আনেৎ, ঈশ্বরের দোহাই, তুমি আপত্তি করো না, কাউন্টেস বলল, তার শুকনো মর্যাদাসম্পন্ন, বার্ধক্যজীর্ণ মুখে লজ্জার আভাটুকু বড়ই বিচিত্র দেখাল, রুমালের নিচ থেকে সে টাকাটা তুলে নিল।
আন্না মিকায়লভনা তৎক্ষণাৎ তার ইচ্ছাটা বুঝে নিয়ে উপযুক্ত মুহূর্তে কাউন্টেসকে আলিঙ্গন করার জন্য নিচু হল।
এটা আমি বরিসকে দিলাম, তার পোশাকের জন্য।
আন্না মিখায়লভনা ততক্ষণে তাকে আলিঙ্কন করে কাঁদতে শুরু করেছে। কাউন্টেসও কাঁদল। তারা কাঁদল কারণ তারা বন্ধু, কারণ তারা দয়ালু হৃদয়, কারণ ছোটবেলার বন্ধু হয়েও টাকার মতো একটা তুচ্ছ জিনিসের কথা তাদের ভাবতে হয়েছে, আর কারণ তাদের যৌবন পার হয়ে গেছে। কিন্তু এই অশ্রুজল তাদের দুজনের কাছেই বড় সুখকর।
*
অধ্যায়-১৮
মেয়েদের নিয়ে এবং বহুসংখ্যক অতিথিকে নিয়ে কাউন্টেস রস্তভা বসার ঘরে হাজির। আমন্ত্রিত ভদ্রলোকদের কাউন্ট নিজেই তার পড়ার ঘরে নিয়ে গেছে এবং নিজস্ব তুর্কি পাইপের সংগ্রহগুলি তাদের দেখাচ্ছে। মাঝে মাঝেই সে খোঁজ করছে : সে কি এখনো আসেনি? সকলেই মারিয়া দিমিত্রিয়েভনা আখসিমভার জন্য অপেক্ষা করছে। সমাজে সে ভয়ংকরী ড্রাগন নামে পরিচিত; মহিলাটির খ্যাতি অর্থ বা পদমর্যাদার জন্য নয়, সাধারণ বুদ্ধি ও স্পষ্ট কথার জন্য। রাজপরিবার থেকে শুরু করে মস্তো ও পিটার্সবুর্গ শহরের সর্বত্র মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার খ্যাতি, উভয় শহরই তাকে দেখে বিস্মিত হয়, তার কঠোরতায় গোপনে হাসে, তাকে নিয়ে গল্প বানায়, আবার সেই সঙ্গে সকলেই তাকে শ্রদ্ধা করে, আবার ভয়ও করে।
কাউন্টের ঘরটা তামাকের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। একটি ইস্তাহারে যুদ্ধের কথা ঘোষণা করা হয়েছে; তাই সকলে যুদ্ধের কথা ও সৈন্যসংগ্রহের ব্যাপার নিয়েই আলোচনা করছে। ইস্তাহারটি কেউ এখনো চোখে দেখেনি, তবে সকলেই জানে যে সেটি প্রকাশিত হয়েছে। দুজন অতিথি ধূমপান করতে করতে গল্প করছে, আর তাদের মাঝখানে বসে আছে কাউন্ট। সে নিজে ধূমপান করছে না, কথাও বলছে না, কিন্তু একবার এদিকে, একবার ওদিকে মাথা হেলিয়ে পরম সুখে ধূমপানীদের দেখছে, তাদের কথাবার্তা শুনছে, আর একজনকে আর একজনের বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে।
তাদের মধ্যে একজন সিভিলিয়ান, ফ্যাকাশে রং, পরিষ্কার কামানো, পাতলা বলীরেখাভরা মুখ, এর মধ্যেই বুড়ো হয়ে গেছে, যদিও পোশাক পরেছে একজন কেতাদুরুস্ত যুবকের মতো। বেশ আরাম করে সোফার উপর পা তুলে বসেছে। স্ফটিকের পাইপটা মুখের মধ্যে অনেকখানি ঢুকিয়ে কাশতে কাশতে ধূমপান করছে আর চোখ দযটো কুঁচকে যাচ্ছে। এই প্রবীণ অবিবাহিত পুরুষটির নাম শিনশিন, কাউন্টেসের সম্পর্কে বাই, মস্কোর সমাজে কড়া জিহ্বার মানুষ বলে পরিচিত। মনে হয় সঙ্গীকে সে কিছুটা কৃপার চোখে দেখে থাকে। অপরজন রক্ষীবাহিনীর গোলাপী অফিসার, ধোপদুরুস্ত, ঝকঝকে পোশাক, বোতাম-আঁটা, মুখের মাঝখানে পাইপটা ধরে লাল ঠোঁট দিয়ে ধীরে ধীরে ধোয়া টানে আর ধোয়া ছাড়ে রিং বানিয়ে। এই হল লেফটেন্যান্ট বের্গ, সেমেনভ রেজিমেন্টের অফিসার, এর সঙ্গেই বরিসের সেনাদলে যোগ দিতে যাবার কথা, আর একেই দিদি ভেরার ভাবী বলে উল্লেখ করে নাতাশা তাকে ঠুকেছিল। দুজনের মাঝখানে বসে কাউন্ট মন দিয়ে তাদের কথা শুনছিল। তার প্রিয় তাসের খেলা বোস্টন যখন চলে না, তখন তার মনের মতো কাজ হল শ্রোতা সাজা, বিশেষ করে যখন সে দুজন বাক্যবাগীশকে পরস্পরের দিকে লেলিয়ে দিতে পারে।
শিনশিনের কথা বলার বৈশিষ্ট্যই হল অতি সাধারণ রুশ বাকধারার সঙ্গে বাছা বাছা ফরাসি বাক্য জুড়ে দেয়া। ব্যঙ্গের হাসি হাসতে হাসতে সেই ভাষাতেই শিনশিন বলল তাহলে মাননীয় বুড়ো আলফোন্স কালোভিচ, তুমি সরকারের ঘাড় ভেঙেও মুনাফা লুটতে চাও, আবার সঙ্গীর কাছ থেকেও কিছু হাতাতে চাও?
না হে পিতর নিকলায়েভিচ; আমি শুধু দেখতে চাই যে দাতিক বাহিনীর তুলনায় অশ্বরোহী বাহিনীতে সুযোগ অনেক কম। এই আমার অবস্থাটাই ভেবে দেখ না পিতর নিকলায়েভিচ…।
বের্গ সর্বদাই কথা বলে ধীরে, সবিনয়ে ও ঠিক ঠিক মেপে। তার কথাবার্তা সব সময়ই নিজেকে নিয়ে; এমন আলোচনা যখন চলে যার সঙ্গে তার নিজের কোনো সম্পর্ক নেই তখন সে শান্তভাবে চুপ করে থাকে। কিন্তু সেই তার সম্পর্কে কোনো কথা ওঠে অমনি সে খোস মেজাজে কথা বলতে শুরু করে।
আমার কথাই ভাব পিতর নিকলায়েভিচ। যদি অশ্বরোহী বাহিনীতে থাকতাম তাহলে লেফটেন্যান্ট পদে থেকেও প্রতি চার মাসে আমি দুশো রুবলের বেশি পেতাম না, কিন্তু এখন আমি পাচ্ছি দুশো তিরিশ, শিনশিন ও কাউন্টের দিকে তাকিয়ে খুশির হাসি হেসে সে বলল।
সে আরো বলতে লাগল, তাছাড়া, রক্ষীবাহিনীতে বদলি নিয়ে আমি আরো ভালো পদে যেতে পারব, আর পদাতিক রক্ষীবাহিনীতে চাকরি খালিও হয় অনেক বেশি ঘন ঘন। তাহলেই ভাব, দুশো তিরিশ রুবলে কী না করা যেতে পারে। এমন কি আমি কিছুটা বাঁচাতে পারি এবং বাবাকেও কিছু পাঠাতে পারি, এই বলে সে একটা ধোয়ার রিং ছাড়ল।
পাইপটাকে মুখের আর এক কোণে ঠেলে দিয়ে কাউন্টকে চোখ টিপে শিনশিন বলল, হিসাব মিলে গেল… প্রবাদ আছে, জার্মানরা পাথরের গা থেকেও চামড়া তুলে নিতে জানে।
কাউন্ট হো হো করে হেসে উঠল। শিনশিনকে কথা বলতে দেখে অন্য অতিথিরাও এগিয়ে এল। বের্গ বলতে লাগল কেমন করে রক্ষীবাহিনীতে বদলি হয়ে সে ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থী শিবিরের পুরনো বন্ধুদের চাইতে একধাপ এগিয়ে গেছে, কেমন করে যুদ্ধের সময় কোম্পানি কম্যান্ডার মারা গেলে প্রবণীতার বিচারে সে পদটা সে সহজেই পেয়ে যেতে পারে, রেজিমেন্টের সকলের সঙ্গেই তার দহরম মহরম চলে, আর তার বাবাও তাকে নিয়ে খুব খুশি।
