ঘোড়াকে জিন পরাতে বলে এবং রেজিমেন্টকে মার্চ করার হুকুম দিয়ে সে তার বাবার সেই বাড়ির দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল যেখানে সে জন্মেছে, শৈশব কাটিয়েছে। পাথরের ফটকে একটাও লোক দেখতে পেল না, দরোজাটা খোলা পড়ে আছে। বাগানের পথে এর মধ্যেই ঘাস গজিয়েছে, কাঁচ-ঘরের কিছু কিছু কাঁচ ভেঙেছে, গাছের টবগুলি কিছু উল্টে পড়েছে, কিছু শুকিয়ে গেছে। মালি তারাসকে ডাকল, কেউ সাড়া দিল না। ছেলেবেলায় প্রিন্স আন্দ্রু একটা বুড়ো চাষীকে প্রায়ই ফটকে বসে থাকতে দেখত, এখন সে বাগানের একটা সবুজ আসনে বসে বাকলের জুতো তৈরি করছে।
লোকটা কালা, তাই প্রিন্স আন্দ্রুর ঘোড়ার শব্দ শুনতে পায়নি। যে আসনে বুড়ো প্রিন্স বসতে ভালোবাসত লোকটা সেই আসনটিতেই বসেছে, তার পাশে ম্যাগনোলিয়ার একটা ভাঙা শুকনো ডালে অনেকগুলো বাকলের টুকরো ঝুলছে।
প্রিন্স আন্দ্রু বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। পুরনো বাগানের বেশ কয়েকটা গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, একটা ছিট-ছিট ঘোড়া ও তার বাচ্চা সামনের গোলাপ বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মাত্র একটা খোলা জানালা ছাড়া অন্য সব খড়খড়ি বন্ধ। একটি ভূমিদাস ছেলে তাকে দেখেই বাড়ির মধ্যে ছুটে গেল। পরিবারের সকলকে পাঠিয়ে দিয়ে আলপাতিচ একাই বল্ড হিলসে আছে, ভিতরে বসে সন্ত জীবনী পড়ছে। প্রিন্স আন্দ্রু এসেছে শুনে নাকের উপর চশমা ঝুলিয়ে কোটের বোম আঁটতে আঁটতে সে সিঁড়ি বেয়ে তাড়াতাড়ি নেমে এল, একটা কথাও না বলে কাঁদতে কাঁদতে প্রিন্স আন্দ্রুর হাঁটুতে চুমো খেতে লাগল।
তারপর নিজের দুর্বলতায় নিজেই বিরক্ত হয়ে সব কথা খুলে বলতে শুরু করল। মূল্যবান সামগ্রী যা কিছু সবই বোগুচারভোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সত্তর কোয়ার্টার (১ কোয়ার্টার=একের চার হর) ফসলও গাড়ি বোঝাই করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বছর ফসল খুবই ভালো হয়েছিল, কিন্তু পাকবার আগেই সৈন্যরা এসে সব কেটে নিয়ে গেছে। চাষীদের সর্বনাশ হয়েছে, অনেকেই বোণ্ডচারভোতে চলে গেছে, কয়েকজন মাত্র এখানে আছে।
তার কথা শেষ হবার আগেই প্রিন্স আন্দ্রু শুধাল, আমার বাবা ও বোন কবে গেল? সে মস্কো যাবার কথাই বলল। কিন্তু আলপাতিচ সেটাকে বোগুচারভো যাবার দিন বলে ধরে নিয়ে জানাল যে তারা ৭ তারিখে গেছে এবং তারপরে জমিদারি সংক্রান্ত কথাতেই ফিরে গেল।
জানতে চাইল, একটা রসিদ নিয়ে সবই কি সৈন্যদের দিয়ে দেব? এখনো ছয়শো কোয়ার্টার রয়েছে।
বুড়ো মানুষটির টাকের উপর সূর্যের আলো পড়ে চকচক করছে, তার মুখের ভাব দেখেই বোঝা যায়, এসব প্রশ্নের সময় যে এখন নয় এবং নিজের দুঃখ লাঘব করার জন্যই সে কথাগুলি বলছে সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছে। তাই প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, একে কী বলি?
মুখে বলল, হ্যাঁ, তাই দাও।
আলপাতিচ বলল, বাগানে কিছু বিশৃঙ্খলা আপনার চোখে পড়েছেই, কিন্তু ওটা বন্ধ করা অসম্ভব। তিন রেজিমেন্ট সৈন্য এখানে রাত কাটিয়ে গেছে, তাদের অধিকাংশই অশ্বারোহী। তাদের কমান্ডিং অফিসারের নাম ও পদমর্যাদা আমি টুকে রেখেছি, একটা নালিশ পেশ করতে হবে।
প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আচ্ছা, তুমি এখন কি করবে? সৈন্যরা যদি জায়গাটা দখল করে নেয় তাহলেও কি এখানেই থাকবে?
আলপাতিচ প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে মুখ ফেরাল, হঠাৎ গম্ভীরভাবে দুই হাত ঊর্ধ্বে তুলল। সোচ্চারে বলল, তিনিই আমার আশ্রয়! তার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক!
একদল চাষী খালি মাথায় মাঠ পার হয়ে প্রিন্সের দিকেই আসছে।
আলপাতিচের উপর ঝুঁকে পড়ে প্রিন্স আন্দ্রুর বলল, আচ্ছা, বিদায়! তুমি চলে যাও, যা নিতে পার সঙ্গে নিয়ে যাও, আর ভূমিদাসদের বল রিয়াজান জমিদারিতে অথবা মস্কোর নিকটস্থ জমিদারিতে চলে যেতে।
প্রিন্স আন্দ্রুর পা জড়িয়ে ধরে আলপাতিচ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার হাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু ঘোড়র পেটে খোঁচা মেরে ছায়াবীথি ধরে জোরকদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
বুড়ো মানুষটি তখনো সাজানো বাগানেই বসে আছে। দুটি ছোট মেয়ে কাঁচ-ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এল। তাদের ঘাঘরার কোঁচড়ে কতকগুলি কুড়ানো কুল। তারা প্রিন্স আন্দ্রুর একেবারে সামনে পড়ে গেল। ছোট মনিবকে দেখে বুড়ো লোকটি ভয়ার্ত চোখে মেয়ে দুটিকে টেনে নিয়ে একটা বার্চ গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
সে যে তাদের দেখতে পেয়েছে সেটা বুঝতে না দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু চকিতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। ভীত ছোট মেয়েটির জন্য তার দুঃখ হল, তার দিকে তাকাতেও ভয় পেল, তবু তাকে দেখবার একটা দুর্বার বাসনা তাকে পেয়ে বসল। মেয়ে দুটিকে দেখে সে যেন অনুভব করল, তার স্বার্থ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা মানবিক স্বার্থও জগতে আছে, আর সেগুলির দাবি তার নিজের স্বার্থের দাবির মতোই সঙ্গত, সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তি ও সান্ত্বনার একটা নতুন অনুভূতি জাগল তার মনে। সে আর একবার তাদের দিকে ফিরে তাকাল। নিজেদের বিপদ কেটে গেছে বুঝে লুকোবার জায়গা থেকে একলাফে বেরিয়ে এসে তারা কিচির-মিচির করতে করতে ঘাঘরা তুলে মাঠের ঘাসের উপর দিয়ে ছুটে চলেছে।
এতক্ষণে ধূলি ধূসরিত বড় রাস্তা ছেড়ে চলবার জন্য প্রিন্স কিছুটা আরাম বোধ করছে। বল্ড হিলসের অদূরেই বড় রাস্তায় পড়ে কিছুটা এগিয়ে একটা ছোট পুকুরের বাঁধের পাশে বিশ্রামরত সৈন্যদের সে ধরে ফেলল। একটা বেজে গেছে। লাল বলের মতো সূর্যটা কালো কোটের ভিতর দিয়ে এসে তার পিঠটাকে যেন জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দিচ্ছে। গুঞ্জনরত সৈন্যদের মাথার উপরে ধুলোর মেঘ যেন নিশ্চল হয়ে ঝুলে আছে। বাতাস নেই। বাধটা পার হতেই পুকুরের তাজা সোঁদা গন্ধ প্রিন্স আন্দ্রুর নাকে এল। যত নোরাই হোক তবু তার ইচ্ছা হল জলে নামে, সে পুকুরের চারদিকটা ভালো করে তাকিয়ে দেখল। সৈনিকদের বিবস্ত্র, শাদা শরীর, তাদের ইট-লাল হাত, গলা ও মুখ জলের মধ্যে হুটোপাটি করায় পুকুরের ঘোলা সবুজ জল বাঁধ উপচে ফুট খানেকের বেশি উঠে গেছে। হাসি ও হুল্লোড়ে উন্মত্ত এই সব শাদা, বিবস্ত্র মানুষগুলি নোংরা পুকুরের জলে বোতলে ভর্তি মাছের মতো এমনভাবে হুটোপাটি করছে যে তার নিজের ফুর্তির ইচ্ছাটাকে কেমন যেন শোচনীয় মনে হতে লাগল।
