নিজে থেকে গেলেও প্রিন্সেস, দেসাল্লেস ও ছোট্ট প্রিন্সকে বোগুচারভোতে এবং সেখান থেকে মস্কো পাঠাবার সব ব্যবস্থাই সে করে দিল। আগেকার বীতরাগের পরে বাবার এই বিন্দ্ৰি কঠোর পরিশ্রম দেখে প্রিন্সেস মারি ভয় পেয়ে গেল, বাবাকে একলা রেখে যেতে তার ভরসা হল না, আর জীবনে এই প্রথম সে বাবার অবাধ্য হল। সে চলে যেতে অস্বীকার করায় বাবার রাগ প্রচণ্ড ঝড়ের বেগে তার উপর ভেঙে পড়ল। সবরকম অন্যায় নির্যাতন চলল তার উপর। মেয়েকে শাস্তি দেবার জন্য বাবা তাকে জানিয়ে দিল, তার জন্যই সে জ্বলেপুড়ে মরছে, সেই ছেলের সঙ্গে তার ঝগড়া বাধিয়েছে, তার জীবনকে বিষময় করে তুলবার জন্য তার বিরুদ্ধে হীন সন্দেহ পোষণ করেছে, এই বলে মেয়েকে পড়ার ঘর থেকে তাড়িয়ে দিল যে সে যাক বা না যাক তাতে তার কিছুই যায়-আসে না। বাবা আরো বলল, মেয়ের অস্তিত্বের কথাও সে তার মনে রাখতে চায় না, আর মেয়েও যেন তাকে আর মুখ না দেখায়। প্রিন্সেস মারির আশঙ্কা ছিল, বাবা হয়তো তাকে জোর করে পাঠিয়ে দেবে, তা না করে বাবা যে শুধু তার মুখ দেখতে চাইল না তাতেই প্রিন্সেস মারি খুশি হল। সে বুঝতে পারল, দূরে চলে না গিয়ে সে যে বাড়িতেই থেকে গেল এতে মনের গভীরে বাবা যে খুশিই হয়েছে এটাই তার প্রমাণ।
ছোট্ট নিকলাস চলে যাবার পরদিন সকালে বুড়ো প্রিন্স পুরো ইউনিফর্ম চাপিয়ে প্রধান সেনাপতির সঙ্গে দেখা করার জন্য প্রস্তুত হল। দরোজায় গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। প্রিন্সেস মারি দেখল, ইউনিফর্ম ও সম্মানসূচক পদকাদি পরে বাবা পায়ে হেঁটে বাগানের দিকে গেল সশস্ত্র চাষীদের ও পারিবারিক ভূমিদাসদের পরিদর্শন করতে। জানালায় বসেই বাগানে বাবার কথাবার্তা শুনবার জন্য সে কান পেতে রইল। হঠাৎ কয়েকটি লোব ভয়ার্ত মুখে বাগানের পথ ধরে ছুটে এল।
ফুলের কেয়ারি করা পথ পেরিয়ে তরুবীথির পথ ধরে প্রিন্সেস মারি ফটকের দিকে ছুটে গেল। বেসরকারি সৈনিক ও পারিবারিক ভূমিদাসদের একটা বড় দল তার দিকেই এগিয়ে আসছে, তাদের মাঝখানে কয়েকজন লোক ইউনিফর্মধারী, পদকাদি সজ্জিত একটি ছোটখাট বৃদ্ধকে বগলের নিচে হাত ঢুকিয়ে টানতে টানতে নির আসছে। প্রিন্সেস মারি ছুটে গেল, তরুবীথির ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে যেসব বৃত্তাকার ছোট ছোট আলোর ফুটবি এসে পড়েছে তাতে বাবার মুখের পরিবর্তনটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সে শুধু এইটুকু দেখতে পেল, আগেকা কঠোর, স্থিরপ্রতিজ্ঞ মুখে দেখা দিয়েছে ভীরুতা ও আত্মসমর্পণের ভঙ্গি। মেয়েকে দেখে সে অসহায় ঠোঁট দুfি নাড়ল, একটা কর্কশ শব্দ বেরিয়ে এল। সে যে কি চাইছে তা বোঝা অসম্ভব। তাকে তুলে নিয়ে পড়ার ঘ যাওয়া হল, যে কোচটাকে ইদানীং সে এত ভয় পেতোর উপরেই তাকে শুইয়ে দেওয়া হল।
সেই রাতেই ডাক্তার ডাকা হল, রক্তমোক্ষণ করা হল, ডাক্তার বলল, প্রিন্সের হৃদযন্ত্র আক্রান্ত হওয়ায় তা দক্ষিণ অঙ্গ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছে।
বল্ড হিলসে থাকা ক্রমেই অধিকতর বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, পরদিনই প্রিন্সকে বোগুচারভোতে স্থানান্তরি করা হল। ডাক্তারও সঙ্গে গেল।
তারা বোগুচারভো পৌঁছবার আগেই দেসাল্লেস ও ছোট্ট প্রিন্স মস্কো রওনা হয়ে গেছে।
প্রিন্স আন্দ্রু বোণ্ডচারভোতে যে নতুন বাড়ি তৈরি করেছিল, পক্ষাঘাতড়গ্রস্ত হয়ে বুড়ো প্রিন্স তিন সপ্তাহ সেখানেই শয্যাশায়ী অবস্থায় কাটাল, তার অবস্থার কোনো হেরফের ঘটল না। অচৈতন্য অবস্থায় একটা বিকৃত শবদেহের মতো সে পড়ে রইল। অনবরত বিড়বিড় করছে, ভুরু ও ঠোঁট কুঁচকে যাচ্ছে, চারদিকে যা কিছু ঘটছে তা বুঝতে পারছে কি না তাও বলা শক্ত। একটা জিনিস খুবই নিশ্চিত-সে খুব কষ্ট পাচ্ছে, আর কি যেন বলতে চাইছে। কিন্তু সেটা যে কি কেউ বলতে পারে না : একটি রুগ্ন, আধপাগল মানুষের কোনো খেয়াল হতে পারে, সরকারি কাজকর্মের কথা হতে পারে, অথবা পারিবারিক ব্যাপারও হতে পারে।
ডাক্তার বলল, এই অস্থিরতা থেকে কিছুই বোঝা যায় না, শারীরিক কারণেই এটা ঘটছে, কিন্তু প্রিন্সেস মারির ধারণা, বাবা তাকে কিছু বলতে চাইছে, সে উপস্থিত থাকলেই যে বাবার অস্থিরতাটা বাড়ে তাতেই তার ধারণা সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। দেহ ও মন দুদিক থেকেই সে অসুস্থ। নিরাময়ের কোনো আশাই নেই। তাকে নিয়ে দেশভ্রমণে যাওয়া অসম্ভব, লোকটিকে তো পথের মধ্যে মরতে দেওয়া যায় না। প্রিন্সেস মারি অনেকসময় ভাবে, শেষের দিনটা একটু তাড়াতাড়ি এলেই কি ভালো হয় না? দিনরাত সে বাবার উপর নজর রাখে। ঘুমায় কদাচিৎ। শুনতে খারাপ লাগলেও বাবার শরীরে উন্নতির লক্ষণ দেখার আশা সে করে না, বরং শেষ পরিণতির লক্ষণই সে আশা করে।
নিজের মনের এই বিচিত্র অনুভূতিকে স্বীকার করতে না চাইলেও সেটা কিন্তু সত্য। তার কাছে যেটা আরো বেশি ভয়ংকর হয়ে দেখা দিচ্ছে সেটা হল–যেসব ব্যক্তিগত কামনা-বাসনার কথা সে ভুলেই গিয়েছিল, অথবা তার মনের মধ্যে ঘুমিয়ে ছিল, বাবার অসুখের সময় থেকেই সেগুলি যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। যেসব চিন্তা অনেক বছর ধরে তার মনেও আসে নি-বাবার ভয় থেকে মুক্ত স্বাধীন জীবনের চিন্তা, এমন কি ভালোবাসা ও পারিবারিক জীবনের সম্ভাবনার চিন্তা-তারাই যেন শয়তানের প্রলোভনের মতো অনবরত তার কল্পনায় ভাসতে শুরু করেছে। মন থেকে যতই সরিয়ে দিতে চেষ্টা করুক, সেই ঘটনা ঘটে যাবার পরে কেমন করে সে তার জীবনকে চালাবে সেই চিন্তাই বার বার তার মনে আসছে। এসবই যে শয়তানের প্রলোভন প্রিন্সেস মারি তা জানে। সে জানে এর বিরুদ্ধে একমাত্র অস্ত্র প্রার্থনা, আর তাই সে প্রার্থনা করতেই চায়। কিন্তু সে প্রার্থনা করতে পারে না, কাঁদতে পারে না, জাগতিক দুশ্চিন্তা তার মনকে চেপে ধরেছে।
