ঠিক আছে, তাহলে শোন। আমি পুলিশ অফিসারের কাছে যাচ্ছি, তুমি তাদের সেকথা বল, তারা যেন এসব বন্ধ করে গাড়ি নিয়ে তৈরি থাকে।
বুঝেছি।
আলপাতিচ আর কিছু বলল না। অনেককাল ধরে সে মানুষ চড়াচ্ছে, সে জানে, তারা যে দরকার হলে আদেশ অমান্য করতেও পারে সে সন্দেহকে প্রকাশ না করাই হচ্ছে তাদের আজ্ঞাধীন করে রাখার প্রধান উপায়। যদিও সে জানে যে সৈন্যদের সহায়তা ছাড়া গাড়ি-ঘোড়া আসবে না, তবু দ্রোনের মুখ থেকে বুঝেছি কথাটা বের করেই সে আপাতত সন্তুষ্ট থাকল।
আসলেও তাই ঘটল, সন্ধ্যাবেলায় কোনো গাড়ি এল না। গ্রামে মদের দোকানের বাইরে আর একটা সভা বসল, আর সেখানে স্থির হল যে ঘোড়াগুলোকে জঙ্গলে তাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং গাড়ি পাঠানো হবে না। এ ব্যাপারে প্রিন্সেসকে কিছু না বলে বন্ড হিলস থেকে যেসব গাড়ি এসেছে তার ভিতর থেকে আলপাতিচ নিজের জিনিসপত্রগুলো নামিয়ে রাখল এবং প্রিন্সেসের গাড়িগুলোর জন্য সেই ঘোড়াগুলোকে কাজে লাগাল। ইতিমধ্যে সে নিজে চলে গেল পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে।
.
অধ্যায়-১০
বাবার শেষকৃত্যের পরে প্রিন্সেস মারি নিজের ঘরের দরোজা বন্ধ করে দিল, কাউকে ঢুকতে দিল না। দাসী দরোজায় এসে জানাল, আলপাতিচ যাত্রার হুকুমের জন্য অপেক্ষা করছে। (এটা দ্রোনের সঙ্গে কথা বলার আগের ঘটনা)। প্রিন্সেস মারি সোফার উপর উঠে বসে বন্ধ দরোজায় ওপাশ থেকেই জবাব দিল যে সে এখান। থেকে যাবে না, আর তাকে একটু শান্তিতে থাকতে দেওয়া হোক।
যে ঘরে সে শুয়েছিল তার জানালাগুলো পশ্চিমমুখো। দেয়ালের দিকে মুখ করে সোফায় শুয়ে সে চামড়ার কুশনের বোতামগুলি নাড়াচাড়া করছে, কুশনটা ছাড়া অন্য কোনোদিকেই তার দৃষ্টি নেই, এলোমেলো চিন্তাগুলো একই বিষয়ের উপর কেন্দ্রীভূত-মৃত্যুর অপরিহার্যতা এবং তার আত্মিক নীচতা, যে নীচতার সন্দেহ কোনোদিন তার মনে জাগেনি, অথচ বাবার অসুখের সময় যা তার কাছে প্রকট হয়ে উঠেছিল। প্রার্থনা করবার ইচ্ছা হল, কিন্তু সাহস হল না, মনের বর্তমান অবস্থায় ঈশ্বরকে ডাকবার সাহস তার হল না। একইভাবে অনেকক্ষণ শুয়ে থাকল।
সূর্য বাড়িটার অপর দিকে চলে গেছে, তার বাঁকা রশ্মিগুলো খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে ঘরটাকে এবং মরক্কো চামড়ার কুশনটাকে আলোকিত করে তুলেছে। হঠাৎ তার চিন্তার স্রোত থেমে গেল। নিজের অজ্ঞাতেই উঠে বসল, চুল ঠিক করে দাঁড়াল, জানালার কাছে গিয়ে সন্ধ্যার তাজা বাতাস টেনে নিল প্রশ্বাসের সঙ্গে।
হ্যাঁ, এবার তুমি সন্ধ্যাটা উপভোগ করতে পার! সে তো চলে গেছে, আর কেউ তোমাকে বাধা দেবে না, নিজের মনেই কথাগুলি বলে সে একটা চেয়ারে বসে পড়ল, মাথাটা এলিয়ে পড়ল জানালার গোবরাটে।
বাগান থেকে কে যেন নরম মমতাভরা গলায় তার নাম ধরে ডাকল, তার মাথায় চুমো খেল। চোখ তুলে তাকাল। মাদময়জেল বুরিয়ে। পরনে কালো পোশাক ও শোকজ্ঞাপক শাদা পট্টি। আস্তে প্রিন্সেস মারির কাছে এসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তাকে চুমো খেল, আর সঙ্গে সঙ্গে কাঁদতে শুরু করল। প্রিন্সেস চোখ তুলে তাকাল। দুজনের মধ্যে আগেকার সব বিবাদ ও নিজের ঈর্ষার কথা মনে পড়ে গেল। আরো মনে পড়ল, মাদময়জেল বুরিয়ের প্রতি সেই মানুষটির মনোভাব কীরকম বদলে গিয়েছিল, তাকে একেবারেই দেখতে পারত না, তাতেই তো বোঝা যায় যে এই মেয়েটির প্রতি মনে মনে যত তিরস্কার সে করেছে সবই কত অন্যায়। তাছাড়া, যে আমি তার মৃত্যু কামনা করেছি তার পক্ষে কি কাউকে নিন্দা করা সাজে?
মাদময়জেল বুরিয়ের জন্য তার দুঃখ হল, শান্ত জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে হাতটা বাড়িয়ে দিল। মাদময়জেল বুরিয়ে সঙ্গে সঙ্গে আবার কাঁদতে শুরু করল, তার হাতে চুমো খেল, প্রিন্সেস মারির দুঃখের কথা বলে তার অংশীদার হতে চাইল। বলল প্রিন্সেস যদি নিজের দুঃখের ভাগ তাকে নিতে দেয় তবেই সে সান্ত্বনা পাবে, এই চরম দুঃখের সম্মুখে দাঁড়িয়ে তাদের ভুল-বোঝাবুঝি যেন তুচ্ছ হয়ে যায়, উপরে বসেই তিনি তার অনুরাগ ও কৃতজ্ঞতা দেখতে পাচ্ছেন। প্রিন্সেস কথাগুলি শুনল।
একটু থেমে মাদময়জেল বুরিয়ে বলল, প্রিয় প্রিন্সেস, তোমার অবস্থা তো দুদিক থেকে ভয়ংকর। আমি জানি, তুমি নিজের কথা ভাবতে পারতে না, ভাবতে জান না, কিন্তু তোমাকে ভালোবাসি বলে সে কাজ আমাকেই করতে হবে।…আলপাতিচ কি তোমার কাছে এসেছিল? এখান থেকে চলে যাবার কথা কি সে কিছু বলেছে?
প্রিন্সেস মারি কোনো জবাব দিল না। কে যাবে, কোথায় যাবে তাই যেন সে বুঝতে পারেনি। এখন কি কোনো কিছু ভাবা সম্ভব? এখন কি সবই সমান নয়? এই কথা ভেবে সে কোনো জবাব দিল না।
মাদময়জেল বুরিয়ে বলল, চেরে মারি, তুমি তো জান যে আমাদের খুব বিপদ-ফরাসিরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। এখন বের হওয়াও বিপজ্জনক। বের হলেই আমরা বন্দি হয়ে যাব, আর ঈশ্বর জানেন…।
সঙ্গিনীর কথা বুঝতে না পেরে প্রিন্সেস মারি তার দিকে তাকাল।
বলল, হায়, এখন যে আমার কোনোকিছুতেই ক্ষতিবৃদ্ধি নেই তা যদি কেউ বুঝত! অবশ্য, কোনো কারণেই আমি বাবার কাছ থেকে দূরে চলে যেতে চাই না…আলপাতিচ যাবার কথা কি যেন বলেছিল…তাকে বলে দিও, আমি কিছুই করতে পারব না, কিছু না, আর আমি চাই না।…
