নদীর তীরে, বাঁধের উপরে, পুকুরের মধ্যে–সর্বত্রই সুস্থ, সবল, শ্বেতকায় নরদেহের মেলা। অফিসার তিমোখিন বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে একটা তোয়ালে দিয়ে গা মুছছিল, প্রিন্সকে দেখে কিছুটা বিব্রত হলেও তাকেডেকে কথা বলাটাই সে স্থির করল।
বলল, ভারি সুন্দর ইয়োর এক্সেলিন্সি, চলে আসুন না!
মুখ বেঁকিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, বড় নোংরা!
আপনার জন্য এক মিনিটের মধ্যেই পরিষ্কার করে দিচ্ছি, বলে তিমোখিন সেই অবস্থায়ই এগিয়ে গেল।
প্রিন্স স্নান করতে চাইছেন।
কোন প্রিন্স? আমাদের বলেই সকলে এত তাড়াতাড়ি জল থেকে উঠে পড়ল যে প্রিন্স তাদের বাধা দেবারও সময় পেল না। সে স্থির করল, গোলাবাড়িতেই গাটা ধুয়ে নেবে।
মাংস, দেহ, কামানের খাদ্য! কথাগুলি ভেবে নিজের বিবস্ত্র দেহের দিকে তাকিয়ে সে নিজেই শিউরে উঠল, ঠাণ্ডায় নয়, নোংরা পুকুরের জলে হুটোপাটি করতে ব্যস্ত এইসব মানুষগুলিকে দেখে তার মনে কেমন যেন একটা দুর্বোধ্য বিরক্তি ও আতংকের ভাব দেখা দিল।
.
৭ আগস্ট গোলেন সড়কের উপর তার বাসস্থান থেকে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন এইরকম লিখল :
প্রিয় কাউন্ট আলেক্সিস আন্দ্রিভিচ,-(চিঠিটা আরাকচিভকে লিখলেও সে জানে যে সম্রাট চিঠিটা পড়বে, তাই প্রতিটি শব্দ সে সাধ্যমতো মেপে মেপে বসাতে লাগল।)
আশাকরি মন্ত্রীটি (বার্কলে দ্য তলি) ইতিমধ্যেই শক্রর হাতে স্মালেনস্ক তুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা স্বেচ্ছায় ছেড়ে চলে আসাটা খুবই করুণ ও দুঃখদায়ক, এতে গোটা বাহিনীই হতাশ হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে অনেক অনুরোধ করেছিলাম, শেষপর্যন্ত চিঠিও লিখেছিলাম, কিন্তু কিছুতেই তাকে সম্মত করতে পারলাম না। আমার সম্মানের দোহাই দিয়ে বলছি, এর আগে নেপোলিয়ন কখনো এরকম বিপদে পড়েনি, তার অর্ধেক সৈন্য খুইয়েও সে মোলেনস্ক দখল করতে পারত না। আমাদের সৈন্যরা যেভাবে যুদ্ধ করেছে, এখনো করছে, তেমন যুদ্ধ তারা আগে কখনো করে নি। পনেরো হাজার সৈন্য নিয়ে আমি পঁয়ত্রিশ ঘণ্টা শত্রুকে ঠেকিয়ে রেখেছি, তাকে পরাস্ত করেছি, কিন্তু তিনি চৌদ্দ ঘন্টাও যুদ্ধ করতে রাজি হলেন না। এটা লজ্জাকর, আমাদের সৈন্যদের পক্ষে কলংকস্বরূপ, আর আমার তো মনে হয় এরপরেও তার বেঁচে থাকাই উচিত নয়। তিনি যদি জানিয়ে থাকেন যে আমাদের অনেক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তো সেটা সত্যি নয়, হয়তো চার হাজার, তার বেশি নয়, এমন কি তাও নয়, কিন্তু যদি দশ হাজারই হত, তাতেই বা কি, এটা তো যুদ্ধ! কিন্তু শত্রুপক্ষের ক্ষতি হয়েছে স্থূপাকার… ।
আর দুদিন যুদ্ধ চালালে তার কী এমন ক্ষতি হত? তারা নিজেরাই পিছিয়ে যেত, কারণ তাদের কাছে জলই ছিল না–সৈন্যদের নয়, ঘোড়ারও নয়। তিনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন পশ্চাদপসরণ করবেন না, কিন্তু হঠাৎ হুকুম পাঠালেন, সেই রাতেই পিছু হটবেন। এভাবে যুদ্ধ চালানো যায় না, হয়তো অচিরেই আমরা শত্রুকে মস্কো পর্যন্ত ডেকে নিয়ে আসব…।
একটা গুজব রটেছে যে আপনি সন্ধির কথা ভাবছেন। আমাদের এত ত্যাগ, এই পাগলের মতো পশ্চাদপসরণের পরেও আপনি সন্ধি করবেন-ঈশ্বরের ইচ্ছায় তা যেন না ঘটে! গোটা রাশিয়া তাহলে আপনার উপর ক্ষেপে যাবে, সৈনিকের পোশাক পরতে আমরা প্রত্যেকে লজ্জাবোধ করব। এই যদি অবস্থা হয়ে থাকে-রাশিয়া যতদিন পারবে, যতদিন রাশিয়ার একটি মানুষেরও দাঁড়াবার শক্তি থাকবে ততদিন আমরা যুদ্ধ করব।
সৈন্য পরিচালনার ভার একজনের উপর থাকা উচিত, দুজনের উপর নয়। আপনাদের মন্ত্রীটি মন্ত্রী হিসেবে ভালো হতে পারেন, কিন্তু সেনাপতি হিসেবে তিনি যে খারাপ তাই শুধু নয়, তিনি জঘন্য, অথচ তাঁর হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে গোটা দেশের ভাগ্য।…সত্যি, বিরক্তিতে আমি পাগল হয়ে গেছি : আমার এই দুঃসাহসিক লেখার জন্য ক্ষমা করবেন। একথা খুবই পরিষ্কার, যে লোক সন্ধির কথা বলছে, মন্ত্রীর উপর সৈন্য পরিচালনার ভার দিতে বলছে, সে লোক আমাদের সম্রাটকে ভালোবাসে না, সে চায় আমাদের সকলের সর্বনাশ। তাই আমি খোলাখুলি লিখছি : বেসরকারি বাহিনী (militia) কে ডাকুন। কারণ মন্ত্রীটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই আগন্তুকদের মস্কোর পথে নিয়ে চলেছেন। সম্রাটের এড-ডি-কং উলযোগেন সম্পর্কে প্রতিটি সৈন্যের মনে সন্দেহ জেগেছে। আমি যে তার প্রতি ভদ্র ব্যবহার করি তাই শুধু নয়, তার চাইতে প্রবীণ হয়েও কর্পোরালের মতো আমি তাকে মান্য করি। এটা আমার পক্ষে বেদনাদায়ক, তবু আমার আশ্রয়দাতা ও সম্রাটকে ভালোবেসেই আমি তাকে মান্য করি। শুধু আমাদের মতো এমন একটা সৈন্যবাহিনীকে তার মতো লোকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন বলে সম্রাটের জন্য আমার দুঃখ হয়। ভেবে দেখুন, পশ্চাদপসরণের পথে মোট পনেরো হাজারের বেশি সৈনিককে আমরা হয় হারিয়েছি, না হয়তো হাসপাতালে রেখে এসেছি, অথচ আমরা যদি আক্রমণ করতাম তাহলে এমনটি ঘটত না। ঈশ্বরের দোহাই, আমাকে বলুন এরকম ভয় পাবার জন্য রাশিয়া, জননী রাশিয়া আমাদের কী বলবে? এরকম একটা ইতর লোকের হাতে কেন আমাদের সৎ ও সাহসী পিতৃভূমিকে আমরা ছেড়ে দিচ্ছি? কেন আমাদের প্রজাদের মনে বিদ্বেষ ও লজ্জার বীজ বপন করছি। আমাদের এত ভয়, এত ত্রাস কাকে? এই অস্থিরমতি মন্ত্রীকে আমি দোষ দেই না, সে তো ভীরু, পুরু চামড়া, দীর্ঘসূত্রী-সর্বপ্রকার বদগুণের আধার। সমস্ত বাহিনী আজ শোকমগ্ন, সকলেই তাকে অভিশাপ দিচ্ছে ..
