সন্ধ্যার দিকে কামানের গর্জন থেমে এল। আলপাতিচ ঘর থেকে বেরিয়ে দরোজায় দাঁড়াল। সন্ধ্যার পরিষ্কার আকাশ ধোয়ায় ঢেকে আছে, তার ভিতর দিয়ে অনেক উঁচুতে কাস্তের মতো নতুন চাঁদটাকে আশ্চর্য দেখাচ্ছে। গোলাগুলির শব্দ থেমে যাওয়ায় শহরটা কেমন যেন চুপ হয়ে গেছে, শুধু মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে পায়ের শব্দ, আর্তনাদ, দূরাগত চিৎকার, আর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া আগুনের ফট-ফট শব্দ। রাধুনিটির আর্তনাদও কমেছে। নানারকম পোশাকধারী সৈন্যরা পথে পথে হাঁটছে বা ইতস্তত ছুটছে-ভাঙা পিঁপড়ের ঢিবি থেকে পিঁপড়েগুলো যেভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ঠিক সেইভাবে। আলপাতিচের চোখের সামনেই কয়েকটি সৈনিক ফেরাপভের উঠোনে ঢুকে গেল। আলপাতিচ ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। একটা পশ্চাদপসরণকারী রেজিমেন্ট এসে ভিড় করে রাস্তাটাই আটকে ফেলল।
আলপাতিচকে দেখে একজন অফিসার বলল : শহর পরিত্যক্ত হচ্ছে। পালাও, পালাও! তারপর সৈন্যদের দিকে ফিরে বলল : লোকের উঠোনে ঢোকার মজাটা দেখাচ্ছি।
আলপাতিচ বাড়ির ভিতর ফিরে গিয়ে কোচোয়ানকে ডেকে তখনই যাত্রা করতে বলল। ফেরাপভের গোটা পরিবারটিও তাদের পিছন পিছনই বেরিয়ে এল। মেয়েরা এতক্ষণ চুপচাপ ছিল, হঠাৎ গোধূলির অস্পষ্ট আলোয় আগুন ও ধোয়া দেখতে পেয়ে নতুন করে কান্না জুড়ে দিল, আর যেন তারই জবাব দিতে রাজপথের নানাদিক থেকে ভেসে এল আর্ত কণ্ঠস্বর। চালার ভিতর আলপাতিচ ও কোচোয়ান কাঁপা হাতে ঘোড়াগুলোকে গাড়িতে যুততে লাগল।
ফটক দিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে আলপাতিচ দেখতে পেল, জনাদশেক সৈন্য ফেরাপভের খোলা দোকানে ঢুকে গলা ছেড়ে কথা বলছে আর তাদের থলেয় ও বস্তায় ভরছে ময়দা আর সূর্যমুখীর বীচি। ঠিক তখনই ফেরাপভ বাইরে থেকে ফিরে দোকানে ঢুকল। সৈন্যদের দেখে চিৎকার করতে গিয়েও হঠাৎ সে থেমে গেল, তারপর নিজের মাথার চুল টেনে ধরে একই সঙ্গে কাঁদতে কাঁদতে ও হাসতে হাসতে বলল, লুট কর, সব লুট কর বাছারা! ঐ শয়তানরা যেন কিছু না পায়! বলতে বলতে সে নিজেই কয়েকটা বস্তা রাস্তায় ফেলে দিল।
কয়েকটি সৈনিক ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল, অন্যরা থলেভর্তি করার কাজেই ব্যস্ত রইল। আলপাতিচকে দেখতে পেয়ে ফেরাপভ তার দিকে মুখ ফিরিয়ে চিৎকার করে বলল :
রাশিয়ার হয়ে গেল! আমি নিজেই জ্বালিয়ে দেব। আমরাও শেষ হয়ে গেলাম!… ফেরাপত্তভ উঠোনের দিকে ছুটে গেল।
সৈন্যরা জলস্রোতের মতো এগিয়ে চলেছে, ফলে রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ আটকে গেছে, বের হতে না পেরে আলপাতিচ অপেক্ষা করতে লাগল। ফেরাপভের বৌ ও ছেলেমেয়েরাও একটা গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে, কতক্ষণে পথ খুলবে কে জানে।
রাত হল। আকাশে তারা ফুটল। ধোয়ার আড়াল থেকে নতুন চাঁদ উঁকি দিল। সারি সারি সৈন্য ও অন্য যানবাহনের ফাঁকে ফাঁকে এগিয়ে এসে আলপাতিচের গাড়ি এবং সরাইওয়ালার বৌয়ের গাড়ি নীপার নদীর উত্রাইয়ের মুখে পৌঁছে থেমে গেল। চৌমাথার মোড়ের কাছে একটা গলিতে একটা বাড়ি ও কয়েকটা দোকান পুড়ছে। আগুন প্রায় নিভে এসেছে। সেখানে অনেক মানুষের ভিড় ও হৈ-হল্লা। গাড়িটা বেশ কিছুক্ষণ এগোতে পারবে না বুঝতে পেরে আলপাতিচ গাড়ি থেকে নেমে অগ্নিকাণ্ড দেখতে এগিয়ে গেল। সৈনিকরা অনবরত যাওয়া-আসা করছে। দুটি সৈনিক ও পশমী কোট-পরা একটি লোক একটা জ্বলন্ত কড়ি-কাঠকে টানতে টানতে রাস্তার ওপারের উঠোনে নিয়ে যাচ্ছে, অন্যরা নিয়ে যাচ্ছে আঁটি-আঁটি খড়।
ওদিকে একটা উঁচু গোলাবাড়ি জ্বলছে। সেখানে অনেক মানুষের ভিড়। আলপাতিচ সেইদিকে এগিয়ে গেল। দেয়ালগুলো জ্বলছে, পিছনের দেয়ালটা ভেঙে পড়েছে, কাঠের ছাদটা পড়-পড়, বরগাগুলিও জ্বলছে। ভিড়ের লোকজন ছাদটা ভেঙে পড়ার জন্যই অপেক্ষা করছে, আলপাতিওঁ তাই দেখছে।
আলপাতিচ। হঠাৎ পরিচিত গলায় কে যেন বুড়ো মানুষটিকে ডাকল।
ছোট প্রিন্সের গলা চিনতে পেরে আলপাতিচ সঙ্গে সঙ্গে বলল, আমাদের বাঁচান! ইয়োর এক্সেলেন্সি!
ভিড়ের পিছনে ঘোড়ার পিঠে বসে প্রিন্স আন্দ্রু আলপাতিচের দিকে তাকিয়ে ছিল।
তুমি এখানে কেন? সে শুধাল।
আপনার…ইয়োর এক্সেলেন্সি, বিড়বিড় করে কথা বলতে গিয়েই আলপাতিক ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সত্যি কি আমাদের সর্বনাশ হয়েছে? কথা!…
প্রিন্স আন্দ্রু আবার বলল, তুমি এখানে কেন?
ঠিক সেইসময় আগুনটা জ্বলে ওঠায় তরুণ মনিবের ক্লান্ত, বিবর্ণ মুখটা সে দেখতে পেল। কেন সে এখানে এসেছে, আর এখন যেতে পারছে না সেই কথাই সে বুঝিয়ে বলল।
তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু একটা নোট-বই বের করল, একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে হাঁটুটা উঁচু করে তার উপর রেখে পেন্সিল দিয়ে লিখতে লাগল। বোনকে লিখল :
ম্মেলনস্ক আত্মসমর্পণ করতে চলেছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই শত্রুরা বন্ড হিলস দখল করে নেবে। অবিলম্বে মস্কো যাত্রা কর । কখন রওনা হচ্ছ আমাকে জানাও। বিশেষ দূত মারফৎ উসভিয়াঝ-এ খবর দাও।
লেখা শেষ করে কাগজটা আলপাতিচের হাতে দিয়ে প্রিন্সেস, তার ছেলে ও ছেলের শিক্ষকের যাত্রার কি ব্যবস্থা করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে কোথায় তাকে জানিয়ে দিতে হবে সব কথা প্রিন্স আন্দ্রু তাকে বুঝিয়ে বলে দিল। কথা শেষ করার আগেই সেনাদলের জনৈক প্রধান কর্তা দলবলসহ ঘোড়ায় এসে হাজির হল।
