যে সন্ধ্যায় প্রিন্স তার নির্দেশাদি দিয়ে আলপাতিচকে পাঠাল সেই সন্ধ্যায়ই দেসাল্লেস প্রিন্সেস মারির সঙ্গে দেখা করে বলল, প্রিন্সেস শরীর ভালো যাচ্ছে না, আর নিজের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাও করছে না, এদিকে প্রিন্স আন্দ্রুর চিঠি থেকে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে বল্ড হিলসে কথাটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, কাজেই আলপাতিচকে দিয়ে প্রাদেশিক শাসনকর্তার কাছে একটা চিঠি পাঠিয়ে তার কাছ থেকে জানতে চাওয়া হোক যুদ্ধের অবস্থা কি এবং বল্ড হিলসের বিপদের সম্ভাবনা কতখানি। শাসনকর্তার কাছে চিঠিটা দেসাক্সেসই লিখে দিল, প্রিন্সেস মারি তাতে সই করল, আর আলপাতিচের হাতে চিঠিটা দিয়ে তাকে বলে দেওয়া হল, সে যেন চিঠিটা শাসনকর্তার হাতে দেয় এবং কোনোরকম বিপদ বুঝলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসে।
সবরকম হুকুম নিয়ে আলপাতিচ সপরিবারে বেরিয়ে পড়ল। মাথায় শাদা রঙের বীভার-লোমের টুপি-প্রিন্সের দেওয়া উপহার–আর হাতে প্রিন্সের মতোই একটা ছড়ি।
গাড়ির বড় ঘন্টার শব্দ কমিয়ে রাখা ছিল, আর ছোট ঘণ্টাগুলি ছিল কাগজ দিয়ে জড়ানো। প্রিন্স কাউ-ে কই ঘণ্টা বাজিয়ে গাড়ি চালাতে দিত না, কিন্তু এই দীর্ঘ ভ্রমণে আলপাতিচের ঘণ্টাগুলি বাজাবার শখ হল। তার অনুরাগীবৃন্দ-যেমন বড় করণিক, হিসাব ঘরের করণিক, বাসন ধোয়ার ঝি, বঁধুনি, বাচ্চা চাকর, কোচোয়ান ও পারিবারিক ভূমিদাসরা-সকলেই এসে তাকে বিদায় দিল।
তার মেয়ে এনে দিল ছিট-কাপড়ের ওড়-লাগানো দুটি কুশন-একটা বসার, একটা হেলান দেবার। তার বুড়ি শ্যালিকা এনে দিল একটা ছোট পুঁটুলি, আর একজন কোচোয়ান তাকে গাড়িতে তুলে দিল।
এই তো! এই তো! মেয়েরাই যত গণ্ডগোল বাধায়! মেয়েরা! মেয়েরা! প্রিন্সের মতোই দ্রুতগতিতে কথাগুলি বলে আলপাতিচ গাড়িতে উঠে বসল।
করণিককে কাজের নির্দেশাদি দিয়ে আলপাতিচ টাক মাথা থেকে টুপিটা তুলে তিনবার কুশ-চিহ্ন আঁকল।
যুদ্ধ ও শত্রুপক্ষের গুজবের কথা উল্লেখ করে তার স্ত্রী চেঁচিয়ে বলল, যদি সেরকম কিছু দেখ…তো ফিরে এস। খৃস্টের দোহাই, আমাদের কথা মনে রেখ।
মেয়েরা মেয়েরা! মেয়েরাই যত গণ্ডগোল বাধায় বিড় বিড় করতে করতে আলপাতিচ যাত্রা শুরু করল।
যেতে যেতে দুই পাশের চমৎকার ফসলের দিকে খুশিমনে তাকিয়ে সে মনে মনে হিসাব কষতে লাগল কীরকম বীজ বোনা হয়েছিল আর ফসল কীরকম পাওয়া যাবে। প্রিন্স যেসব জিনিসের হুকুম করেছে সেসব মনে আছে কিনা তাও একবার ভেবে নিল।
পথে ঘোড়াগুলিকে দুইবার দানা-পানি দিয়ে ৪ঠা আগস্ট সন্ধ্যার দিকে সে শহরে পৌঁছল।
পথে মালগাড়ি ও সৈন্যদের সঙ্গে তার অনেকবারই দেখা হয়েছে। মোলেনক্ষের কাছাকাছি আসতে অনেক দূরে কামানের শব্দও কানে এসেছে। কিন্তু সেসবকে সে বিশেষ আমল দেয়নি। যেটা খুব বেশি করে তার নজরে পড়েছে সেটা হল, একটা চমৎকার যবের ক্ষেতে তার খাটানো হয়েছে, আর সৈন্যরা ঘোড়ার খাবার জন্য সব ফসল কেটে ফেলছে। কিন্তু নিজের কাজের কথায় মন দিতে গিয়ে অচিরেই সে-দৃশ্যটা সে ভুলে গেল।
ত্রিশ বছরের অধিককাল ধরে তার জীবনের সব স্বার্থ ও আগ্রহই প্রিন্সেস ইচ্ছার দড়িতে বাঁধা, কখনো সে সীমানা সে পার হয়ে যায়নি। প্রিন্সের হুকুমের সঙ্গে যে জিনিসের সম্পর্ক নেই তার প্রতি তারও কোনো আগ্রহ নেই।
৪ঠা আগস্ট সন্ধ্যায় গেঁলেনঙ্কে পৌঁছে সে নীপার নদী পার হয়ে গাচিনা শহরতলিতে ফেরাপভের সরাইখানায় উঠল। গত ত্রিশ বছর ধরে সেখানেই সে ওঠে। বছর ত্রিশেক আগে আলপাতিচের পরামর্শেই ফেরাপত্তভ প্রিন্সের কাছ থেকে একটা জঙ্গল কিনে ব্যবসা শুরু করেছিল, আজ সেখানে তার একটা বাড়ি, একটা সরাইখানা ও একটা ফসল কেনাবেচার দোকান হয়েছে। শক্ত শরীর, লাল মুখ, বছর চল্লিশ বয়স, পুরু ঠোঁট, থ্যাবড়া নাকের উপর একটা আব, কালো ভুরুর উপর আরো কয়েকটা আব, পেটটি নাদা।
সুতির শার্টের উপর ওয়েস্টকোট পরে ফেরাপত্তভ দোকানের সামনে রাস্তার উপরেই দাঁড়িয়েছিল। আলপাতিচকে দেখে এগিয়ে গেল।
বলল, এস, এস ইয়াকভ আলপাতিচ। সকলে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, আর তুমি শহরে এলে।
শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে কেন? আলপাতিচ শুধাল।
আমিও তাই বলি। লোকগুলো বোকার ডিম! ফরাসিদের ভয়েই মরে।
মেয়েরাই যত গণ্ডগোল বাধায় আলপাতিচ বলল।
আমিও তাই মনে করি ইয়াকভ আলপাতিচ। আমি বলি : হুকুম হয়ে গেছে তাদের ঢুকতে দেওয়া হবে না, বাস, সব ঠিক হ্যায়। আর চাষীরা সব গাড়ির ভাড়া হাঁকছে তিন রুবল–এটা খৃস্টানের মতো কাজ নয়!
ইয়াকভ আলপাতিচ কথাগুলি শুনল, কিন্তু মন দিল না। নিজের জন্য একটা সামোভার আর ঘোড়ার জন্য খড় চাইল, তারপর চা খেয়ে শুয়ে পড়ল।
সারারাত সরাইখানার পাশ দিয়ে সৈন্য চলতে লাগল। পরদিন সকালে গায়ে জ্যাকেট চড়িয়ে আলপাতিচ কাজে বেরিয়ে গেল। সকালেই রোদ উঠেছে, আটটা বাজতেই বেশ গরম বোধ হতে লাগল। আলপাতিচ ভাবল, ফসল কাটার পক্ষে বড় ভালো দিন।
খুব সকাল থেকেই শহর থেকে দূরে গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। আটটা বাজতেই বন্দুকের গুলির সঙ্গে যুক্ত হল কামানের গর্জন। রাস্তায় লোকজনের ব্যস্ত চলাফেরা, অনেক সৈন্যও চলছে, আবার গাড়ি ঘোড়াও ছুটছে, দোকানি দোকানে বসেছে, গির্জায়-গির্জায় যথারীতি প্রার্থনা হচ্ছে। আলপাতিচ দোকানে গেল, সরকারি আপিসে গেল, ডাকঘরে গেল, শাসনকর্তার ভবনে গেল। আপিসে, দোকানে, ডাকঘরে সর্বত্রই লোক সৈন্যদের কথা ও আক্রমণকারী শত্রুদের কথাই বলাবলি করছে, কি করা উচিত জানতে চাইছে, আর পরস্পরকে শান্ত করতে চেষ্টা করছে।
