.
অধ্যায়-২
ছেলে চলে যাবার পরদিন প্রিন্স নিকলাস প্রিন্সেস মারিকে তার পড়ার ঘরে ডেকে পাঠাল।
বলল, এবার? খুশি হয়েছ তো? ছেলের সঙ্গে আমার ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছ! এখন খুশি তো? এই তো তুমি চেয়েছিলে! খুব সন্তুষ্ট?…কিন্তু আমি কষ্ট পাচ্ছি, খুব কষ্ট পাচ্ছি। আমি বুড়ো, আমি দুর্বল, আর এই তো তুমি চেয়েছিলে। বেশ তো, এবার প্রাণভরে দেখ! প্রাণভরে দেখ!
তারপর থেকে একটা পুরো সপ্তাহ প্রিন্সেস মারি বাবার সঙ্গে দেখা করেনি। বাবা অসুস্থ, পড়ার ঘর থেকে বের হয় না।
প্রিন্সেস মারি সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল, এই অসুখের সময় বুড়ো প্রিন্স যে শুধু তাকেই ঘর থেকে দূরে রেখেছে তাই নয়, মাদময়জেল বুরিয়েকেও ঘরে ঢুকতে দেয়নি। শুধু তিখনই তার দেখাশুনা করেছে।
একসপ্তাহ পরে প্রিন্স আন্দ্রুবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল এবং আগেকার জীবনযাত্রা শুরু করল, বাড়িঘর তৈরি ও বাগানের কাজ নিয়েই মেতে রইল। মাদময়জেল বুরিয়ের সঙ্গেও সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। মেয়ের প্রতি তার দৃষ্টি, তার নিরাসক্ত কণ্ঠস্বর যেন বলতে চাইছে : দেখলে তো? তুমি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলে, ফরাসি মেয়েটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিয়ে প্রিন্স আন্দ্রুকে মিথ্যা কথা বলেছ, তার সঙ্গে আমার ঝগড়া বাধিয়েছ, কিন্তু এখন দেখছ তো আমার কাউকে দরকার নেই–তাকেও না, তোমাকেও না!
প্রিন্সেস মারি দিনের অর্ধেকটা সময় কাটায় ছোট্ট নিকলাসের সঙ্গে, তার পড়াশুনা দেখে, নিজেই রুশ ভাষা ও গান শেখায়, দেসাল্লেসের সঙ্গে গল্প করে, দিনের বাকি সময়টা কাটায় বই নিয়ে, বুড়ি নার্সের সঙ্গে অথবা তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে।
যুদ্ধ সম্পর্কে প্রিন্সেস মারির ভাবনা-চিন্তা অন্যসব স্ত্রীলোকদেরই মতো। তার যত ভয় যুদ্ধরত ভাইয়ের জন্য, যে বিস্ময়কর নিষ্ঠুরতায় একজন মানুষ আর একজন মানুষকে খুন করে তা দেখে সে স্তম্ভিত হয়, আতংকিত হয়, কিন্তু আগেকার অন্যসব যুদ্ধের মতোই এ যুদ্ধেরও কোনো অর্থ সে খুঁজে পায় না। দেসাল্লেস তার সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করে, তীর্থযাত্রীটি এসে যুদ্ধ সংক্রান্ত নানারকম গুজব শোনায়, জুলি (এখন প্রিন্সেস বেস্কয়া) মাঝেমাঝেই তাকে দেশাত্মবোধক চিঠি লেখে মস্কো থেকে।
জুলি তার ফরাসি-প্রভাবিত রুশ ভাষায় লিখেছে, প্রিয় বান্ধবী, আমি তোেমাকে রুশ ভাষাতেই লিখছি, কারণ ফরাসিদের আমি ঘৃণা করি, আর সেই একই ঘৃণাবশত ফরাসি ভাষা শোনাটাও সমর্থন করি না…আমাদের পূজ্যপাদ ম্রাটের জন্য মস্কোতে আমরা সকলেই উচ্ছ্বসিত আনন্দ বোধ করি।
আমার বেচারা স্বামীটি ইহুদিদের সরাইখানায় কষ্ট ও ক্ষুধা সহ্য করছে, কিন্তু তার যে সংবাদ আমি পাই তাতেই আমি অনুপ্রাণিত হয়ে উঠি।
তুমি হয়তো রায়েভস্কির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কথা শুনেছ, দুই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে সে বলেছে : এদের নিয়ে আমি মরব, তবু আমরা এতটুকু কাপৰ না। সত্যি তো, শত্রুপক্ষ আমাদের চাইতে দ্বিগুণ শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও আমরা স্থির, অচঞ্চল রয়েছি। অন্যসময় আমরা যেমন খুশি চলি, কিন্তু যুদ্ধের সময় যুদ্ধের মতো! প্রিন্সেস আলিন ও সোফি সারাদিন আমার কাছেই বসে থাকে, আর জীবন্ত মানুষদের অসুখী বিধবা ও আমরা নানারকম আলোচনায় মেতে থাকি, শুধু তোমার মতো বন্ধুকেই কাছে পাই না… ইত্যাদি।
প্রিন্সেস মারি যে এই যুদ্ধের পূর্ণ তাৎপর্য বুঝতে পারে না তার কারণ বুড়ো প্রিন্স কখনো যুদ্ধের কথা বলে না, যুদ্ধকে স্বীকারই করে না, আর ডিনারের সময় দেসালুেস যুদ্ধের কথা তুললেও হেসে উড়িয়ে দেয়। প্রিন্সেস কণ্ঠস্বর এতই শান্ত ও আত্মপ্রত্যয়শীল যে প্রিন্সেস মারি অসংকোচেই তার কথা বিশ্বাস করে।
সারা জুলাই মাস বুড়ো প্রিন্স অতিমাত্রায় কর্মতৎপর, এমন কি উজ্জীবিতভাবে কাটাল। আরো একটা বাগানের পরিকল্পনা নেওয়া হল, পারিবারিক ভূমিদাসদের জন্য একটা নতুন বাড়ি তৈরি শুরু হল। কিন্তু একটা ব্যাপারে তাকে নিয়ে প্রিন্সেস মারি উদ্বেগ বোধ করতে লাগল, আজকাল বুড়ো প্রিন্স খুব অল্প সময় ঘুমোয়, আর আগেকার মতো পড়ার ঘরে না ঘুমিয়ে প্রতিদিন ঘুমের জায়গা পাল্টে নেয়। একদিন হয়তো হুকুম করল, তার শিবির-শয্যা পেতে দিতে হবে কাঁচ-ঘরে, আর একদিন হয়তো বৈঠকখানার কোচে বা লাউঞ্জ-চেয়ারেই পোশাক না ছেড়ে ঝিমুতে লাগল, আর মাদময়জেল বুরিয়ের বদলে একটি ভূমিদাস বালক এখন তাকে পড়ে শোনায়। আবার কখনো হয়তো খাবার ঘরেই রাতটা কাটায়।
প্রিন্স আন্দ্রুর দ্বিতীয় চিঠি এল ১লা আগস্ট। বাড়ি থেকে চলে গিয়েই সে প্রথম যে চিঠিটা লিখেছিল তাতে সে যা বলেছিল তার জন্য বাবার ক্ষমা চেয়ে তার অনুগ্রহ প্রার্থনা করেছিল। বুড়ো প্রিন্স একান্ত স্নেহে সে চিঠির জবাব দিয়েছে এবং সেই থেকেই ফরাসি মেয়েটিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। প্রিন্স আন্দ্রু দ্বিতীয় চিঠিটা লিখেছিল ভিতেবস্ক শহরের কাছাকাছি জায়গা থেকে, শহরটা তখন ফরাসিরা দখল করে নিয়েছে। সেই চিঠিতে গোটা অভিযানের সংক্ষিপ্ত বিবরণসহ তার নিজের আঁকা একটা মানচিত্র পাঠিয়েছে এবং যুদ্ধের অগ্রগতি সম্পর্কে কিছুটা পূর্বাভাস দিয়েছে। চিঠিতে সে আরো লিখেছে, যেহেতু বন্ড হিলস রণাঙ্গনের অত্যন্ত কাছে এবং সৈন্যদের যাতায়াতের একেবারে পথের উপর অবস্থিত সেইজন্য সেখানে থাকাটা এখন বিপজ্জনক, আর তাই সে তাকে মস্কো চলে যাবার পরামর্শ দিয়েছে।
