আরো গুরুত্বপূর্ণ খবরও আলপাতিচ পেয়েছে। যেদিন সে গ্রামপ্রধানকে হুকুম দিয়েছে যে প্রিন্সেসের মালপত্র নিয়ে যাবার জন্য গাড়ি যোগাড় করতে হবে, সেইদিনই গ্রামের সভায় স্থির হয়েছে যে কেউ গ্রাম ছেড়ে যাবে না, সকলেই অপেক্ষা করে থাকবে। অথচ আর সময় নষ্ট করা চলে না। বুড়ো প্রিন্সের মৃত্যুর দিন ১৫ই তারিখে মার্শাল এসে প্রিন্সেস মারিকে তৎক্ষণাৎ যাত্রা করতে পীড়াপীড়ি করতে লাগল, কারণ পরিস্থিতি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। সে আরো বলল, ১৬ তারিখের পরে যদি কিছু ঘটে তো সেজন্য সে দায়ী থাকবে না। বুড়ো প্রিন্সের মৃত্যুর দিন সন্ধ্যায় ফিরে যাবার সময় সে বলে গেল, শোকানুষ্ঠানে যোগ দিতে সে পরদিন আবার আসবে। কিন্তু সে আর আসতে পারল না, কারণ সে খবর পেল যে ফরাসিরা অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে এসেছে, কাজেই নিজের পরিবার ও মূল্যবান জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলার মতো সময়ও তার হাতে ছিল না।
গত ত্রিশ বছর ধরে গ্রাম-প্রধান দ্রোনই বোগুচারভো গ্রামটিকে চালিয়ে এসেছে। বুড়ো প্রিন্স তাকে আদর করে ডাকত দ্রোনুশকা বলে।
দ্রোন শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে কর্মক্ষম সেইসব চাষীদের অন্যতম যারা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বড়। বড় দাড়ি রাখে এবং ষাট কি সত্তর বছর পর্যন্ত যাদের কোনোরকম পরিবর্তন ঘটে না, একটাও চুল পাকে না, একটাও দাঁত পড়ে না, ষাট বছরেও ত্রিশ বছরের মতোই খাড়া ও শক্ত থাকে।
বুড়ো প্রিন্সের শোভাযাত্রার দিনই বিধ্বস্ত বন্ড হিলস জমিদারি থেকে এসে আলপাতিচ দ্রোনকে ডেকে পাঠাল এবং প্রিন্সেসের গাড়ির জন্য বারোটা ঘোড়া এবং বোণ্ডচারভো থেকে মালপত্র সরাবার জন্য আঠারোখানা গাড়ি যোগাড় করতে বলল। আলপাতিচ ভেবেছিল, তার এই হুকুম তামিল করায় কোনো অসুবিধা হবে না, কারণ বোগুচারভোতে ত্রিশটি পরিবার বাস করে, আর চাষীরা সকলেই বেশ সম্পন্ন। কিন্তু তার হুকুম শুনে দ্রোন চোখ নামিয়ে চুপ করে রইল। আলপাতিচ এমন কয়েকজন চাষীর নামও করল যাদের কাছ থেকে সে গাড়ি নিতে পারবে।, দ্রোন জবাব দিল, সেইসব চাষীর ঘোড়াগুলো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে। আলপাতিচ অন্যদের নাম করল, কিন্তু দ্রোনের মতে তাদের ঘোড়াও পাওয়া যাবে না। কতকগুলি সরকারি গাড়িতে ভাড়া খাটতে গেছে, বাকিগুলি খুবই দুর্বল, আর অন্যগুলি দানাপানির অভাবে মরে গেছে। সব শুনে মনে হল, গাড়ির জন্যই ঘোড়া পাওয়া যাবে না, মালের জন্য তো নয়ই।
তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দ্রোনের দিকে তাকিয়ে আলপাতিচ ভুরু কুঁচকাল। দ্রোন যত বড় আদর্শ গ্রাম-প্রধানই হোক না কেন, আলপাতিচও বৃথাই বিশ বছর ধরে প্রিন্সের জমিদারি চালায়নি। দ্রোনের দিকে তাকিয়েই সে বুঝতে পারল যে জবাবগুলো তার নিজস্ব নয়, বোণ্ডচারভো গ্রাম-পঞ্চায়েতের অভিমতেরই প্রতিধ্বনি মাত্র। কিন্তু সে জানে, অনেক সম্পত্তি করেছে বলে গ্রাম-পঞ্চায়েত দ্রোনকে ঘৃণা করে, আর তাই মালিকপক্ষ ও ভূমিদাস পক্ষ এই দুই শিবিরের মধ্যে সে টালবাহানা করছে। দ্রোনের চোখে এই ইতস্তত ভাব লক্ষ্য করে সে ভুরু কুঁচকে তার আরো কাছে এগিয়ে গেল।
বলল, শোন হে দ্রোনুশকা, আমাকে বাজে কথা বল না। হিজ এক্সেলেন্সি প্রিন্স আন্দ্রু আমাকে হুকুম করেছেন সব্বাইকে সরিয়ে দিতে হবে, শত্রুর মুখে তাদের রাখা চলবে না, এই মর্মে জারের হুকুম-নামাও আছে। যে এখানে থেকে যাবে সেই হবে জারের প্রতি বিশ্বাসঘাতক। শুনছ?
শুনছি, চোখ না তুলেই দ্রোন বলল।
এ জবাবে আলপাতিচ খুশি হল না।
মাথা নেড়ে বলল, উঁহু, এর ফল কিন্তু খারাপ হবে।
দ্রোন বিষণ্ণ গলায় বলল, তোমার হাতে তো ক্ষমতা আছেই।
বুকের কাছ থেকে হাতটা তুলে দ্রোনের পায়ের কাছে মেঝেটা দেখিয়ে আলপাতিচ বলল, দেখ দ্রোন, এসব ছাড়! তোমার ভিতরটা তো বটেই, তোমার পায়ের তলাকার মাটির তিন গজ পর্যন্ত আমি দেখতে পাই।
দ্রোন বিচলিত বোধ করল, বাঁকা চোখে আলপাতিচের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামাল।
এসব বাজে মতলব ছাড়, লোকজনদের বল বাড়িঘর ছেড়ে মস্কো যাবার জন্য প্রস্তুত হোক এবং প্রিন্সেসের জিনিসপত্র নিয়ে যাবার জন্য কাল সকালেই গাড়ি ঠিক করুক। আর নিজে কোনো সভায় যেও না, বুঝলে?
দ্রোন হঠাৎ তার সামনে নতজানু হয়ে বসে পড়ল।
ইয়াকভ আলপাতি, তুমি আমাকে বরখাস্ত কর! আমার কাছ থেকে সব চাবি নিয়ে নাও, খৃস্টের দোহাই, আমাকে বরখাস্ত কর!
থাম! আলপাতিচ রুক্ষ কণ্ঠে চেঁচিয়ে বলল। তুমি এবং তোমার পায়ের তলাকার তিন গজ মাটি আমার নখদর্পণে। সে জানে, মৌমাছি পালনের কলাকৌশল, যই ফসল বোনার ঠিক-ঠিক সময়ের জ্ঞান, বিশ বছর ধরে বুড়ো প্রিন্সের অনুগ্রহভাজন হয়ে থাকার দক্ষতা–এ সবকিছু মিলিয়ে অনেকদিন থেকেই সে যাদুকরের খ্যাতি অর্জন করেছে, আর মাটির তিন গজ নিচে পর্যন্ত দেখতে পারার ক্ষমতা যাদুকরদেরই একটা বিশেষ গুণ।
দ্রোন উঠে দাঁড়িয়ে কি যেন বলতে যাচ্ছিল, আলপাতিচ তাকে বাধা দিল।
তোমার মাথায় কি ঢুকেছে বল তো?…তুমি কি ভেবেছ হে?
দ্রোন বলল, এইসব লোকদের নিয়ে আমি কি করব? তারা যে খেই হারিয়ে ফেলেছে। আমি তাদের বলেছি…
তুমি বলেছ তা আমি জানি, আলপাতিচ বলল। তারপরই সে হঠাৎ প্রশ্ন করল, আচ্ছা, তারা কি মদ খাচ্ছে?
একেবারেই আত্মহারা হয়ে পড়েছে ইয়াকভ আলপাতিচ, আরো এক পিপে আনিয়েছে।
