আরে, মস্ত সংবাদটা আপনারা শুনেছেন কি? প্রিন্স কুতুজভ এখন ফিল্ড-মার্শাল! সব প্রতিবাদের অবসান ঘটেছে! আমি খুব খুশি, খুব আনন্দিত! শেষপর্যন্ত একটা মানুষ হওয়া গেল!
ডিরেক্টরের পদপ্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও বহু গুণাধার লোকটি তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে ছাড়ল না যে আগে প্রিন্স ভাসিলির মতটা অন্যরকম ছিল। প্রিন্স ভাসিলির নিজের কথায়ই সে বলল, কিন্তু প্রিন্স, লোকে যে বলে তিনি অন্ধ।
এঃ! বাজে কথা! তিনি চোখে বেশ ভালোই দেখেন, একটু কেশে গম্ভীর গলায় ভাসিলি বলল, বুঝি গলার স্বর ও কাশি দিয়েই সে তার অস্বস্তিকে চাপা দিতে চায়। তিনি চোখে বেশ ভালোই দেখেন। আমি আরো খুশি হয়েছি এইজন্য যে সম্রাট তাকে সব সেনাদল এবং সমগ্র অঞ্চলের উপর পরিপূর্ণ কর্তৃত্ব দিয়েছেন–আগে কোনো প্রধান সেনাপতির এত ক্ষমতা ছিল না। তিনি হলেন দ্বিতীয় সর্বময় কর্তা, বিজয়ীর হাসি হেসে সে কথা শেষ করল।
ঈশ্বর করুন তাই যেন হয়! তাই যেন হয়! আন্না পাভলভনা বলল।
বহু গুণাধার লোকটি দরবার-মহলের রীতিনীতিতে এখনো অনভিজ্ঞ, এ ব্যাপারে আন্না পাভলভনার পূর্বেকার অভিমতকে সমর্থন করে তার প্রশস্তি-কীর্তনের উদ্দেশ্যে সে বলল : লোকে বলছে, কুতুজভকে এইসব ক্ষমতা দেবার ইচ্ছা সম্রাটের ছিল না। লোকে বলে, কোনো কুমারীর কাছে ফোকোঁদ (অশ্লীল কাব্যগ্রন্থ) পড়লে সে যেরকম লজ্জায় আরক্ত হয়ে ওঠে সম্রাটও তেমনইভাবে হেসে কুতুজভকে বলেছেন : তোমার সম্রাট ও পিতৃভূমি এই সম্মান তোমাকে দিচ্ছে।
আন্না পাভলভনা বলল, হয়তো অন্তর থেকে তিনি কথাটা বলেননি।
প্রিন্স ভাসিলি সসাৎসাহে বলে উঠল, ওঃ, না, না! সেটা অসম্ভব, কারণ আমাদের সম্রাট তো আগেও তার গুণের প্রশংসা করেছেন।
আন্না পাভলভনা বলল, ঈশ্বর করুন প্রিন্স কুতুজভ যেন সত্যিকারের ক্ষমতার অধিকারী হতে পারেন, কেউ যেন তার কাজের মধ্যে নাক গলাতে না পারে।
মহিলা কার কথা বলতে চাইছে সেটা বুঝতে পেরে প্রিন্স ভাসিলি চুপি চুপি বলল : আমি ভালো করেই জানি, কুতুজভ এ ব্যবস্থা একেবারেই পাকা করে নিয়েছেন যে জারেভিচ সেনাদলের সঙ্গেই থাকবে না। আপনি কি জানেন, সম্রাটকে তিনি কি বলেছেন?
কুতুজভ সম্রাটকে যে কথাটা বলতে পারে সেটা অনুমান করেই প্রিন্স ভাসিলি তার পুনরাবৃত্তি করল। তিনি অন্যায় করলেও আমি শাস্তি দিতে পারব না, আবার ঠিক কাজ করলেও পারব না পুরস্কৃত করতে।
ওঃ, প্রিন্স কুতুজভ খুবই জ্ঞানী লোক! আমি তাকে অনেকদিন থেকেই চিনি।
বহু গুণাধার লোকটি মন্তব্য করল, লোকে আরো বলছে, হিজ এক্সেলেন্সি আরো একটি শর্ত করিয়ে নিয়েছেন যে সম্রাট নিজেও সেনাদলের সঙ্গে থাকতে পারবেন না।
তার এই উক্তির সঙ্গে সঙ্গেই প্রিন্স ভাসিলি ও আন্না পাভলভনা তার পাশ থেকে সরে গিয়ে লোকটির এই অতিসরলতায় বিষণ্ণ চোখে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল।
.
অধ্যায়-৭
পিটার্সবুর্গে যখন এইসব ঘটছে ততক্ষণে ফরাসি বাহিনী স্মোলেনস্ক পার হয়ে ক্রমাগত মস্কোর দিকে এগিয়ে চলেছে। নেপোলিয়নের অপরাপর ইতিহাসকারের মতো ইতিহাসকার থিয়েও তার নায়কের সমর্থনে লিখেছে, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই নেপোলিয়নকে মস্কো প্রাচীরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছার মধ্যে যারা ঐতিহাসিক ঘটনার ব্যাখ্যা খোঁজে, থিয়ের্সের অভিমতও তাদের মতোই সত্য, যে রুশ ইতিহাসকাররা লিখেছে যে রুশ সেনাপতিদের কৌশলের ফলেই নেপোলিয়ন মস্কোর দিকে আকৃষ্ট হয়েছিল, থিয়ের্সের অভিমত তাদের মতোই সত্য। একজন দাবাড় যখন একটা খেলায় হারে তখন সে একান্তভাবে বিশ্বাস করে যে নিজের ভুলের জন্যই তার হার হয়েছে, আর সেই ভুলকে সে খোঁজে খেলার গোড়ার দিকে, কিন্তু সে ভুলে যায় যে খেলার প্রতিটি ধাপেই সে আরো ভুল করেছে এবং তার কোনো চালটাই সঠিক হয় নি। যেহেতু প্রতিপক্ষ তার ভুলের সুযোগটাই নিয়েছে তাই শুধু সেই ভুলটাই তার নজরে পড়ে। যুদ্ধের খেলা তো দাবা খেলার চাইতে অনেক বেশি জটিল, সে খেলা ঘটে একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে, সেখানে কোনো একটিমাত্র ইচ্ছাশক্তি নির্জীব পদার্থকে পরিচালিত করে না, নানা ইচ্ছাশক্তির অসংখ্য সংঘাতেরই ফলশ্রুতি একটি যুদ্ধ।
স্মলেনস্কের পরে প্রথমে দরগগাবুঝ ছাড়িয়ে ভিয়াজমাতে এবং পরে জারেডভা-জেমিশেতে নেপোলিয়ন একটা যুদ্ধ ঘটাতে চেয়েছিল, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে অসংখ্য ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে রুশরা সেখানে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারেনি, ফরাসি বাহিনী মস্কো থেকে সত্তর মাইল দূরবর্তী বরদিনোত পৌঁছে গেল। ভিয়াজমা থেকে নেপোলিয়ন সরাসরি মস্কো-অভিযানের হুকুম জারি করল।
মহান সাম্রাজ্যের এশিয়াস্থ রাজধানী মস্কো, আলেক্সান্দারের প্রজাদের পবিত্র নগরী মস্কো, চৈনিক প্যাগোডার মতো অসংখ্য গির্জা শোভিত মস্কো–এই মস্কোর স্বপ্ন নেপোলিয়নের কল্পনাকে থামতে দিল না। ভিয়াজমা থেকে জারেভো-জেমিশে অভিযানে রক্ষীদল, দেহরক্ষী, অনুচরবৃন্দ ও এড-ডি-কংদের সঙ্গে নিয়ে । নেপোলিয়ন এগিয়ে চলল তার লেজ-ছাঁটা হাল্কা রঙের ঘোড়ায় চেপে। তার কর্মচারী-প্রধান বের্থিয়ের পিছনে থেমে রইল অশ্বারোহী বাহিনীর হাতে বন্দি জনৈক রুশ বন্দিকে জেরা করার জন্য। পরে জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে সে নেপোলিয়নকে ধরে ফেলল।
