প্রথমত, চিঠির কাগজ-শুনতে পাচ্ছ? আট দিস্তে, ঠিক এইরকম, পাশে সোনালি জল লাগানো…ঠিক যেন এই নমুনা কাগজটার মতো হয়। বার্নিশ, মোহর করার মোম, যেমন যেমন মাইকেল আইভানভিচের ফর্মে লেখা আছে।
হাঁটতে হাঁটতেই হাতের চিঠিটাতে চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর দলিসংক্রান্ত চিঠিটা স্বয়ং শাসনকর্তার হাতে দেবে।
তারপর নতুন বাড়ির জন্যে ছিটকিনি কিনতে হবে, তার নিজের আঁকা নক্সার মতো হওয়া চাই। আর উইল রাখবার জন্য একটা বাঁধানো খাপ তৈরি করতে দিতে হবে।
এতেই দুঘণ্টার উপর কেটে গেল, তবু প্রিন্স তাকে রেহাই দিল না। প্রিন্স বসে পড়ে চিন্তায় ডুবে গেল, তার চোখ বুজে এল, সে ঢুলতে লাগল। আলপাতিচ একটু নড়াচড়া করল।
আরে, চলে যাও, চলে যাও! যদি আর কিছু দরকার হয় পরে লোক পাঠাব।
আলপাতিচ বেরিয়ে গেল। প্রিন্স টেবিলে ফিরে গিয়ে টানার ভিতরে কাগজটা নাড়াচাড়া করল, আবার সেটা বন্ধ করে শাসনকর্তাকে চিঠি লিখতে টেবিলে বসল।
চিঠি সিল করে যখন উঠল তখন রাত অনেক হয়েছে। ঘুমোবার ইচ্ছা হল, কিন্তু প্রিন্স জানে যে ঘুম আসবে না, বিছানায় শুলেই যত রাজ্যের বিষণ্ণ চিন্তা এসে মাথার মধ্যে ভিড় করবে। তিখনকে ডেকে তাকে নিয়ে কোথায় রাতের মতো বিছানা করতে হবে সেটা দেখিয়ে দিতে ঘরের পর ঘর পার হতে লাগল। সব জায়গাই তার না-পছন্দ। বিশেষ করে খারাপ লাগল যে কোচটাকে সে সাধারণত শোয়। সেটা ভয়ংকর মনে হবার কারণ হয়তো সেটাতে শুয়েই যত রাজ্যের দুশ্চিন্তা তার মাথায় ভিড় করেছিল। কোনো জায়গাই তার পছন্দ হয় না, কিন্তু বৈঠকখানার পিয়ানোর পিছনকার কোণটা তবু কিছুটা ভালো মনে হল, কারণ সেখানে সে আগে কখনো ঘুমোয়নি।
একজন পরিচারককে নিয়ে তিখন খাটটা সেখানে নিয়ে এসে বিছানা পাততে লাগল।
ঠিক হচ্ছে না! ঠিক হচ্ছে না! বলে প্রিন্স নিজেই সেটাকে কোণ থেকে কয়েক ইঞ্চি টেনে এনে আবার ঠেলে দিল।
যাহোক, শেষপর্যন্ত কাজটা হয়েছে, এবার বিশ্রাম করব। প্রিন্স চুপ করে দাঁড়াল, তিখন তার পোশাক খুলতে লাগল।
কোট ও ট্রাউজার খুলতে শরীরে যেটুকু টান লাগল তাতেই ভুরু কুঁচকে প্রিন্স ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ল এবং নিজেই শুকিয়ে যাওয়া হলদে পা দুটোর দিকে তাকিয়ে যেন ধ্যান করতে লাগল। পা দুটো টেনে বিছানায় ভোলাই শক্ত কাজ। উঃ, কী শক্ত কাজ! আঃ, কবে যে এ কষ্টের শেষ হবে! কবে যে তুমি আমাকে মুক্তি দেবে! ভাবতে ভাবতে দুই ঠোঁট চেপে ধরে বিশ হাজারতমবার সেই একই চেষ্টা করে কোনোরকমে শুয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে বিছানাটা সামনে-পিছনে দুলতে লাগল, যেন বিছানাটাই জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে আর ঝাঁকুনি দিচ্ছে। প্রায় প্রতি রাত্রেই এই একই ঘটনা ঘটে। চোখ দুটো সবে বুজে আসছে এমন সময় আবার চোখ মেলল।
শান্তি নেই! সব উচ্ছন্নে যাক! সে বিড়বিড় করতে লাগল, কার উপর যে রাগ করছে তা সে নিজেই জানে না। যা, কি যেন দরকারি কাজের কথা বাকি আছে। সিটকিনি? না, সেকথা তো তাকে বলেছি। না, কি যেন একটা বৈঠকখানা ঘরেরই কিছু। প্রিন্সেস মারি বাজে বকছিল। আর সেই গাধা দেসাল্লেসও কি যেন বলল। আমার পকেটের কিছু–ঠিক মনে করতে পারছি না। তিখন, ডিনারের সময় আমরা কি নিয়ে কথা বলছিলাম?
প্রিন্স মাইকেল…
চুপ কর! চুপ কর! প্রিন্স টেবিলের উপর একটা থাপ্পড় মারল। হ্যাঁ, মনে পড়েছে, প্রিন্স আন্দ্রুর চিঠি! প্রিন্সেস মারি চিঠিটা পড়ল। দেসাল্লেস ভিতের সম্পর্কে কি যেন বলল। এবার আমি সেটা পড়ব।
পকেট থেকে চিঠিটা বের করিয়ে আনল। একগ্লাস লেমোনেড ও ঘোরানো মোমবাতি সমেত টেবিলটা বিছানার আরো কাছে আনল, তারপর চশমাটা পরে চিঠি পড়তে লাগল। রাত্রির এই নিস্তব্ধতার মধ্যে সবুজ ঢাকনার নিচে আবছা আলোয় যেন মুহূর্তের জন্য চিঠিটার অর্থ সে ধরতে পারল।
ফরাসিরা ভিতেরঙ্কে এসে গেছে, আর চার দিনের মধ্যে স্নোলেনকে এসে পড়তে পারে, হয়তো ইতিমধ্যেই সেখানে পৌঁছে গেছে। তিখন! তিখন লাফ দিয়ে উঠল। না, না, আমার কিছু চাই না! প্রিন্স চেঁচিয়ে বলল।
মোমবাতিদানের নিচে চিঠিটা রেখে সে চোখ বুজল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল উজ্জ্বল মধ্যাহ্নের দানিয়ুব নদী : শরবন, রুশ শিবির, আর নিজের যৌবনদীপ্ত সেনাপতির মূর্তি, রক্তিম মুখে একটাও ভাঁজ পড়েনি, সদর্প, সতর্ক পা ফেলে সে ঢুকল পোতমেকিনের রঙিন তাবুতে, সেদিনের মতোই এই প্রিয় মানুষটির প্রতি একটা ঈর্ষার শিখা যেন আজও তার মনে জ্বলে উঠল। তার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে যে কথাগুলি বলেছিল তাও মনে পড়ে গেল। তার সম্মুখে এসে দাঁড়াল মোটাসোটা, ঈষৎ পাংশু মুখ, বলিষ্ঠ একটি নারী, সাম্রাজ্ঞী-জননী, মুখে প্রথম সাদর অভ্যর্থনার মধুর হাসি ও বাণী, তারপরেই ভেসে উঠল কাঠের সমাধিতে শায়িত সেই একই মুখ এবং তার হাতে চুমো খাবার অধিকার লাভের জন্য তারই শবাধারকে ঘিরে জুবভ এর সঙ্গে তার যুদ্ধের দৃশ্য।
ওঃ, দ্রুত, আরো দ্রুত ফিরে চল সেইকালে, যা কিছু বর্তমান সব শেষ হয়ে যাক! দ্রুত, আরো দ্রুত–তারা আমাকে শান্তিতে থাকতে দিক।
.
অধ্যায়-৪
প্রিন্স নিকলাস বলকনস্কির জমিদারবাড়ি বন্ড হিলস স্মোলেনস্ক থেকে চল্লিশ মাইল পূর্বে এবং মস্কো যাবার বড় সড়কের দুমাইল দূরে অবস্থিত?
