায়।
.
অধ্যায়-১২
সেদিন রাতে প্রিন্সেস মারি খোলা জানালার পাশে বসে অনেক সময় কাটিয়ে দিল। অনেক দূরের গ্রাম থেকে চাষীদের গলা কানে আসছে, কিন্তু তাদের কথা সে ভাবছে না। সে বুঝতে পেরেছে, যতই ভাবুক না কেন তাদের সে বুঝতে পারবে না। সে ভাবছে নিজের দুঃখের কথা। বর্তমান দুশ্চিন্তার ফলে সে দুঃখ যেন এখন অতীতের বস্তু হয়ে গেছে। এখন সেকথা মনে করে সে কাঁদতে পারে, প্রার্থনাও করতে পারে।
সূর্যাস্তের পরে বাতাস পড়ে গেছে। রাতটা শান্ত ও সতেজ মনে হচ্ছে। মাঝ রাতের দিকে দূরাগত কণ্ঠস্বর থেমে গেল, মোরগের ডাক ভেসে এল, লেবু গাছের আড়াল থেকে ভরা চাঁদ দেখা দিল, একটা শাদা শিশিরভেজা কুয়াশা সবে উঠতে শুরু করেছে, সমস্ত গ্রাম ও বাড়িটার উপর নেমে এসেছে একটা শান্ত স্তব্ধতা।
নিকট অতীতের ছবিগুলি-বাবার অসুখ ও শেষ মুহূর্তগুলি-একের পর এক স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল।
শোকাকুল আনন্দের সঙ্গে সেই সব ছবি সে দেখতে লাগল। শেষ ছবিটা তার মনকে আঘাত করল–আবার মৃত্যুর ছবি, মনে হল, রাতের এই কুয়াশাচ্ছন্ন স্তব্ধ মুহূর্তে কল্পনায়ও সে ছবি সে আঁকতে পারত না। ছবিগুলি এখন এত স্পষ্ট হয়ে তার কাছে দেখা দিল যে সেগুলিকে কখনো মনে হয় বর্তমানের, কখনো অতীতের, আবার কখনো ভবিষ্যতের।
প্রথম স্ট্রোকের মুহূর্তটা স্পষ্টভাবে তার মনে পড়ল। বল্ড হিলসের বাগানের পথ দিয়ে সকলে তাকে ধরাধরি করে নিয়ে আসছে, অসহায় জিভটা নেড়ে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে, পাকা ভুরু দুটি কুঁচকে গেছে, অস্বস্তি ও ভয়ের সঙ্গে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
সে ভাবতে লাগল, মৃত্যুর দিন বাবা আমাকে যেকথা বলেছিল সেইদিনও সেই কথাটাই বলতে চেয়েছিল। সেই কথাই সে বরাবর ভেবে এসেছে। সে-রাতে সে ঘুমোতে পারেনি, পা টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গিয়েছিল, দরোজার পাশে দাঁড়িয়ে কান পেতেছিল। যন্ত্রণাকাতর ক্লান্ত গলায় তিখনের সঙ্গে কথা বলছিল, বলছিল তাহলে কেন আমাকে ডাকল না? তিখনের বদলে আমাকে কেন ঘরে ঢুকতে দিল না? এই কথাটা প্রিন্সেস মারি অনেকবার ভেবেছে, এখনো ভাবল। তার মনের মধ্যে যে কথা ছিল তা তো এখন আর কাউকে বলতে পারবে না। যেকথা সে বলতে চেয়েছিল সে কথা বলবার মুহূর্তটি তো তার বা আমার জীবনে আর কোনোদিন আসবে না, তিখন পারেনি, কিন্তু আমি তো তার কথা শুনতে পারতাম, বুঝতে পারতাম। তাহলে কেন আমি ঘরে ঢুকলাম না? মৃত্যুর দিন যে কথা আমাকে বলেছিল, হয়তো সেইদিনই সেকথা আমাকে বলত। তিখনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দুবার সে আমার কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। সে আমাকে দেখতে চেয়েছিল, অথচ দরোজার বাইরে কত কাছে আমি দাঁড়িয়েছিলাম। মনে পড়ছে, লিজা সম্পর্কে বাবা এমনভাবে কথা বলছিল যেন সে বেঁচে আছে–সে যে মরে গেছে সে কথা বাবা ভুলেই গিয়েছিল–তিখন যখন মনে করিয়ে দিল যে লিজা বেঁচে নেই সে তখন চেঁচিয়ে বলেছিল, মূর্খ! তার খুব কষ্ট হয়েছিল। দয়োজার পিছন থেকে আমি শুনতে পেলাম একটা আর্তনাদ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে সে চেঁচিয়ে বলেছিল হা ঈশ্বর! কেন তখন ভিতরে গেলাম না? গেলে বাবা আমার কি করত? কি হারাতাম আমি? হয়তো বাবা সান্ত্বনা পেত, সেই কথাটা আমাকে বলত। সোনা আমার-বাবার সেই আদরের কথাটা উচ্চারণ করে প্রিন্সেস মারি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। চোখের জলে তার মন কিছুটা শান্ত হল। বাবার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। শিশুকাল থেকে যে মুখ সে চিনেছে, যে মুখ সে দেখেছে দূর থেকে সে-মুখ নয়, এ সেই ভীরু, দুর্বল মুখ যা সে সেইদিন প্রথম দেখেছিল খুব কাছে থেকে যেদিন তার কথাটা বুঝবার জন্য সে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিল বাবার মুখের উপর।
