বোগুচারভোতে বাস করা ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। চারদিক থেকে ফরাসিদের অগ্রগতির সংবাদ আসছে, বোগুচারভো থেকে দশ মাইল দূরে একটা গ্রামে ফরাসি লুঠেরা একটা বাড়ি লুঠ করেছে।
ডাক্তার প্রিন্সকে সরিয়ে দিতে বলছে, প্রাদেশিক মার্শাল অব দি নবিলিট প্রিন্সেস মারিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে চলে যেতে বলছে, গ্রাম্য পুলিশের বড়কর্তা বোগুচারভোতে এসেও সেই কথাই বলে গেছে, বলেছে, ফরাসিরা মাত্র পঁচিশ মাইলের মধ্যে পৌঁছে গেছে, গ্রামে গ্রামে ফরাসিদের ফরমান জারি করা হচ্ছে, প্রিন্সেস যদি ১৫ই তারিখের মধ্যে তার বাবাকে এখান থেকে সরিয়ে না নেয় তো ফলাফলের জন্য সে দায়ী থাকবে না।
প্রিন্সেস স্থির করল ১৫ তারিখে চলে যাবে। সারাটাদিন তারই উদ্যোগ-আয়োজনে ব্যস্ত থাকল। ১৪ই রাতটাও একইভাবে কাটল। যে ঘরে প্রিন্স শুয়ে থাকে পোশাক না ছেড়েই তার পাশের ঘরে সে রাতটা কাটাল। বারকয়েক ঘুম ভেঙে সে শুনতে পেল বাবা আর্তনাদ করছে, বিড়বিড় করে কথা বলছে, বিছানায় নড়াচড়ার শব্দ হচ্ছে, তিখন ও ডাক্তার ঘরে এসে তাকে পাশ ফিরিয়ে দিচ্ছে। প্রিন্সেস ঘুমতে পারে না, বারবার দরোজার কাছে গিয়ে কান পাতে, ঘরে ঢুকতে ইচ্ছা করে, কিন্তু ঢুকবে কি না বুঝতে পারে না। সে জানে, রাত করে তার ঘরে ঢুকলে বাবা বিরক্ত হবে।
কিন্তু আগে কখনো সে বাবার জন্য এত কষ্টবোধ করেনি, তাকে হারাবার ভয় এমন করে তাকে পেয়ে বসেনি। বাবার সঙ্গে কাটানো সারাটা জীবনের কথা তার মনে পড়ে যায়, তার প্রতিটি কথা ও কাজের মধ্যে আজ সে দেখতে পায় তার ভালোবাসার প্রকাশ। মাঝে মাঝে এইসব স্মৃতির ভিতর থেকে শয়তানের প্রলোভন কল্পনায় উত্তাল হয়ে ওঠে : বাবার মৃত্যুর পরে কি ঘটবে, তার নতুন মুক্ত জীবন কীভাবে চলবে-এমনি সব চিন্তা। একান্ত বিরক্তির সঙ্গে সেসব চিন্তাকে সে মন থেকে ঝেড়ে ফেলল। সকালের দিকে মন শান্ত হয়ে এলে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
অনেক দেরিতে ঘুম ভাঙল। তখনই মনে পড়ল, বাবার অসুস্থতাই তার প্রধান চিন্তার বিষয়। দরোজার কাছে গিয়ে কান পেতে শুনল বাবা তখনো গোঙাচ্ছে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, অবস্থা একরকমই আছে।
কিন্তু আর কি ঘটতে পারত? আমি কী চেয়েছি? আমি কি তার মৃত্যু চাই! নিজের প্রতি ঘৃণায় সে চেঁচিয়ে বলল।
হাত-মুখ ধুয়ে, পোশাক বদলে, প্রার্থনা সেরে সে ফটকের দিকে গেল। ফটকের সামনে কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তাতে মালপত্র বোঝাই করা হচ্ছে।
আতপ্ত, ধূসর সকাল। প্রিন্সেস মারি ফটকে থামল। নিজের আধ্যাত্মিক দীনতায় নিজেই শিউরে উঠল, বাবার কাছে যাবার আগে নিজের চিন্তাকে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করল।
ডাক্তার নিচে নেমে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
বলল, আজ তিনি একটু ভালো আছেন। আমি আপনাকেই খুঁজছিলাম। তাঁর কথার অর্থ যেন কিছুটা বোঝা যাচ্ছে। আজ তাঁর মাথা অনেকটা পরিষ্কার আছে। ভিতরে চলুন, তিনি আপনার খোঁজ করছেন…
একথা শুনে প্রিন্সেস মারির বুকের ভিতরটা এত প্রচণ্ডভাবে কেঁপে উঠল যে তার মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল, পাছে পড়ে যায় সেই ভয়ে দরোজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার সমস্ত সত্তা যখন সেইসব ভয়ঙ্কর অশুভ চিন্তায় ডুবে আছে ঠিক তখনই বাবাকে দেখতে হবে, তার সঙ্গে কথা বলতে হবে, তার চোখ দুটি স্থিরনিবদ্ধ থাকবে তার উপরে-এ যে হর্ষ ও বিষাদের এক যুগপৎ যন্ত্রণা।
আসুন, ডাক্তার বলল।
প্রিন্সেস মারি বাবার ঘরে ঢুকে তার বিছানার পাশে গেল। বালিশের উপর পিঠটা উঁচু করে হেলান দিয়ে সে শুয়ে আছে, দুখানি শীর্ণ, হাড় বের করা, জট-পাকানো রক্তিম শিরা ভর্তি হাত বালিশের উপর এলিয়ে পড়ে আছে, ডান-চোখটা একদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে, ডান চোখটা টেরা হয়ে আছে, ভুরু ও ঠোঁট দুটি নিশ্চল। তাকে কত শীর্ণ, কত ছোট, কত করুণ দেখাচ্ছে। প্রিন্সেস মারি এগিয়ে গিয়ে তার হাতে চুমো খেল। বাবার বাঁ হাত তার হাতটাকে চেপে ধরল, প্রিন্সেস মারি বুঝতে পারল, তার আসার জন্যই বাবা অপেক্ষা করেছিল। সে মেয়ের হাতটা মুচড়ে দিল, তার ভুরু ও ঠোঁট রাগে কাঁপতে লাগল।
বাবা কি চায় তা বুঝতে চেষ্টা করে সে বিপন্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। সে যখন এমন একটা জায়গায় দাঁড়াল যেখানে বাবার বাঁ চোখটা তাকে দেখতে পায় তখনই বাবার মুখটা শান্ত হয়ে এল, কয়েক সেকেন্ড সে চোখটা সরাল না। তারপরই তার ঠোঁট ও জিভ নড়তে লাগল, শব্দ বেরিয়ে এল, অনুরোধ-ভরা ভীরু দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে সে এমনভাবে কথা বলতে লাগল যেন তার মনে যথেষ্ট আশঙ্কা আছে যে মেয়ে হয়তো তার কথা বুঝতে পারবে না।
সব শক্তি এক করে প্রিন্সেস মারি তার দিকে তাকাল। বাবার জিভ নাড়ার হাস্যকর প্রচেষ্টা দেখে সে চোখ নামিয়ে নিল, উপাত অশ্রুকে অনেক কষ্টে চেপে রাখল। একই কথা বারবার উচ্চারণ করে প্রিন্স কিছু একটা বলল। প্রিন্সেস তা বুঝতে পারল না, তবু অনুমান করতে চেষ্টা করল এবং তার কথাগুলিই আর একবার উচ্চারণ করল।
Mmm…ar…ate…ate এই কথাগুলিই প্রিন্স বারকয়েক বলল।
এই কয়টি শব্দ থেকে কিছুই বোঝা গেল না। ডাক্তার একটা অনুমান করে তাকেই প্রশ্ন করল : Mary, are you afraid? (মারি, তুমি ভয় পেয়েছ?) প্রিন্স মাথা নেড়ে ঐ একই শব্দের পুনরাবৃত্তি করল।
