শাসনকর্তার বাসভবনের সামনে আলপাতিচ দেখতে পেল অনেক লোকের ভিড়, কসাকরাও আছে শাসনকর্তার দূরপাল্লার গাড়িটিও দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফটকে দুইজন ভূস্বামীর সঙ্গে তার দেখা হল। তাদের একজনকে সে চেনে। পুলিশের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন সেই লোকটি রেগে বলছে :
জানেন এটা ঠাট্টার কথা নয়। আপনি যদি একা হন তো কোনো কথা নেই। কথায় বলে, একজনের বিপদ হলে একজনই যাবে, কিন্তু এ যে তেরোজনের একটা পরিবার ও সমস্ত সম্পত্তির ব্যাপার।…এরা আমাদের সর্বনাশ করে দিল! কেমনধারা শাসনকর্তা এরা সব? এদের ফাঁসি দেওয়া উচিত-ডাকাতের দল!…
হয়েছে, হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আর একজন বলল।
শুনুক না! আমি কার তোয়াক্কা করি? আমরা তো কুকুর নই, কথাগুলি বলে পুলিশের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন মুখ ঘোরাতেই আলপাতিচকে দেখতে পেল।
আরে, ইয়াকভ আলপাতি, তুমি কি জন্য এসেছ?
হিজ এক্সেলেন্সির হুকুম, শাসনকর্তার সঙ্গে দেখা করতে হবে, কোটের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে আলপাতিচ সগর্বে জবাব দিল। …তিনি হুকুম করেছেন, আসল অবস্থাটা জেনে যেতে হবে।
তাই যাও, জেনে এস, কুদ্ধ ভদ্রলোক চেঁচিয়ে বলল। এরা সব এমন হাল করে তুলেছে যে না আছে একটা গাড়ি, না কিছু!…ওই যে আবার শুনতে পাচ্ছ? যেদিক থেকে গুলির শব্দ ভেসে এল সেইদিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল।
আমাদের সর্বনাশ করে ছাড়ল…ডাকাতের দল! বলতে বলতে সে ফটকের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।
আলপাতিচ মাথা দুলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল। প্রতীক্ষা-ঘরে ব্যবসায়ী স্ত্রীলোক ও কর্মচারীরা নিঃশব্দে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে আছে। শাসনকর্তার ঘরের দরোজা খুলল, সকলেই এগিয়ে গেল। জনৈক কর্মচারী দৌড়ে বেরিয়ে এসে একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলল, গলায় ক্রুশ-ঝোলানো একজন কর্মচারী ভিতরে আসতে বলেই অদৃশ্য হয়ে গেল। আলপাতিচ সামনে এগিয়ে গেল এবং কর্মচারীটি আবার বেরিয়ে আসতেই একটা হাত বোতাম-আঁটা কোটের উপর রেখে তাকে ডেকে দুটো চিঠি তার হাতে দিল।
প্রধান সেনাপতি প্রিন্স বলকনস্কির কাছ থেকে হিজ অনার ব্যারন আশকে, এমন গম্ভীরভাবে সে কথাগুলি বলল যে কর্মচারীটি তার দিকে ঘুরে চিঠি দুখানা নিল।
কয়েক মিনিট পরেই আলপাতিচকে ভিতরে ডেকে শাসনকর্তা তাড়াতাড়ি করে তাকে বলল :
প্রিন্স ও প্রিন্সেসকে জানিও যে আমি কিছুই জানতাম না, সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নির্দেশমতোই আমি কাজ করেছি-এই নাও… একটা কাগজ আলপাতিচের হাতে দিল। তবু প্রিন্স যখন অসুস্থ তখন আমার পরামর্শ হল, তাদের মস্কো চলে যাওয়াই উচিত। আমিও এখনই রওনা হচ্ছি। তাদের বলে দিও…
শাসনকর্তার কথা শেষ হল না, ধূলিধূসরিত, ঘর্মাক্তদেহে জনৈক কর্মচারী ছুটে ঘরে ঢুকে ফরাসিতে শাসনকর্তাকে কি যেন বলল। শাসনকর্তার মুখে ত্রাসের চিহ্ন ফুটে উঠল।
আলপাতিচের দিকে মাথা নেড়ে চলে যাও বলেই সে কর্মচারীটিকে প্রশ্ন করতে শুরু করল।
আলপাতিচ বেরিয়ে আসতে সকলেই উৎসুক, ভয়ার্ত, অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। গুলি-গোলার শব্দ ক্রমেই বাড়ছে। আলপাতিচ দ্রুতগতিতে সরাইখানায় ফিরে গেল। শাসনকর্তা তাকে যে কাগজখানা দিয়েছে তাতে লেখা আছে, আপনাকে নিশ্চিত করে বলছি, এখনো পর্যন্ত স্মোলেনঙ্কের তিলমাত্র বিপদ নেই, আর কোনোরকম বিপদ ঘটবার সম্ভাবনাও নেই। একদিক থেকে আমি আর অন্যদিক থেকে প্রিন্স ব্যাগ্রেশন এগিয়ে আসছে স্মোলেনঙ্কের আগেই একত্রে মিলিত হবে, ১১ তারিখেই সে মিলন ঘটবে, যে প্রদেশের নিরাপত্তার ভার আপনার উপর ন্যস্ত আছে সেখানকার সহকর্মী বন্ধুদের রক্ষা করতে সেনাদলের সম্মিলিত শক্তি ততদিন পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে যতদিন শত্রুসৈন্য আমাদের পিতৃভূমি থেকে বিতাড়িত না হবে, অথবা আমাদের সাহসী সেনাদলের শেষ যোদ্ধাটির মৃত্যু না হবে। এর থেকেই বুঝতে পারবেন যে আলেঙ্কের অধিবাসীদের আশ্বাস দেবার সম্পূর্ণ অধিকার আপনার আছে, কারণ এমন দুটি সাহসী সেনাদলের দ্বারা সুরক্ষিত থেকে তারা জয়লাভ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। (১৮১২ সালে স্মোলেনস্কের অসামরিক শাসনকর্তা ব্যারন আশকে প্রেরিত বার্কলে দ্য তলির নির্দেশ।)
লোকজন উদ্বেগের সঙ্গে রাজপথে ঘুরছে।
গৃহস্থালির বাসনপত্র, চেয়ার ও কাবার্ডে বোঝাই গাড়িগুলো উঠোনের ফটক দিয়ে বেরিয়ে রাস্তা বরাবর এগিয়ে চলেছে। ফেরাপন্তভের পাশের বাড়ির সামনেও মালপত্র বোঝাই গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, বিদায় নেবার কালে মেয়েরা হা-হুঁতাশ করে কাঁদতে লাগল। একটা ছোট কুকুর ঘেউ-ঘেউ করতে করতে ঘোড়ার সামনে ছুটে চলল।
আলপাতিচ দ্রুততর পায়ে সরাইখানার উঠোনে ঢুকে যেখানে তার ঘোড়া ও গাড়ি রয়েছে সেখানে গেল। কোচোয়ানটি ঘুমিয়ে আছে। তাকে ডেকে তুলে ঘোড়া জুড়তে বলে বারান্দায় উঠে গেল। গৃহকর্তার ঘর থেকে ভেসে এল একটি শিশুর কান্না, একটি স্ত্রীলোকের হতাশ চাপা আর্তনাদ, আর ফেরাপভের ক্রুদ্ধ চিৎকার। আলপাতিচ ঢুকতেই রাঁধুনিটি ভয়ার্ত মুরগির মতো ছুটাছুটি করতে লাগল।
লোকটি বৌকে মেরে ফেলল। কত্রীকে মেরে ফেলল।…খুব মারছে…এইভাবে টানতে টানতে নিয়ে গেছে!… ।
কিসের জন্য? আলপাতিচ শুধাল।
এখান থেকে চলে যেতে চাইছে। মেয়েমানুষ তো! সে বলছে, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল, ছোট ছোট বাচ্চাগুলি সমেত আমাকে মেরে ফেলো না। সকলেই তো চলে যাচ্ছে, তাহলে তুমি যাবে না কেন? আর অমনি কর্তা তাকে মারতে মারতে এইভাবে টানতে টানতে নিয়ে গেল!
