.
অধ্যায়-৬
মানুষের জীবনকে যে অসংখ্য নীতি অনুযায়ী ভাগ করা চলে তার মধ্যে একটি হল-যাদের মধ্যে বস্তুর প্রাধান্য আর যাদের মধ্যে আকারের প্রাধান্য। গ্রাম, মফস্বল, প্রদেশ, এমন কি মস্কোর জীবন থেকেও আলাদা করে এই শেষের শ্রেণীতে ফেলা যেতে পারে পিটার্সবুর্গের জীবনকে, বিশেষ করে তার অভিজাত জীবনকে। সে জীবনের কোনো পরিবর্তন নেই। ১৮০৫ সাল থেকে আমরা বোনাপার্তের সঙ্গে সন্ধি করেছি আবার লড়াইও করেছি, শাসনতন্ত্র রচনা করেছি আবার বাতিল করেছি, কিন্তু আন্না পাভলভনা ও হেলেনের অভ্যর্থনা কক্ষগুলির চেহারা যেমন ছিল একটি সাত বছর আগে, অপরটি পাঁচ বছর আগে-তেমনই আছে। আন্না পাভলভনার অভ্যর্থনা-কক্ষে সকলে আগের মতোই দুশ্চিন্তার সঙ্গে বোনাপার্তের সাফল্য নিয়ে আলোচনা করে এবং সবকিছুর মধ্যেই রাজ-দরবার মহলের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ ষড়যন্ত্রের ছায়া দেখতে পায়। আবার হেলেনের অভ্যর্থনা-কক্ষে ১৯১২-তেও ১৯০৮ সালের মতোই সেই মহান জাতি ও মহান পুরুষটি সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত আলোচনা চলে, ফ্রান্সের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়াতে দুঃখ প্রকাশ করা হয়ে থাকে।
সম্প্রতি সেনাবাহিনী থেকে ম্রাটের ফিরে আসার পর থেকে এই দুই পরস্পরবিরোধী মহলে কিছু উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, পরস্পরের প্রতি বিদ্রূপতার কিছু কিছু প্রকাশও ঘটেছে, কিন্তু প্রতিটি মহলই স্বীয় বৈশিষ্ট্যে অটল রয়েছে। আন্না পাভলভনার মহলে শুধু সেইসব ফরাসিদেরই প্রবেশাধিকার দেওয়া হয় যারা গোঁড়া রুশভক্ত, যারা মনে করে যে কারোরই ফরাসি থিয়েটারে যাওয়া উচিত নয়, কারণ একটা ফরাসি শিল্পীদলকে পুষতে যে খরচ হয় তা একটা সেনাদল পোষর খরচেরই অনুরূপ। তারা আগ্রহের সঙ্গে যুদ্ধের অগ্রগতির উপর নজর রাখে এবং যেসব প্রতিবেদনে আমাদের প্রশস্তি থাকে শুধু সেইগুলিই প্রচার করে। ওদিকে হেলেন ও রুমিয়ান্তসেভের ফরাসি মহলে শত্রুপক্ষের এবং যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করা হয়, আর নেপোলিয়নের সন্ধি-প্রচেষ্টাগুলির আলোচনা করা হয়।
প্রিন্স ভাসিলি এখনো নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত আছে : এই দুটি মহলের মধ্যে সেই একমাত্র যোগসূত্র। সে প্রিয় বন্ধু আন্না পাভলভনার সঙ্গে যেমন দেখা করতে চায়, তেমনই মেয়ের কূটনৈতিক অভ্যর্থনা-কক্ষেও তার যাতায়াত আছে। অবশ্য অনবরত দুই শিবিরে যাতায়াতের ফলে অনেকসময় সে সব ব্যাপারটাই গুলিয়ে ফেলে এবং আন্না পাভলভনার মহলে যেটা বলা উচিত সেটাই বলে ফেলে হেলেনের সভায়, আবার তার উল্টোও ঘটে।
সম্রাটের ফিরে আসার অনতি পরেই প্রিন্স ভাসিলি আন্না পাভলভনার বাড়িতে যুদ্ধসংক্রান্ত আলোচনা প্রসঙ্গে কঠোর ভাষায় বার্কলে দ্য তলির নিন্দা করলেও কাকে যে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করা উচিত সে বিষয়ে কিছু বলল না। বহুগুণের আধার বলে বর্ণিত জনৈক অতিথি কিন্তু যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তাব করল যে কুতুজভই একমাত্র উপযুক্ত লোক।
আন্না পাভলভনা বিষণ্ণ হাসি হেসে বলল, সম্রাটকে বিরক্ত করা ভিন্ন আর কিছুই কুতুজভ করেনি।
প্রিন্স ভাসিলি তাকে বাধা দিয়ে বলল, পরিষদের সভায় আমি বার বার বলেছি, কিন্তু তারা আমার কথা শোনেনি। আমি বলেছি, অসামরিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে কুতুজভের নির্বাচনে সম্রাট খুশি হবেন না। তারা আমার কথা শোনেনি।
সে বলতে লাগল, রাশিয়ার প্রবীণতম সেনাপতি হলেও কুতুজভের পক্ষে ট্রাইবুনালের সভাপতিত্ব করাটা কি ঠিক হবে? এত কষ্টের বিনিময়ে তিনি তো কিছুই পাবেন না! যে লোক ঘোড়ায় চড়তে জানে না, পরিষদে বসে ঘুমিয়ে পড়ে, যার নৈতিক চরিত্র অতীব খারাপ, সেরকম লোককে কেমন করে প্রধান সেনাপতি করা যেতে পারে! বুখারেস্টে তার কী সুখ্যাতি হয়েছিল! সেনাপতি হিসেবে তার যোগ্যতার বিষয় আমি কিছু বলছি না, কিন্তু আজকের মতো দিনে একটি নজদেহ, অন্ধ, সত্যিকারের অন্ধ, বৃদ্ধ মানুষকে কেমন করে ওই পদে নিয়োেগ করা চলতে পারে? অন্ধ সেনাপতি ব্যাপারটা মন্দ নয়। তিনি তো চোখেই দেখেন না। এ কি কানামাছি খেলা? তিনি তো দেখতেই পান না!
তার কথার কেউ কোনো জবাব দিল না।
২৪ জুলাই তারিখে কথাটা ঠিকই ছিল। কিন্তু ২৯ জুলাই তারিখে কুতুজভ প্রিন্স উপাধি পেল। এরমধ্যে তাকে বাতিল করার একটা ইঙ্গিত থাকতেও পারে, কাজেই প্রিন্স ভাসিলির কথাটা সেদিনও ঠিকই ছিল, যদিও সেকথা সে সাততাড়াতাড়ি বলে বেড়ায়নি। কিন্তু ৮ আগস্ট তারিখে যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে আলোচনার জন্য ফিল্ড-মার্শাল সালতিকভ, আরাকচিভ, ভিয়াজমিতিনভ, লপুখিন ও কচুবেকে নিয়ে গঠিত কমিটির একটা বৈঠক বসল। কমিটিতে সিদ্ধান্ত হল, নেতৃত্বের ঐক্যের অভাবই আমাদের পরাজয়ের কারণ, আর কুতুজভের প্রতি সম্রাটের বিরূপ মনোভাব সম্পর্কে কমিটির সদস্যগণ সম্পূর্ণ সচেতন থেকেও তারা প্রধান সেনাপতি পদে কুতুজভের নিয়োগের ব্যাপারে সুপারিশ করতে একমত হল। আর সেইদিনই সেনাদলের উপর এবং অধিকৃত সমস্ত অঞ্চলের উপর পরিপূর্ণ কর্তৃত্বসহ কুতুজভ প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হল।
৯ আগস্ট তারিখে আন্না পাভলভনার বাড়িতে সেই বহুগুণের আধার লোকটির সঙ্গে আবার প্রিন্স ভাসিলির দেখা হয়ে গেল। তরুণীদের একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর হবার বাসনায় সে ভদ্রলোক তখন আন্না পাভলভনার সঙ্গে খুবই দহরম-মহরম চালাচ্ছে। স্বীয় বাসনার সিদ্ধিতে বিজয়ীর ভঙ্গিমায় প্রিন্স ভাসিলি ঘরে ঢুকল।
