সেদিন ডিনারের সময় দেসাল্লেস যখন জানাল যে ফরাসিরা ভিতেব শহরে ঢুকে পড়েছে, তখন ছেলের চিঠির কথা বুড়ো প্রিন্সের মনে পড়ে গেল।
প্রিন্সেস মারিকে বলল, আজ প্রিন্স আন্দ্রুর একটি চিঠি এসেছে, তুমি কি চিঠিটা পড়নি?
না বাবা, মেয়ে ভীত গলায় জবাব দিল।
পড়া তো দূরের কথা, চিঠি যে এসেছে তাই তো সে জানে না।
যুদ্ধের কথা বলতে গেলেই বিদ্রুপের হাসি হাসাটা প্রিন্সের একটা অভ্যাস দাঁড়িয়ে গেছে। তেমনই হাসির সঙ্গে সে বলল, এই যুদ্ধের কথাই সে লিখেছে।
দেসাল্লেস বলল, চিঠিটা নিশ্চয়ই খুব মনোগ্রাহী হবে। প্রিন্স আন্দ্রুর তো সবই জানবার কথা…
হ্যাঁ, খুবই মনোগ্রাহী। মাদময়জেল বুরিয়ে বলল।
বুড়ো প্রিন্স তাকেই বলল, যাও তো, চিঠিটা নিয়ে এস। জানই তো-ছোট টেবিলে কাগজ-চাপাটার নিচেই আছে।
মাদময়জেল বুরিয়ে তাড়াতাড়ি লাফিয়ে উঠল।
না, যেয়ো না! বুড়ো প্রিন্সের চোখে ভ্রুকুটি।… তুমি যাও মাইকেল আইভানভিচ।
মাইকেল আইভানভিচ পড়ার ঘরে চলে গেল। কিন্তু সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই বুড়ো প্রিন্স অস্বস্তির সঙ্গে চারদিকে তাকিয়ে তোয়ালেটা ছুঁড়ে দিয়ে নিজেই উঠে পড়ল।
বিড় বিড় করে বলল, এরা কিছু করতে পারে না…সবসময় তালগোল পাকিয়ে ফেলে।
সে বেরিয়ে যেতেই প্রিন্সেস মারি, দেসাল্লেস, মাদময়জেল বুরিয়ে, এমন কি ছোট্ট নিকলাস পর্যন্ত নিঃশব্দে দৃষ্টি-বিনিময় করল। চিঠি ও মানচিত্রটা নিয়ে মাইকেল আইভানভিচকে সঙ্গে করে বুড়ো প্রিন্স দ্রুতপায়ে ঘরে ঢুকল। সেগুলোকে নিজের পাশেই রেখে দিল-ডিনারের সময় কাউকে পড়তে দিল না।
বৈঠকখানায় গিয়ে চিঠিটা প্রিন্সেস মারির হাতে দিল, নতুন বাড়ির প্ল্যানটা মেলে ধরে সেটার উপর চোখ রেখে প্রিন্সেস মারিকে চিঠিটা পড়তে বলল। চিঠি পড়া শেষ করে প্রিন্সেস মারি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল। বুড়ো প্রিন্স তখন প্ল্যানটা পরীক্ষা করে দেখতেই ব্যস্ত।
এ বিষয়ে আপনি কি মনে করেন প্রিন্স দেসাল্লেস সাহস করে জিজ্ঞাসা করল।
আমি? আমি?… বাড়ির প্ল্যান থেকে চোখ না সরিয়েই প্রিন্স অসন্তুষ্ট গলায় বলল।
খুব সম্ভব রণক্ষেত্র আমাদের এত কাছে সরে আসবে যে…।
হা হা হা! রণক্ষেত্র! প্রিন্স বলল। আগেও বলেছি, এখনো বলছি, রণক্ষেত্র হচ্ছে পোল্যান্ড, আর শত্রু কখনো নিয়েমেন পেরিয়ে আসবে না।
শত্রু যখন নীপারের তীরে পৌঁছে গেছে তখনো নিয়েমেনের কথা বলায় দেসাল্লেস অবাক হয়ে প্রিন্সের দিকে তাকাল। প্রিন্সেস মারি নিয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান ভুলে গিয়ে ভাবল যে তার বাবার কথাই ঠিক।
বরফ যখন গলবে তখন পোল্যান্ডের জলাভূমিতেই তারা ডুবে মরবে। শুধু তারা সেটা বুঝতে পারছে না, সম্ভবত ১৮০৭ সালের অভিযানের কথা ভেবেই প্রিন্স বলতে লাগল। বেনিংসেনের উচিত ছিল আরো আগে প্রাশিয়াতে ঢোকা, তাহলে সমস্ত ব্যাপারটাই অন্যদিকে মোড় নিত…।
দেসাল্লেস ভয়ে ভয়ে বলল, কিন্তু প্রিন্স, চিঠিতে তো ভিতেরঙ্কের কথা বলা হয়েছে…।
ওঃ, চিঠি? হ্যাঁ… প্রিন্স রেগে জবাব দিল। হা…হা… হঠাৎ তার মুখটা বিষণ্ণ হয়ে উঠল। থামল। হ্যাঁ, সে লিখেছে, ফরাসিদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে…কোথায়…কি যেন নদীটা?
দেসাল্লেস চোখ নিচু করল।
সবিনয়ে বলল, প্রিন্স তো সেসম্পর্কে কিছু লেখেননি।
লেখেনি? কিন্তু আমি তো মন থেকে ওটা বানাইনি।
অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
হঠাৎ মাথাটা তুলে বাড়ির প্লানটা দেখিয়ে প্রিন্স বলে উঠল, হা…হা…আচ্ছা মাইকেল আইভানভিচ, বল তো কীভাবে এটাকে তুমি বদলাতে চাও…
মাইকেল আইভানভিচ প্ল্যানটার দিকে এগিয়ে গেল। প্রিন্স নতুন বাড়ি সম্পর্কে তার সঙ্গে কথা বলে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে প্রিন্সেস মারি ও দেসাল্লেসের দিকে তাকিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
সন্ধ্যাবেলা মাইকেল আইভানভিচ প্রিন্সেস কথামতো প্রিন্সেস মারির কাছে এসে প্রিন্স আন্দ্রুর চিঠিটা চাইল। চিঠিটা তার হাতে দিয়ে কাজটা অপ্রীতিকর হলেও জানতে চাইল, তার বাবা এখন কি করছে।
সবসময়ই তো ব্যস্ত, সশ্রদ্ধ অথচ বিদ্রুপের হাসি হেসে মাইকেল আইভানভিচ বলল, তা দেখে প্রিন্সেস মারির মুখটা কালো হয়ে গেল। নতুন বাড়িটা নিয়ে খুবই চিন্তায় আছেন। একটু-আধটু পড়াশুনা করেন, তবে এখন-গলা নামিয়ে বলল–এখন ডেস্কেই বসেছেন, মনে হচ্ছে উইল করতে ব্যস্ত আছেন।
আর আলপাতিচকে ঘোলেনকে পাঠানো হচ্ছে? প্রিন্সেস মারি শুধাল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সে তো যাত্রা করার জন্যই অপেক্ষা করছে।
.
অধ্যায়-৩
মাইকেল আইভানভিচ যখন চিঠিটা নিয়ে পড়ার ঘরে ফিরে গেল তখন বুড়ো প্রিন্স চশমা পরে চোখের উপর একটা ঢাকা দিয়ে দেরাজ-খোলা টেবিলের সামনে বসে ছিল। টেবিলে একটা ঢাকা-দেওয়া মোমবাতি জ্বলছে। হাতে একটা কাগজ নিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে একটা পাণ্ডুলিপি পড়ছে। তার ভাষায় এটা তার মন্তব্য। তার মৃত্যুর পরে এটাকে সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে।
যে কাগজটা সে পড়ছে সেটা যেসময়ে লেখা হয়েছিল তখনকার স্মৃতি মনে পড়ায় প্রিন্সের দুই চোখ জলে ভরে উঠেছে। মাইকেল আইভানভিচের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পকেটে রাখল, কাগজটা ভাজ করল, তারপর আলপাতিচকে ডাকল, সে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আছে।
স্মোলেনস্ক থেকে অনেকগুলো জিনিস কিনে আনতে হবে। আলপাতিচ দরোজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আর প্রিন্স ঘরময় হাঁটতে হাঁটতে তাকে নির্দেশ দিচ্ছে।
