মাদময়জেল বুরিয়ে বলল, তার সঙ্গে কথা বলেছি। সে আশা করছে, আমরা আগামীকাল যাত্রা করার জন্য তৈরি হতে পারব, কিন্তু আমি মনে করি এখানে থাকাই আমাদের পক্ষে ভালো। কারণ তুমিও নিশ্চয়। স্বীকার করবে চেরে মারি যে সৈন্যদের হাতে অথবা উচ্ছল চাষীদের হাতে পড়লে অবস্থা খুবই খারাপ হবে।
মাদময়জেল বুরিয়ে তার থলে থেকে জেনারেল রামু-র একখানা ইস্তাহার (সাধারণ রুশ কাগজে ছাপা নয়) বের করল। তাতে বলা হয়েছে, জনসাধারণ যেন তাদের বাড়িঘর ছেড়ে না যায়, ফরাসি কর্তৃপক্ষ তাদের রক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা করবে। ইস্তাহারখানা প্রিন্সেসের হাতে দিল।
বলল, আমি মনে করি সেনাপতির কাছে আবেদন করাটাই সবচাইতে ভালো, আমার নিশ্চিত ধারণা : তোমার প্রতি যোগ্য সম্মান দেখানো হবে।
প্রিন্সেস মারি কাগজটা পড়ল, চাপা কান্নার আবেগে তার মুখটা কাঁপতে লাগল।
কার কাছে এটা পেলে?
মাদময়জেল বুরিয়ে সলজ্জ ভঙ্গিতে জবাব দিল, আমার নাম শুনেই তারা হয়তো চিনতে পেরেছে যে আমি একজন ফরাসি।
প্রিন্সেস মারি ইস্তাহারটা হাতে নিয়ে জানালা থেকে উঠল, মান মুখে ঘর থেকে বেরিয়ে প্রিন্স আন্দ্রুর পড়ার ঘরে ঢুকল।
বলল, দুনিয়াশা, আলপাতিচ বা দ্রোনুশকা বা অন্য কাউকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। মাদময়জেল বুরিরে গলা শুনতে পেয়ে বলল, মাদময়জেল বুরিয়েকে বলে দাও সে যেন আমার কাছে না আসে। ফরাসিদের হাতে পড়বার ভয়ে আঁতকে উঠে বলল, আমাদের এক্ষুনি চলে যেতে হবে, এক্ষুনি!
প্রিন্স আন্দ্রু যদি শোনে যে আমি ফরাসিদের খপ্পরে পড়েছি! আমি, প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কির মেয়ে, জেনারেল রামুর কাছে আশ্রয়ভিক্ষা করেছি, তার অনুগ্রহ নিয়েছি। এই চিন্তা তাকে আতংকিত করে তুলল, সে শিউরে উঠল, লজ্জা পেল, আর ক্রোধ ও অহংকার এমনভাবে তার মাথায় চড়ে গেল যা আগে কখনো হয়নি। নানা দুঃখকর ও অসম্মানকর চিন্তা তার মাথায় বাসা বাধল। তারা, ঐ ফরাসিরা এই বাড়িতে বাস করবে : ম. ল জেনারেল রামু প্রিন্স আন্দ্রুর পড়ার ঘরটা দখল করবে, তার চিঠি ও কাগজপত্র পড়ে মজা করবে। মাদময়জেল বুরিয়ে তাকে সসম্মানে অভ্যর্থনা করবে। করুণা করে আমাকে একটা ছোেট ঘর দেওয়া হবে, সৈন্যরা বাবার ক্রুশ ও তারকা চুরি করার জন্য তার নতুন সমাধিকে তচনচ করবে, রুশদের উপর তাদের জয়লাভের কাহিনী শোনাবে, আমার দুঃখে সহানুভূতি দেখাবার ভান করবে।
উত্তেজনায় লাল হয়ে সে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল, কখনো মাইকেল আইভানভিচকে, কখনো তিখনকে বা দ্রোনকে ডেকে পাঠাতে লাগল। মাদময়জেল বুরিয়ের কথা কতটা ঠিক তা দুনিয়াশা বা অন্য দাসীরা কেউই বলতে পারল না। আলপাতিচ বাড়ি নেই, থানায় গেছে। স্থপতি মাইকেল আইভানভিচও ঘুম ঘুম চোখে এসে কিছুই বলতে পারল না। পুরনো খানসামা তিখনের চোখ দুটো বসে গেছে, মুখ শুকিয়ে গেছে, সে মুখে সান্ত্বনাবিহীন দুঃখের ছাপ। প্রিন্সেস মারির সব প্রশ্নের একটিমাত্র জবাবই সে দিতে পারল : হ্যাঁ প্রিন্সেস, আর ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
অবশেষে গ্রাম-প্রধান দ্রোন ঘরে ঢুকল। আভূমি নত হয়ে দরোজার পাশেই থেমে গেল।
প্রিন্সেস মারি হেঁটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল।
দ্রোনুশকা, আমাদের এই দুর্ভাগ্যের দিনে… সে আর বলতে পারল না।
দ্রোন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সবই ঈশ্বরের হাত।
কিছুক্ষণ দুইজনই চুপচাপ।
দ্রোনুশকা, আলপাতিচ কোথায় যেন গেছে, কোনো কথা জিজ্ঞাসা করার মতো কেউ নেই। তারা যে বলছে আমি এখন চলে যেতেও পারব না সে কথা কি ঠিক?
দ্রোন বলল, কেন যেতে পারবেন না ইয়োর এক্সেলেন্সি? নিশ্চয় যেতে পারবেন।
আমাকে বলছে যে পথে শত্রুর দিক থেকে বিপদ ঘটতে পারে। দেখ বন্ধু, আমি তো কিছুই করতে পারছি না। কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার কেউ নেই। আজ রাতে অথবা কাল ভোরেই আমি চলে যেতে চাই।
দ্রোন চুপ করে রইল। প্রিন্সেস মারির দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বলল, কোনো ঘোড়া পাওয়া যাচ্ছে না, সেকথা আলপাতিচকে বলেছি।
পাওয়া যাচ্ছে না কেন? প্রিন্সেস মারি শুধাল।
দ্রোন বলল, সবই ঈশ্বরের অভিশাপ। যা ঘোড়া আমাদের ছিল হয় সেনাবাহিনী নিয়ে গেছে, নয় তো মরে গেছে–এ বছরটাই এইরকম! ঘোড়াকে খাওয়াব কি-নিজেরাই হয়তো না খেতে পেয়ে মরে যাব! যা দিনকাল, কেউ হয়তো তিন দিন না খেয়ে আছে। আমাদের কিছু নেই, সব শেষ হয়ে গেছে।
প্রিন্সেস মারি মন দিয়ে তার কথা শুনল।
জানতে চাইল, চাষীরা শেষ হয়ে গেছে? তাদের রুটিও নেই?
দ্রোন বলল, তারা অনাহারে মরছে। গাড়ি চালাবে কি।
এ কথা আমাকে বলনি কেন দ্রোনুশকা? তাদের কি কোনোরকম সাহায্য করা যায় না? আমি সাধ্যমতো যা পারি তা করব… ।
এই মুহূর্তে তার অন্তর যখন দুঃখে ভারাক্রান্ত তখনো যে ধনী-গরিব থাকতে পারে, তখনো যে ধনীরা গরিবকে সাহায্য না করে থাকতে পারে সেটাই প্রিন্সেস মারির কাছে আশ্চর্য মনে হল। সে শুনেছে জমিদারের ফসল বলে একটা জিনিস আছে, আর সেটা কখনো কখনো চাষীদের দেওয়া হয়। সে জানে, তার বাবা বা দাদা কেউই দরকারের সময় চাষীদের সাহায্য করলে তাতে আপত্তি করত না। সে দ্রোনের কাছে চাষীদের প্রয়োজনের কথা এবং বোণ্ডচারভোতে জমিদারের ফসল কি আছে তা জিজ্ঞাসা করতে লাগল।
দ্রোন সগর্বে বলল, জমিদারের ফসল সবটাই নিরাপদে আছে। আমাদের প্রিন্স তা বেচতে দেননি!
