পরিচারক এসে বরিসকে ডাকল–প্রিন্সেস এবার যাবে। বরিসের সঙ্গে আরো বেশি করে পরিচিত হবার জন্য পিয়ের কথা দিল, ডিনারে যাবে; সাদরে তার হাতে চাপ দিয়ে চশমার উপর দিয়ে সস্নেহে বরিসের চোখের দিকে তাকাল। সে চলে গেলে অনেকক্ষণ ধরে সে ঘরের এদিক-ওদিক হেঁটে বেড়াতে লাগল, এখন আর কাল্পনিক তলোয়ার দিয়ে কোনো কাল্পনিক শত্রুকে বিঁধছে না; বরং একটি বুদ্ধিমান দৃঢ়চেতা যুবকের কথা স্মরণ করে হাসছে। * প্রথম যৌবনে যেমনটি ঘটে থাকে, বিশেষ করে তার বেলায় যে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করে, এই যুবকটির
প্রতি পিয়ের একটা অদ্ভুত মমতা বোধ করতে লাগল, সে স্থির করল, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে।
প্রিন্স ভাসিলি প্রিন্সেসকে বিদায় জানাতে তার সঙ্গে এল। মহিলাটির চোখে রুমাল, মুখ অশ্রুসিক্ত।
সে তখন কেবলি বলছে, ভয়ংকর, ভয়ংকর! কিন্তু আমার যাই ঘটুক, আমার কর্তব্য আমি করব। এখানে এসে রাত থাকব। এ ভাবে ফেলে রাখা চলবে না। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। ভাইঝিরা যে এসব কাজ ফেলে রেখেছে কেন আমি তো ভেবে পাই না। তাকে প্রস্তুত করে তুলবার একটু উপায় বের করতে ঈশ্বরই আমাকে সাহায্য করবেন! বিদায় প্রিন্স! ঈশ্বর আপনার সহায় হোন।…
বিদায়, বলে প্রিন্স ভাসিলি চলে গেল।
গাড়িতে উঠে মা ছেলেকে বলল, তিনি এক ভয়াবহ অবস্থায় আছেন। কাউকে চিনতে পর্যন্ত পারেন না।
আমি বুঝতে পারছি না মামণি–পিয়েরের প্রতি তার মনোভাব কী? ছেলে বলল।
সেটা উইল থেকে জানা যাবে বাবা। আমাদের ভাগ্যও তো তার উপরেই নির্ভর করছে।
কিন্তু তুমি কেন আশা করছ যে তিনি আমাদের কিছু দিয়ে যাবেন?
ওঃ বাবা, তিনি এত ধনী, আর আমরা এত গরিব!
যাই বলো, সেটা যথেষ্ট কারণ নয় মামণি।…
হা ঈশ্বর! তিন কত অসুস্থ! মা উচ্চৈঃস্বরে বলল।
*
অধ্যায়-১৭
আন্না মিখায়লভনা ছেলেকে নিয়ে কাউন্ট সিরিল ম্লাদিমিরভিচ বেজুখভের সঙ্গে দেখা করে চলে যাবার পরে কাউন্টেস রস্তভা অনেকক্ষণ পর্যন্ত চোখে রুমাল দিয়ে একা একা বসে রইল। শেষপর্যন্ত ঘন্টাটা বাজাল।
কয়েক মিনিট পরে দাসী এলে তাকে রেগে বলল, তোমাদের ব্যাপার-স্যাপার কী বাপু? আমার কাজ করার ইচ্ছা নেই নাকি? তাহলে অন্য জায়গা খুঁজে দিই।
বন্ধুর দুঃখ ও অসম্মানজনক দারিদ্র্যের কথা শুনে কাউন্টেস খুব বিচলিত হয়ে পড়েছে; তার মেজাজও বিগড়ে গেছে, এরকম অবস্থা হলেই সে দাসীকে বাপু বলে ডাকে, আর অতিমাত্রায় বিনীতভাবে তার সঙ্গে কথা বলে।
আমি খুব দুঃখিত ম্যাম, দাসী উত্তর দিল।
আউন্টকে আমার কাছে ডেকে দাও।
যথারীতি অপরাধীর মতো তাকাতে তাকাতে কাউন্ট হেলেদুলে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে এল।
কী খবর ছোট কাউন্টেস? কী খেলাই খেলোম গো! তারাসের জন্য হাজার রুবল দেয়া কিছু খারাপ নয়। সে তার উপযুক্ত!
হাঁটুর উপর কনুই রেখে স্ত্রীর পাশে বসে সে পাকা চুলে হাত বুলোতে লাগল।
কী আদেশ কাউন্টেস?
দেখ বাপু… ওটার এ অবস্থা কেন? কাউন্টের ওয়েস্টকোটটা দেখিয়ে সে বলল। তারপর হেসে যোগ করল, ওটাও সম্ভবত খেলা। দেখ কাউন্ট, আমার কিছু টাকার দরকার।
তার মুখটা বিষণ্ণ হয়ে উঠল।
ও, ছোট কাউন্টেস!…কাউন্ট পকেট-বইটা খুঁজতে লাগল।
আমার অনেক টাকা চাই কাউন্ট! পাঁচশ রুবল। ক্যান্ত্রিকের রুমালটা বের করে স্বামীর ওয়েস্টকোটটা মুছে দিতে লাগল।
হ্যাঁ, এখনি, এখনি দিচ্ছি। হেই, কে আছে? যে সব লোক জানে যে ডাকামাত্রই তোকজন এসে হাজির হবে তাদের মধ্যে সুরেই কাউন্ট হাঁক দিল। দিমিত্রিকে পাঠিয়ে দাও।
দিমিত্রি ভালো পরিবারের ছেলে; কাউন্টের বাড়িতেই মানুষ হয়েছে। আর এখনো তার বিষয়সম্পত্তি দেখাশোনা করে। আস্তে পা ফেলে সে ঘরে ঢুকল।
শ্রদ্ধাশীল যুবকটি ঘুরে ঢুকলে কাউন্ট বলল, আমি এই চাই হে বাপু। আমাকে এনে দাও… একমুহূর্ত ভাবল। হ্যাঁ সাত শো রুবল এনে দাও, হা! কিন্তু দেখো, গতবারের মতো ছেঁড়া ময়লা নোটগুলো এনো না, পরিষ্কার নোট এনে কাউন্টেসকে দাও।
গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাউন্টেস বলল, হা দিমিত্রি, পরিষ্কার নোট দিও।
নোটগুলো কখন চাই ইয়োর এক্সেলেন্সিং দিমিত্রি শুধাল। আপনাকে জানানো প্রয়োজন… কিন্তু আপনি অস্থির হবেন না, কাউন্টকে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলতে দেখে সে কথাটা যোগ করল, কারণ সে জানে যে ওটা আসন্ন রাগের লক্ষণ। আমি ভুলে গিয়েছিলাম… আপনি কি চান ওটা এখনি এনে দেই?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক তাই! নিয়ে এসো। কাউন্টেসকে দাও। যুবকটি চলে গেলে কাউন্ট হেসে বলল, দিমিত্রি একটি রত্নভাণ্ডার। তার কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই। সেটাকেই তো আমি ঘৃণা করি। সবকিছুই সম্ভব।
আঃ, টাকা কাউন্ট, টাকা! এ যে জগতে কত দুঃখের কারণই হয়। কিন্তু এ টাকাটার আমার বড় দরকার, কাউন্টেস বলল।
আমার ছোট্ট কাউন্টেস, তুমি তো একটি কুখ্যাত উড়নচণ্ডী, বলে কাউন্ট স্ত্রীর হাতে চুমো খেয়ে পড়ার ঘরেই ফিরে গেল।
আন্না মিখায়লভনা যখন কাউন্ট বেজুখভের বাড়ি থেকে ফিরে এল তখন, সব পরিষ্কার নোটে পুরো টাকাটাই কাউন্টেসের ছোট টেবিলের উপর একখানা রুমালে ঢাকা ছিল। আন্না মিখায়লভনা লক্ষ্য করল, কাউন্টেস কিছুটা উত্তেজিত।
তারপর বন্ধু? কাউন্টেস জিজ্ঞেস করল।
আঃ, কী ভয়ঙ্কর অবস্থায় যে তিনি আছেন! তিনি এত অসুস্থ যে তাঁকে চেনাই যায় না! মাত্র কয়েক মুহূর্ত সেখানে ছিলাম, কিন্তু কোনো কথাই বলতে পারিনি।…
