প্রধান কর্তাটি জার্মান উচ্চারণে চেঁচিয়ে বলল, আপনি না একজন কর্নেল? দলের আর একজন বলল, আপনার চোখের সামনে বাড়িঘর পুড়ছে, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন! এর অর্থ কি? আপনাকে এর কৈফিয়ৎ দিতে হবে! কথাগুলি বলল বের্গ, সে এখন প্রধান কর্তার সহকারী হয়েছে, বের্গের মতে পদটি মনের মতো আর সকলের নজরে পড়বার মতোও বটে।
প্রিন্স আন্দ্রু চোখ তুলে তাকাল, কোনো জবাব না দিয়ে আলপাতিচের সঙ্গেই কথা বলতে লাগল।
তাদের বল, ১০ই পর্যন্ত তাদের খবরের জন্য অপেক্ষা করব, যদি ১০ইর মধ্যে তাদের যাত্রার খবর না পাই তাহলে সব ফেলে রেখে আমি নিজেই বল্ড হিলসে চলে যাব।
প্রিন্স আন্দ্রুকে চিনতে পেরে বের্গ বলল, প্রিন্স, কথাগুলি আমাকে বলতে হল কারণ আমাকে হুকুম মেনে চলতে হয়, কারণ আমি সবসময়ই ঠিক ঠিক মতো হুকুম মেনেই চলি…তুমি আমাকে মাফ কর।
আগুনের মধ্যে কি যেন ফাটল। মুহূর্তের জন্য আগুনটা কমে গেল, ছাদের নিচ থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠতে লাগল। আর একটা শব্দ করে একটা ভারি কিছু ভেঙে পড়ল।
গোলাবাড়ির ছাদ ভেঙে পড়ার শব্দের প্রতিধ্বনি করে সকলে চেঁচিয়ে উঠল : উ-রু-রু! পোড়া ফসলের একটা পিঠে-পিঠে গন্ধ পাওয়া গেল। আবার আগুনের শিখা জ্বলে উঠল, উজ্জীবিত, আনন্দিত, ক্লান্ত মুখগুলি উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
পশমী কোট-পরা লোকটি দুই হাত তুলে চিৎকার করে বলল, ভালোই হল হে বাছারা! আবার জ্বলে উঠছে। চমৎকার!
আরে, এ যে মালিক স্বয়ং, কয়েকজন চেঁচিয়ে বলল।
প্রিন্স আন্দ্রু আলপাতিচকে বলল, আচ্ছা, তাহলে যেমন যেমন বললাম তেমনটি তাদের বলে দিও। বের্গ চুপচাপ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে একটি কথাও না বলে সে গলি-পথ ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
.
অধ্যায়-৫
স্মোলেনস্ক থেকে সৈন্যরা পশ্চাদপসরণ করছে, পিছন থেকে তাড়া করছে শত্রু। ১০ আগস্ট প্রিন্স আন্দ্রুর নেতৃত্বাধীন সেনাদলটি বল্ড হিলসে যাবার পথকে পাশ কাটিয়ে বড় রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে। তিন সপ্তাহের বেশি হয়ে গেল গরম ও অনাবৃষ্টি সমানে চলেছে। প্রত্যেকদিন পেঁজা তুলোর মতো মেঘ আকাশে ভেসে বেড়ায়, মাঝে মাঝে সূর্যকে ঢেকে ফেলে, কিন্তু সন্ধ্যার দিকে আকাশ আবার পরিষ্কার হয়ে যায়, লাল-বাদামি কুয়াশার মধ্যে সূর্য অস্ত যায়। রাতের ভারি শিশিরপাতে ধরণি সতেজ হয়ে ওঠে। মাঠের ফসল রোদে পুড়ছে, বীজগুলি ঝরে পড়ছে। বিল-বাওর শুকিয়ে গেছে। রোদে-পোড়া মাঠে খাবার না খেয়ে গরু-মোষরা ক্ষিধেয় হাম্বা-হাম্বা ডাকছে। একমাত্র রাতের বেলা যখন জঙ্গলে শিশির পড়ে তখন একটা সতেজ ভাব চোখে পড়ে, কিন্তু যে বড় রাস্তা ধরে সৈন্যরা মার্চ করে চলেছে সেখানে তিলমাত্র সজীবতা চোখে পড়ে না : ছ ইঞ্চিরও বেশি ধুলোয় ঢাকা পথে সজীবতার চিহ্নমাত্র নেই, দিনের শুরু হতেই মার্চ শুরু হয়ে যায়। কামানবাহী গাড়ি ও মালবাহী গাড়িগুলো সেই ঘন ধুলোর ভিতর দিয়ে নিঃশব্দে এগিয়ে চলে, গাড়ির চাকা পর্যন্ত ধুলো ওড়ে, পদাতিক বাহিনী সেই গরম, দমবন্ধ করা গরম ধুলোর ভিতর গোড়ালি পর্যন্ত ডুবিয়ে এগিয়ে চলে, ধুলোর সে গরম রাতেও ঠাণ্ডা হয় না। সূর্য যত উপরে উঠতে থাকে, সেই ধুলোর মেঘও ততই উপরে উঠতে থাকে, গরম ধুলোর পর্দার ভিতর দিয়ে খালি চোখেও সূর্যের দিকে তখন তাকানো যায়, মেঘহীন আকাশে সূর্যটাকে দেখায় একটা রক্তবর্ণ গোলকের মতো। বাতাস নেই, সেই নিশ্চল আবহাওয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসে। নাক ও মুখের উপর রুমাল বেঁধে সৈন্যরা এগিয়ে গেল। যখনই কোনো গ্রামের পাশে পৌঁছয় তখন সকলে কুয়োর ধারে ছুটে যায়, জলের জন্য মারামারি করে, জলে টান পড়ে কাদা পর্যন্ত নেমে যায়।
একটা রেজিমেন্টের ভার প্রিন্স আন্দ্রুর ঘাড়ে, তাদের বিধি-ব্যবস্থা করা, ভালো-মন্দের দিকে লক্ষ রাখা, হুকুম নেওয়া ও হুকুম দেওয়া–এই নিয়েই সে ডুবে থাকে। স্মোলেনস্ক জ্বালিয়ে দিয়ে তাকে ছেড়ে আসা তার জীবনের একটা যুগান্তকারী ঘটনা। শত্রুর প্রতি এক বিচিত্র ক্রোধের অনুভূতি তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে নিজের দুঃখ। রেজিমেন্টের কাজেই সে নিবেদিত প্রাণ, নিজের সৈন্য ও অফিসারদের প্রতি সে সুবিবেচক ও সদয় । রেজিমেন্টে সকলে তাকে বলে, আমাদের প্রিন্স, তার জন্য গর্ববোধ করে, তাকে ভালোবাসে। কিন্তু রেজিমেন্টের তিমোখিনদের মতো শুধু সেইসব লোকদের প্রতিই সে সদয় ও ভদ্র যারা তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন, অন্য জগতের মানুষ, যারা তার অতীতকে জানে না এবং বোঝে না। কিন্তু যেই কোনো পরিচিত লোকের সঙ্গে অথবা কর্মচারীদের কারো সঙ্গে তার দেখা হয়, সঙ্গে সঙ্গে তার গায়ে যেন কাঁটা ফুটে ওঠে, তার মনে দেখা দেয় বিদ্বেষ, বিদ্রূপ, আর ঘৃণা। যা কিছু অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয় তাই তার কাছে অবাঞ্ছিত, কাজেই পূর্ব পরিচিতদের সঙ্গে ব্যবহারে সে চেষ্টা করে শুধু নিজের কর্তব্যটুকু পালন করতে, তাদের প্রতি অসঙ্গত ব্যবহার না করতে।
বস্তুত, প্রিন্স আন্দ্রুর চোখে সবকিছুই অন্ধকার ও বিষণ্ণ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে সেইদিন থেকে যেদিন ৬ আগস্ট তারিখে সে ম্যালেনস্ক ছেড়ে এসেছে। (তার ধারণা শহরটা রক্ষা করা যেত এবং রক্ষা করাই উচিত ছিল) এবং যেদিন তার নিজের হাতে গড়া বড় আদরের বন্ড হিলস-কে লুণ্ঠনকারীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে তার রুগ্ন বাবাকে মস্কো পালিয়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই রেজিমেন্টকেই ধন্যবাদ যে অন্তত তার ভাবনা নিয়েই সে সময় কাটাতে পারছে। দুদিন আগেই সে খবর পেয়েছে যে তার বাবা, ছেলে ও বোন মস্কো রওনা হয়ে গেছে। তাই বল্ড হিলসে কিছু করার না থাকলেও যেন নিজের দুঃখকে বাড়িয়ে তুলতেই প্রিন্স আন্দ্রু স্থির করল, তাকে একবার সেখানে যেতেই হবে।
