সেগুলি চাষীদের দিয়ে দাও, যার যা দরকার সব নিক। দাদার নামে আমি তোমাকে অনুমতি দিলাম।
দ্রোন কিছু বলল না, গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল শুধু।
যথেষ্ট ফসল জমা থাকলে তা দিয়ে দাও। সব বিলিয়ে দাও। দাদার নামে আমি হুকুম দিলাম, তাদের বল, আমাদের যা কিছু আছে সবই তাদের। তাদের সবকিছু দিতেও আমাদের আপত্তি নেই। একথা তাদের বলে দাও।
প্রিন্সেস যখন কথাগুলি বলছে তখন দ্রোন একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
ঈশ্বরের দোহাই ছোটমা, আমাকে বরখাস্ত করুন! আমার কাছ থেকে সব চাবি নিয়ে নেবার হুকুম দিন। তেইশ বছর ধরে চাকরি করছি, কখনো কোনো অন্যায় করিনি। ঈশ্বরের দোহাই, আমাকে রখাস্ত করুন!
তার কাছে লোকটি কি চাইছে, কেনই বা সে বরখাস্ত হতে চাইছে, কিছুই প্রিন্সেস মারি বুঝতে পারল না। বলল, তার সেবায় সে কখনো সন্দেহ করেনি, তার জন্য এবং চাষীদের জন্য সবকিছু করতে সে প্রস্তুত।
১০.২ চাষীরা এসেছে
অধ্যায়–১১
একঘণ্টা পরে দুনিয়াশা এসে প্রিন্সেসকে জানাল, দ্রোন এসেছে, আর প্রিন্সেসের হুকুমে চাষীরা গোলাবাড়িতে এসে জমা হয়েছে, তারা প্রিন্সেসের সঙ্গে কথা বলতে চায়।
প্রিন্সেস মারি বলল, কিন্তু আমি তো তাদের আসতে বলিনি। শুধু দ্রোনকে তাদের ফসল দিতে বলেছি।
দুনিয়াশা বলল, ঈশ্বরের দোহাই, লক্ষ্মী প্রিন্সেস, তাদের চলে যেতে বলে দিন। তাদের সঙ্গে দেখা করবেন না। এসবই চালাকি। ইয়াকভ আলপাতিচ ফিরে এলেই আমরা এখান থকে চলে যাব।…দয়া করে যাবেন না…
কিসের চালাকি? প্রিন্সেস মারি অবাক হয়ে শুধাল।
আমি জানি এটা একটা চাল, ঈশ্বরের দোহাই, আমার কথা শুনুন। নার্সকেও জিজ্ঞাসা করুন। ওরা বলছে, আপনার হুকুমমতো ওরা বোচারভো ছেড়ে যাবে না।
তুমি ভুল করছ। আমি তাদের চলে যেতে বলিনি। দ্রোনুশকাকে ডাক।
দ্রোন এসে দুনিয়াশার কথাই সমর্থন করল, প্রিন্সেসের হুকুমেই চাষীরা এসেছে।
প্রিন্সেস বলল, কিন্তু আমি তো ওদের ডাকিনি। তুমি নিশ্চয় আমার কথা ভুল করে বলেছ। আমি শুধু তোমাকে বলেছি ওদের ফসল দিতে।
উত্তরে দ্রোন শুধু একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
বলল, আপনি হুকুম করলে ওরা চলে যাবে।
না, না, আমি বাইরে ওদের কাছে যাব, প্রিন্সেস মারি বলল। নার্স ও দুনিয়াশার বাধা সত্ত্বেও সে ফটকে চলে গেল। দ্রোন, দুনিয়াশা, নার্স ও মাইকেল আইভানভিচ তাকে অনুসরণ করল।
প্রিন্সেস মারি ভাবল, ওরা হয়তো ভেবেছে ফসল ঘুষ দিয়ে ওদের এখানে থাকতে বলে ফরাসিদের হাতে ছেড়ে দিয়ে আমি নিজে এখান থেকে চলে যাব। মস্কোর জমিদারিতে আমি ওদের জন্য মাসিক রেশন ও বাড়ির ব্যবস্থা করে দেব। আমি নিশ্চিত জানি আন্দ্রু থাকলে আরো বেশি করত। কথাগুলি ভাবতে ভাবতে গোধূলির আলোয় সে গোলাবাড়ির মাঠে দাঁড়ানো ভিড়ের মানুষগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।
লোকগুলি আরো কাছে এগিয়ে এসে তাড়াতাড়ি টুপি খুলে ফেলল। প্রিন্সেস মারি চোখ নামিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে গেল। বৃদ্ধ ও যুবকের কত বিচিত্র চোখ তার উপর নিবদ্ধ, আর কত বিচিত্র মুখ, একজন থেকে আর একজনকে আলাদা করা যায় না, তাই সে ঠিক করল সকলকে একসঙ্গে ডেকে কথা বলবে, কিন্তু কি যে বলবে তা জানে না। এবারও সে যে তার বাবার ও দাদার প্রতিনিধি এই চিন্তাই তাকে সাহস দিল, দৃঢ়তার সঙ্গে সে কথা বলতে শুরু করল।
সে চোখ তুলল না, বুকের মধ্যে একটা টিপ টিপ শব্দ হচ্ছে। বলতে লাগল তোমরা আসায় আমি খুব খুশি হয়েছি। দ্রোনুশকা আমাকে বলেছে, যুদ্ধ তোমাদের সর্বনাশ করেছে। সেটা আমাদের সকলেরই দুর্ভাগ্য, তোমাদের যথাসাধ্য সাহায্য করতে আমি কসুর করব না। এ স্থানটা বিপজ্জনক বলেই আমি নিজে চলে যাচ্ছি..শত্রু কাছে এসে পড়েছে…কারণ…বন্ধুগণ, আমি তোমাদের সবকিছু দিয়ে যাচ্ছি, আমাদের সব ফসল, যাতে তোমাদের কোনো অভাব না হয়। আর যদি তোমাদের কেউ বলে থাকে যে তোমাদের এখানে আটকে রাখার জন্য আমি এই ফসল দিচ্ছি–তো সেটা সত্য নয়। বরং আমি তোমাদের বলছি, সব মালপত্র নিয়ে তোমরা আমাদের মস্কোর নিকটবর্তী জমিদারিতে চলে যাও, কথা দিচ্ছি, সেখানে তোমাদের যাতে কোনো অভাব না হয় সেটা আমি দেখব। সেখানে তোমরা আহার ও বাসস্থান পাবে।
প্রিন্সেস থামল। ভিড়ের ভিতর থেকে শুধু দীর্ঘনিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।
সে বলতে লাগল, আমার নিজের পক্ষ থেকে একাজ করছি না, করছি আমার মৃত পিতা, আমার দাদা ও তার ছেলের পক্ষ হয়ে।
সে আবার থামল। কেউ নিস্তব্ধতা ভাঙল না।
সম্মুখের মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে সে তার বক্তব্য শেষ করল, এটা আমাদের সকলের দুর্ভাগ্য, সকলেই তা ভাগ করে নেব। আমার যা কিছু আছে সবই তোমাদের।
সকলের চোখ তার উপরেই নিবদ্ধ, সকলের মুখে একই ভাব। সেটা কৌতূহল, অনুরাগ, কৃতজ্ঞতা, না কি আশংকা ও অবিশ্বাস-সে পরিমাপ সে করতে পারল না, কিন্তু সকলের মুখে একই ভাবের প্রকাশ।
ভিড়ের পিছন থেকে একজন বলল, আপনার দানের জন্য আমরা খুবই কৃতজ্ঞ, কিন্তু জমিদারের ফসল আমরা নিতে পারব না।
কেন পারবে না? প্রিন্সেস শুধাল।
কেউ জবাব দিল না। ভিড়ের চারদিকে তাকিয়ে প্রিন্সেস মারি দেখল, যার চোখে সে চোখ রাখছে সেই চোখ নামিয়ে নিচ্ছে।
সে আবার শুধাল, কেন তোমরা নিতে চাও না?
কেউ জবাব দিল না।
নিস্তব্ধতা যেন প্রিন্সেসকে চেপে ধরছে, যে কোনো একজনের চোখে চোখ রাখতে সে চেষ্টা করল।
