একথা শুনে আলপাতিচ এমনভাবে ঘাড় নাড়ল যেন কাজটা সে সমর্থনই করছে। লোকটার কথায় কান দিয়ে সে সরাইওয়ালার ঘরের উল্টো দিকের ঘরের দরোজার দিকে এগিয়ে গেল, যেসব জিনিস সে কিনেছে সব সেখানেই রাখা হয়েছে।
তুমি পশু, তুমি খুনী, বলতে বলতে একটি শুকনো, বিবর্ণ স্ত্রীলোক দরোজা দিয়ে ছুটে বেরিয়ে এসে সিঁড়ি ভেঙে উঠোনে নেমে এল। তার কোলে একটি বাচ্চা, মাথার রুমাল ছেঁড়া।
তার পিছন পিছন বেরিয়ে এল ফেরাপন্তভ, কিন্তু আলপাতিচকে দেখে ওয়েস্টকোটটা টেনে তুলে মাথার চুল ঠিক করে একটা হাই তুলল, তারপর আলপাতিচকে অনুসরণ করে উল্টো দিকের ঘরটাতে ঢুকল।
এরই মধ্যে যাচ্ছ?
তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জিনিসপত্র গুছিয়ে আলপাতিচ জানতে চাইল তার কত পাওয়া হয়েছে।
হিসাব করে দেখতে হবে। আচ্ছা, তুমি তো শাসনকর্তার বাড়ি গিয়েছিলে? কি স্থির হল? ফেরাপভ শুধাল।
আলপাতিচ জবাব দিল, শাসনকর্তা স্পষ্ট করে কিছু বলেনি।
ফেরাপভ বলল, এইসব ব্যবসাপত্তর গুটিয়ে আমরা কেমন করে চলে যাব বল? দরগোবুঝ পর্যন্ত একটা বোঝাই গাড়ি নিতে দিতে হবে সাত রুবল। আমিও বলে দিয়েছি, যারা এত টাকা দাবি করে তারা খৃষ্টান নয়। এদিকে গত বৃহস্পতিবারে সেলিভানভ আচ্ছা একটা দাও মেরেছে-বস্তাপ্রতি নয় রুবল দামে সেনাদলের কাছে ময়দা বিক্রি করে দিয়েছে। একটু চা খাবে তো?
চা খেতে খেতে তারা অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করল। তৃতীয় কাপ শেষ করে উঠতে উঠতে ফেরাপন্তভ বলল, আচ্ছা, এখন যেন অনেকটা শান্ত হয়ে এসেছে। আমাদের নিশ্চয় একহাত নিয়েছে। হুকুম ছিল, শত্রুকে যেন ঢুকতে দেওয়া না হয়। কাজেই মনে হচ্ছে…লোকে বলছে, এই তো সেদিন ম্যাথু আইভনিচ প্লাতভ তাদের একেবারে মারিনা নদী পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে একদিনে আঠারো হাজারকে ডুবিয়ে মেরেছে।
পোটলা-পুঁটলি একত্র করে আলপাতিচ সেগুলি কোচয়ানের হাতে তুলে দিল, তারপর সরাইওয়ালার সঙ্গে হিসাব করতে বসল। একটা ছোট গাড়ি ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেল, তার চাকা, ক্ষুর ও ঘন্টার শব্দ শোনা গেল।
বেলা পড়ে এসেছে। রাস্তার অর্ধেকটার উপর ছায়া পড়েছে, বাকি অর্ধেকটা রোদে ঝলমল করছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আলপাতিচ দরোজার কাছে গেল। হঠাৎ অনেক দূর থেকে একটা বিচিত্র শিসের শব্দ ভেসে এল, শোনা গেল ধপধপ শব্দ, তার ঠিক পরেই শোনা গেল কামানের গর্জন, ঘরের জানালাগুলো খট-খট করে উঠল।
সে বাইরে গিয়ে পথে নামল। দুটি লোক ছুটতে ছুটতে তার পাশ দিয়ে সেতুর দিকে চলে গেল। নানা দিক থেকে সেই শিস এবং কামানের গোলা ফাটার ও গোলার টুকরোগুলো শহরের উপর ছিটকে পড়ার শব্দ আসতে লাগল। কিন্তু শহরের বাইরে গোলাগুলির যে শব্দ হচ্ছে তার তুলনায় এ শব্দ এতই অস্পষ্ট যে তা লোকজনের কানেই গেল না। নেপোলিয়নের হুকুমে চারটের পর থেকে যে একশ ত্রিশটা কামান আনা হয়েছে তা থেকেই শহরের উপর বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে। লোকজনরা প্রথমে এই গোলাবর্ষণের অর্থ বুঝতে পারেনি।
প্রথমে গোলা ও বোমা পড়ার শব্দে লোকজন শুধু কৌতূহলই বোধ করছিল। চালার নিচে দাঁড়িয়ে ফেরাপভের বৌ এতক্ষণ পর্যন্ত কান্নাকাটি চালিয়ে এবার চুপ করল, বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ফটকের কাছে গিয়ে নীরবে লোকজনদের দিকে তাকিয়ে সেই শব্দ শুনতে লাগল।
রাধুনি ও দোকানের সহকারীটিও ফটকে এসে দাঁড়াল। মাথার উপর দিয়ে যে গোলাগুলিগুলো ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে উড়ে যাচ্ছে, একান্ত কৌতূহলের সঙ্গে সকলেই সেগুলোকে একবার দেখতে চেষ্টা করছে। কয়েকটি লোক মোড় ঘুরে কথা বলতে বলতে এগিয়ে এল।
একজন বলল, কী শক্তি দেখেছ! বাড়ির ছাদ ও সিলিং উড়িয়ে একেবারে ছাতু করে দিল।
আর একজন বলল, মাটিটাকে খুঁড়ে ফেলল শুয়োরের মতো।
প্রথম লোকটি হেসে উঠল, ভারি চমৎকার, এতে মনে সাহস আসে! ভাগ্য ভালো যে তুমি লাফ দিয়েছিলে, নইলে তো তোমাকে একেবারে সাফ করে দিত!
আরো লোক এসে জড় হল। নানা আলোচনা হতে লাগল। ইতিমধ্যে আরো বেশি সংখ্যায় কামানের গোলা ও খোল শোঁ শোঁ শব্দে মাথার উপর দিয়ে অনবরত উড়ে যেতে লাগল, কোনোটাই তাদের কাছাকাছি পড়ল না, সবই উড়ে চলে গেল, আলপাতিচ গাড়িতে উঠছে। সরাইওয়ালা ফটকে দাঁড়িয়ে আছে।
রাধুনিটি লাল ঘাঘরা পরে আস্তিন গুটিয়ে এককোণে দাঁড়িয়ে সকলের কথাবার্তা শুনছিল। তাকে ধমক দিয়ে সরাইওয়ালা বলল, ওখানে হাঁ করে কি দেখছ?
কী আশ্চর্য ব্যাপার! বলে চেঁচিয়ে উঠেই মনিবের গলা শুনে আস্তিন নামিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
আবার সেই শিসের শব্দ, কিন্তু এবার খুব কাছে, একটা ছোট পাখির মতো শো করে নিচে নেমে এল, রাস্তার মাঝখানে একটা আগুনের শিখা ঝিলিক দিল, একটা কিছু ফাটল, রাস্তাটা ধোয়ায় ঢেকে গেল।
হারামজাদী! ওখানে কি হচ্ছে? সরাইওয়ালা রাঁধুনির দিকে ছুটে গেল।
ঠিক সেইমুহূর্তে নানাদিক থেকে নারীকণ্ঠের করুণ আর্তনাদ ভেসে এল, বাচ্চাটা ভয় পেয়ে কান্না জুড়ে দিল, ভিড়ের লোকজনরা, পাংশুমুখে রাঁধুনিকে ঘিরে দাঁড়াল। তার চিৎকারই সবচাইতে জোরে শোনা যাচ্ছে।
ও-হো-হো! বাছারা আমার, বাবারা আমার! আমাকে মেরে ফেলো না! বাবারা আমার!…।
পাঁচ মিনিট পরে রাস্তায় একটি লোকও রইল না। বোমার টুকরো লেগে রাঁধুনিটির উরু ভেঙেছে। তাকে রান্নাঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আলপাতি, তার কোচোয়ান, ফেরাপভের বৌ ও ছেলেমেয়েরা, বাড়ির কুলি–সকলেই মদের ঘরে বসে কান পেতে আছে। কামানের গর্জন, উড়ন্ত গোলার ফুলকি, রাঁধুনিটির করুণ আর্তনাদ,-একমুহূর্তও এসবের বিরাম নেই।
