প্রিন্সেস মারি প্রশ্ন করল, My mind, my mind aches? (আমার মনে, আমার মনে বড় কষ্ট)
এবার প্রিন্স একটা সমর্থনসূচক শব্দ করে প্রিন্সেস মারির হাতটা নিয়ে বুকের নানা জায়গায় চেপে ধরতে লাগল, যেন সঠিক জায়গাটা খুঁজতে চেষ্টা করছে।
মেয়ে যে তার কথা বুঝতে পেরেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে এবার বুড়ো প্রিন্স স্পষ্টতর কণ্ঠে বলল, শুধু ভাবনা…তোমাকে নিয়ে…ভাবনা…
উদাত চাপা কান্না ও চোখের জল লুকোবার চেষ্টায় প্রিন্সেস মারি বাবার হাতের উপর মাথাটা চেপে ধরল
বুড়ো প্রিন্স মেয়ের চুলে হাত বুলোতে লাগল।
সারারাত তোমাকে ডেকেছি, কোনোরকমে তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল।
চোখের জলে ভেসে মেয়ে বলল, আমি যদি একটু বুঝতে পারতাম…ঘরে ঢুকতে আমার ভয় হচ্ছিল…
বাবা মেয়ের হাতটা চেপে ধরল।
তুমি কি ঘুমোও নি?
মাথা নেড়ে মেয়ে জবাব দিল, না, ঘুমোতে পারিনি।
নিজের অজ্ঞাতেই সে বাবার অনুকরণে যথাসম্ভব আকারে-ইঙ্গিতে নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে চেষ্ট করল, তারও যেন জিভটা নাড়তে কষ্ট হচ্ছে।
সোনা…লক্ষ্মী সোনা…বাবার কথার অর্থ বুঝতে না পারলেও তার গলার সোহাগের সুরটা ধরতে তা অসুবিধা হল না। কেন তুমি আমার ঘরে এলে না?
প্রিন্সেস ভাবল, আর আমি, আমি এই মানুষের মৃত্যু কামনা করেছি!
বুড়ো প্রিন্স কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
ধন্যবাদ…সোনা মেয়ে!…সকলের জন্য, সকলের জন্য…ক্ষমা!… ধন্যবাদ!… ক্ষমা!… ধন্যবাদ… তা দুই চোখে জল ঝরতে লাগল। হঠাৎ সে বলে উঠল, আন্দ্রুকে ডাক! শিশুসুলভ ভীরু সন্দেহের একটা আভা ফুটে উঠল তার মুখে।
সে যা বলছে তা যে অর্থহীন সেকথা বুড়ো প্রিন্স নিজেও জানে। অন্তত প্রিন্সেস মারির তাই মনে হল।
বলল, তার একটি চিঠি পেয়েছি।
অবাক হয়ে বাবা তার দিকে তাকাল।
সে কোথায় আছে?
সেনাবাহিনীতে আছে বাবা, সমালেনস্কে।
বুড়ো প্রিন্স চোখ বুজে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। অবশেষে যেন সবকিছু বুঝতে পেরেছে, সবকিছু মনে পড়েছে এমনিভাবে মাথা নেড়ে আবার চোখ মেলল। মৃদু স্পষ্ট গলায় বলল, ঠিক। রাশিয়ার মৃত্যু হয়েছে। ওরা তাকে ধ্বংস করেছে।
সে আবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল, দুই চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রিন্সেস মারি তার নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে লাগল।
বুড়ো প্রিন্স আন্দ্রুবার চোখ বুজল। কান্না থামিয়ে সে চোখ দুটো দেখাল। তার অর্থ বুঝতে পেরে তিখন চোখের জল মুছিয়ে দিল। সে আবার চোখ মেলে তাকাল, কী যেন বলল, কিন্তু অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউ তার কোনো অর্থই বুঝতে পারল না। অবশেষে তিখন কথাটা বুঝতে পেরে পুনরায় উচ্চারণ করল। প্রিন্সেস মারির মনে হল, সে হয়তো রাশিয়া, প্রিন্স আন্দ্রু, তার নিজের কথা, নাতি, অথবা বুড়োর নিজের মৃত্যুর কথাই বলতে চেয়েছে।
আসলে সে বলেছে, তোমার শাদা পোশাকটা পর। আমার খুব ভালো লাগে।
কথাটা বুঝতে পেরে প্রিন্সেস মারি আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ডাক্তার হাত ধরে তাকে বারান্দায় নিয়ে সান্ত্বনা দিল, যাত্রার জন্য তৈরি হতে বলল। মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে প্রিন্স আন্দ্রুবার কথা বলতে শুরু করল। ভুরু কুঁচকে কর্কশ গলা চড়িয়ে নিজের ছেলে, যুদ্ধ ও সম্রাট সম্পর্কে কথা বলতে বলতেই তার দ্বিতীয় ও চরম স্ট্রোকটা হল।
প্রিন্সেস মারি তখন বারান্দায়। আবহাওয়া পরিষ্কার হয়েছে, দিনটা গরম ও রোদে ভরা। সে কিছুই বুঝতে পারছে না, ভাবতে পারছে না, অনুভব করতে পারছে না, তার সারা মন জুড়ে আছে বাবার প্রতি এক তীব্র ভালোবাসা যা এইমুহূর্তের আগে সে এখনো বোধ করেনি। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে ছুটে বাগানে চলে গেল, প্রিন্স আন্দ্রুর হাতে লাগানো লেবুবীথির ভিতর দিয়ে পুকুরপাড়ে গিয়ে হাজির হল।
হ্যাঁ…আমি…আমি…আমি তার মৃত্যু কামনা করেছিলাম! হ্যাঁ, আমি চেয়েছিলাম শেষের দিনটা যেন তাড়াতাড়ি আসে!…শান্তি পেতে চেয়েছিলাম…আর এখন আমার কি হবে? বাবাই যদি না থাকে তো আমি শান্তি দিয়ে কি করব? বুকটা চেপে ধরে দ্রুতপায়ে বাগানে হাঁটতে হাঁটতে প্রিন্সেস মারি অফুটে কথাগুলি বলল। চাপা কান্নার আবেগে তার বুকটা ঢিপঢিপ করছে।
হাঁটতে হাঁটতে সে আবার বাড়িতে ফিরে এল। দেখল, একজন অপরিচিত লোককে সঙ্গে নিয়ে মাদময়জেল বুরিয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে। লোকটি জেলার মার্শাল অব দি নবিলিটি, প্রিন্সেসের যে অবিলম্বে যাত্রা করা দরকার সেটা বলবার জন্য সে নিজেই এসেছে। প্রিন্সেস মারি সবই শুনল, পাশে বসে কথা বলল। তারপর ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বুড়ো প্রিন্সেস দরোজার দিকে এগিয়ে গেল। উত্তেজিত মুখে ডাক্তার বেরিয়ে এল, তাকে ঘরে ঢুকতে নিষেধ করল।
চলে যান প্রিন্সেস! চলে যান…চলে যান!
প্রিন্সেস মারি বাগানে ফিরে গেল। পুকুরের পাড়ে ঢালুতে গিয়ে বসল, সেখান থেকে কেউ তাকে দেখতে পাবে না। কতক্ষণ সেখানে বসেছিল তা সে জানে না। দ্রুত এগিয়ে আসা একটি স্ত্রীলোকের পায়ের শব্দে তার খেয়াল হল। উঠে দাঁড়িয়েই সে দাসী দুনিয়াশাকে দেখতে পেল, সে তাকেই খুঁজছে। তাকে দেখেই দাসীটি সভয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
শিগগির চলুন প্রিন্সেস…প্রিন্স…দুনিয়াশা ভাঙা গলায় বলল।
এক্ষুনি যাচ্ছি, এক্ষুনি! কথা বলেই প্রিন্সেস মারি বাড়ির দিকে দৌড়তে লাগল।
