কি খবর? নেপোলিয়ন শুধাল।
প্লাতভের অধীনস্থ জনৈক কসাক বলছে, তভের সেনাদল মূল বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। আর কুতুজভ প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হয়েছে। লোকটি খুবই বিচক্ষণ আর অতিভাষী।
নেপোলিয়ন হেসে বলল, একটি ঘোড়া দিয়ে কসাকটিকে তার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। সে নিজে তার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কয়েকজন অ্যাডজুটান্ট ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। একঘণ্টা পরে আর্দালির কুর্তা গায়ে লাভ্রুশকা এসে হাজির হল। এই ভূমিদাসটিকেই দেনিসভ দিয়েছিল রস্তভকে। নেপোলিয়ন তাকে পাশাপাশি ঘোড়া চালাবার নির্দেশ দিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করল।
তুমি একজন কসাক?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি কসাক ইয়োর অনার।
এই ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বিয়ের্স লিখেছে, নেপোলিয়নের শাদাসিধে পোশাকে সম্রাটের উপস্থিতিজ্ঞাপক কোনো লক্ষণ না থাকায় তাকে চিনতে না পেরে কসাকটি সরল মনে যুদ্ধের বর্ণনা দিতে লাগল। আসলে আগের দিন মদের নেশায় বেহুশ হয়ে মনিবকে ডিনার না খাইয়েই সে মুরগির খোঁজে একটা গ্রামে গিয়ে সেখানে লুটতরাজ শুরু করে এবং শেষপর্যন্ত ফরাসিদের হাতে বন্দি হয়।
লাভ্রুশকা ভালো করেই জানত যে এই নেপোলিয়ান, কিন্তু তাকে দেখে সে মোটই ভয় পেল না, বরং নতুন মনিবকে খুশি করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করতে লাগল। এই লোকটিই যে নেপোলিয়ন সেটা ভালোভাবে বুঝেও সে মোটেই ভয় পেল না, ঠিক যেরকম সে রস্তভকে বা অন্য কোনো সার্জেন্ট-মেজরের লাঠিকেও ভয় করত না, কারণ তার তো এমন কিছুই নেই থেকে কি নেপোলিয়ন আর কি সার্জেন্ট-মেজর কেউই তাকে বঞ্চিত করতে পারে।
কাজেই সে অবিরাম বকবক করে চলল, আর্দালিদের কাছে যত গুজব শুনেছে সব ঢালতে লাগল। তার অনেকটাই সত্য। কিন্তু নেপোলিয়ন যখন জানতে চাইল, বোনাপার্তকে পরাজিত করতে পারবে কি না সে বিষয়ে রুশরা কি ভাবছে, তখন লাভ্রুশকা ভুরু কুঁচকে ভাবতে লাগল।
এই প্রশ্নটার মধ্যে সে সূক্ষ্ম চাতুরির আভাস পেল, তার মতো লোকরা সবকিছুর মধ্যেই চাতুরির আভাস পেয়ে থাকে, তাই সে ভুরু কুঁচকাল, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল না।
চিন্তিতভাবে বলল, ব্যাপারটা অনেকটা এইরকম, অচিরেই যদি কোনো যুদ্ধ হয়তো আপনার জয় হবে। সেটা ঠিক। কিন্তু যদি তিনটে দিন পার হয়ে যায়, তো তার পরে, মানে সেক্ষেত্রে সেই যুদ্ধই সহজে শেষ হবে না।
মেজাজ ভালো থাকা সত্ত্বেও এ কথায় নেপোলিয়ন হাসল না, কথাগুলি আর একবার বলতে বলল।
সেটা লক্ষ্য করে তাকে খুশি করতে এবং নেপোলিয়নকে না চেনার ভান করে লাভ্রুশকা বলল, আপনি তো জানেন যে আপনাদের নেপোলিয়ন আছেন, আর তিনি তো পৃথিবীর সকলকেই পরাজিত করেছেন, কিন্তু আমরা তো ভিন্ন ধাতুতে গড়া…–এটুকু দেশাত্মবোধের গর্ব যেন কেমন করে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল তা সে নিজেই জানে না।
নেপোলিয়ন হাসল। থিয়ের্স লিখেছে, তরুণ কসাকটি তার শক্তিমান প্রশ্নকর্তাকে হাসিয়ে ছাড়ল। কয়েক কদম নিঃশব্দে এগিয়ে বের্থিয়ের-এর দিকে ঘুরে নেপোলিয়ন বলল, সে দেখতে চায় এই ডন-শাবক যদি জানতে পারে যে সে স্বয়ং নেপোলিয়নের সঙ্গে কথা বলছে, কথা বলছে সেই সম্রাটের সঙ্গে যার অবিস্মরণীয় দিগ্বিজয়ী নাম পিরামিডের গায়ে-গায়ে খোদাই করা হয়েছে, তাহলে তার অবস্থাটা কি দাঁড়ায়।
তাকে বিচলিত করে তুলবার জন্যই যে কথাটা তাকে বলা হয়েছে এবং নেপোলিয়ন যে আশা করছে সে খুব ভয় পেয়ে যাবে সেটা বুঝতে পেরে লাভ্রুশকা নতুন মনিবকে খুশি করতে ভীত ও বিস্মিত হবার ভান করল, দুচোখ বিস্ফারিত করে মুখে এমন ভাব ফুটিয়ে তুলল যেটা সে সাধারণত করে থাকে চাবুক খাবার আগের মুহূর্তে। থিয়ের্স লিখেছে, যে মুহূর্তে নেপোলিয়নের দোভাষী কথাগুলি বলল তৎক্ষণাৎ কসাকটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল, একটা কথাও না বলে ঘোড়া চালাতে চালাতে সেই দিগ্বিজয়ীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যার খ্যাতি প্রাচ্যের তৃণাঞ্চলকে পেরিয়ে তার কানে এসে পৌঁছেছে। তার সব প্রগলভতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল, দেখা দিল একটা অতি সরল, নীরব বিস্ময়ের অনুভূতি। কসাকটিকে একটি উপহার দিয়ে নেপোলিয়ন তাকে ছেড়ে দিল-বন্দি বিহঙ্গ যেন মুক্তি পেল তার নিজস্ব প্রান্তরে।
যে মস্কো নেপোলিয়নের কল্পনাকে উদ্দীপিত করে তারই স্বপ্ন দেখতে দেখতে সে এগিয়ে চলল, যে পাখিটি তার নিজস্ব প্রান্তরে মুক্তি পেল সে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল আমাদের সীমান্ত-ঘাটির দিকে, আর মনে মনে এমন সব কাহিনীর জাল বুনতে লাগল যা আদপেই না ঘটে থাকলেও সে তার সহকর্মীদের শোনাবে বলে স্থির করেছে। যা ঘটেছে তা তো আর বলার মতো কিছু নয়, কাজেই সে কথা সে বলতেও চায় না। কসাকদের সঙ্গে দেখা হতে খোঁজ-খবর করতে করতে সন্ধ্যা নাগাদ মনিব নিকলাস রশুভের খোঁজ পেল, সে তখন ইয়াংকভোতে বাস করছে। রস্তভ তখন ইলিনকে সঙ্গে নিয়ে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলি ঘুরে দেখবার জন্য ঘোড়া নিয়ে বের হবার জন্য প্রস্তুত, লাভ্রুশকাকে আর একটা ঘোড়া দিয়ে সে তাকেও সঙ্গে নিয়ে গেল।
.
অধ্যায়-৮
প্রিন্সেস মারির বিপদ কেটে গেছে এবং প্রিন্স আন্দ্রুর ধারণা এখন সে মস্কোতে নেই।
আলপাতিচ ঘোলেনস্ক থেকে ফিরে আসার পরেই বুড়ো প্রিন্স যেন সহসা স্বপ্ন থেকে জেগে উঠল। বিভিন্ন গ্রামের বেসরকারি সৈনিকদের প্রতি রণসাজে সাজবার আহ্বান জানিয়ে প্রধান সেনাপতিকে চিঠি লিখে জানিয়ে দিল, শেষমুহূর্ত পর্যন্ত বল্ড হিলসে থেকে তাকে রক্ষা করতে সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, প্রধান সেনাপতি বন্ড হিলস রক্ষার কোনো ব্যবস্থা করবে কি না, রাশিয়ার অন্যতম বৃদ্ধ সেনাপতি গ্রেপ্তার বা খুন হবে কি না, সেটা প্রধান সেনাপতিরই বিচার্য বিষয়, পরিবারের সকলকেও সে জানিয়ে দিল যে সে নিজে বল্ড হিলসেই থেকে যাবে।
