বাড়ির দরোজায় তাকে দেখতে পেয়ে মার্শাল বলল, সবই ঈশ্বরের ইচ্ছা প্রিন্সেস! সবকিছুর জন্যই আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
প্রিন্সেস রেগে বলল, আমাকে একা থাকতে দিন, এ হতে পারে না!
ডাক্তার তাকে থামাতে চেষ্টা করল। তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সে বাবার দরোজার দিকে ছুটে গেল। মনে মনে বলল, এই লোকগুলি ভয়ার্ত মুখে আমাকে থামাতে চাইছে কেন? তাদের কাউকে আমি চাই না! এখানে তারা কি করছে? দরোজা খুলে ফেলল, যে ঘরটাকে অন্ধকার করে রাখা হয়েছিল সেটাকে আলোকোজ্জ্বল দেখে সে চমকে উঠল। ঘরে তার নার্স ও অন্য মেয়েরা রয়েছে। সকলে বিছানার কাছ থেকে সরে গিয়ে তাকে পথ করে দিল। বুড়ো প্রিন্স আন্দ্রুগের মতোই বিছানায় শুয়ে আছে, কিন্তু তার শান্ত মুখের কঠোর ভঙ্গি দেখেই প্রিন্সেস মারি চৌকাঠের উপর থেমে গেল।
না, বাবা মরেনি,এ অসম্ভব! নিজের মনে কথাগুলি বলে সে এগিয়ে গেল, মনের আতংক চেপে রেখে তার গালের উপর ঠোঁট রাখল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে অন্তরের সব মমতা কোথায় হারিয়ে গেল, সেখানে দেখা দিল একটা আতংকের অনুভূতি। না, সে আর নেই। সে নেই, কিন্তু কোথায় গেছে তা কেউ জানে না, সে এক ভয়ংকর, ভয়াবহ রহস্য! দুই হাতে মুখ ঢেকে প্রিন্সেস মারি ডাক্তারের হাতের মধ্যেই এলিয়ে পড়ল। ডাক্তার তাকে তুলে ধরল।
তখন ও ডাক্তারের উপস্থিতিতে মেয়েরা প্রিন্সের গা ধুইয়ে দিল, হাঁ-করা মুখটা যাতে শক্ত হয়ে না যায় সেজন্য একটা রুমাল দিয়ে মাথাটা বেঁধে দিল, আর একটা রুমাল দিয়ে দুটো পাকে একত্র করে বেঁধে দিল। তারপর সম্মান-পদকাদিসহ ইউনিফর্ম পরিয়ে তার কোঁকড়ানো হোট শরীরটাকে টেবিলের উপর শুইয়ে দিল। এসব যে কখন কীভাবে করা হল তা ঈশ্বরই জানেন, কিন্তু সবই যেন আপনা থেকেই করা হয়ে গেল। রাতের দিকে শবাধারের চারদিকে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হল, একটা আবরণ বিছিয়ে দেওয়া হল, সবুজ জুনিপারে মেঝেটা ছেয়ে গেছে, একটা ছাপানো ফিতে খুঁজে দেওয়া হয়েছে মাথার নিচে, আর ঘরের কোণে বসে পুরোহিত মন্ত্র পড়ে চলেছে।
একটা মরা ঘোড়াকে ঘিরে ঘোড়ার দল যেমন সলজ্জ ভঙ্গিতে নাক ঝাড়ে, ঠিক তেমনই বৈঠকখানায় শবাধারকে ঘিরে ভিড় করেছে বাড়ির লোকজন ও অতিথিরা-মার্শাল, গ্রাম-প্রধান, চাষী মেয়েরা–সকলেই ভীত চোখে ক্রুশ-চিহ্ন এঁকে মাথা নুইয়ে বুড়ো প্রিন্সের ঠাণ্ডা, শক্ত হাতে চুমো খাচ্ছে।
.
অধ্যায়-৯
প্রিন্স আন্দ্রু বোগুচারভোতে বসবাস করার আগে তার মালিকরা সেখানে থাকতই না, আর সেখানকার চাষীরাও ছিল বল্ড হিলসের চাষীদের চাইতে সম্পূর্ণ পৃথক চরিত্রের লোক। কথাবার্তায়, পোশাক পরিচ্ছদে এবং স্বভাবে তারা ছিল আলাদা। তাদের বলা হয় তৃণাঞ্চল-চাষী। ফসল কাটা অথবা পুকুর ও নালা কাটার সময় তারা যখন বল্ড হিলসে আসত তখন তাদের কাজের অধ্যবসায়ের জন্য বুড়ো প্রিন্স তাদের পছন্দ করত, কিন্তু তাদের অদ্র আচরণ তার মনঃপূত ছিল না।
সর্বশেষ বোচারভোতে থাকার সময় প্রিন্স আন্দ্রু সেখানে স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিল, চাষীদের খারিজ-করহ্রাস করে দিয়েছিল, কিন্তু তাতে তাদের স্বভাবের পরিবর্তন না হয়ে বরং বুড়ো প্রিন্স যাকে অভদ্রতা বলত তাদের স্বভাবের সেই বৈশিষ্ট্যটাই আরো জোরদার হয়ে উঠেছিল। সবসময়ই কতকগুলো অস্পষ্ট গুজব তাদের মধ্যে চলিত থাকত : কখনো গুজব রটত তাদের সকলকেই কাক-তালিকাভুক্ত করা হবে, কখনো বলা হত একটা নতুন ধর্মে তাদের দীক্ষিত করা হবে, কখনো বা গুজব রটত জারের সেই ঘোষণার এবং ১৭৯৭ সালে জার পলের কাছে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির কথা যে প্রসঙ্গে গুজব রটনা করা হত যে তাদের সবাইকে মুক্তি দেওয়া হলেও ভূস্বামীরাই সেটা আটকে দিয়েছে, কখনো বলা হত, সাত বছরের মধ্যেই পিতর ফেদরভিচ সিংহাসনে ফিরে আসবে এবং সকলকেই মুক্তি দেওয়া হবে, কারো উপর কোনো বিধি-নিষেধ থাকবে না। বোনাপার্টের সঙ্গে যুদ্ধ এবং তার আক্রমণের গুজবের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকত খৃস্টবিরোধী ধারণা, পৃথিবীর অবলুপ্তি ও সার্বিক মুক্তির যত অস্পষ্ট ধারণা। বুড়ো প্রিন্সের মৃত্যুর কিছুদিন আগেই আলপাতিচ বোণ্ডচারভোতে এসেছে। এসেই সে বুঝতে পারল, এখানকার চাষীদের মধ্যে একটা আন্দোলন শুরু হয়েছে। বন্ড হিলস জেলার ষাট ভার্ল্ড ব্যাসার্ধের অন্তর্ভুক্ত সব চাষীরাই তাদের গ্রামগুলোকে কসাকদের হাতে ধ্বংসের মুখে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, অথচ গুজব শোনা যাচ্ছে যে বোগুচারভোর চতুম্পার্শ্বস্থ তৃণাঞ্চলের চাষীরা ফরাসিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, তাদের ইস্তাহার হাতে হাতে বিলি হচ্ছে, কেউ দেশ ছেড়ে যাচ্ছে না। বিশ্বস্ত পারিবারিক ভূমিদাসদের কাছ থেকে সে জানতে পেরেছে, গ্রাম-সভার প্রভাবশালী সদস্য চাৰী কাৰ্প সম্প্রতি সরকারি গাড়ির চালক হিসেবে বাইরে থেকে সংবাদ এনেছে যে কসাকরা পরিত্যক্ত গ্রামগুলি ধ্বংস করছে, কিন্তু ফরাসিরা তাদের কোনোই ক্ষতি করছে না। আলপাতিচ আরো জেনেছে, আগের দিন ফরাসিদের দ্বারা অধিকৃত গ্রাম ভিসলুখভো থেকে জনৈক চাষী ফরাসি সেনাপতির একখানা ইস্তাহার পর্যন্ত নিয়ে এসেছে, তাতে বলা হয়েছে, অধিবাসীদের কোনোরকম ক্ষতি করা হবে না এবং তারা যদি গ্রামেই থেকে যায় তো তাদের সবরকম ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। প্রমাণস্বরূপ চাষীটি ভিসলুখবো থেকে তার খড়ের আগাম বাবদ একশো রুবলের নোটও নিয়ে এসেছে (সে জানে না যে নোটগুলো সবই জাল)।
