এবার ধ্বনিত হল জনৈক সম্ভ্রান্ত লোকের কণ্ঠস্বর। তার বয়স বছর চল্লিশের মতো, উচ্চতা মাঝারি, কোনো একসময় জিপসিদের আড্ডায় তার সঙ্গে পিয়েরের দেখা হয়েছিল, তাস-খেলুড়ে হিসেবে খুবই বাজে। সেই লোকটি পিয়েরের পাশে এসে আদ্রাকসিনের কথায় বাধা দিল।
বলতে লাগল, হ্যাঁ, এটা আলোচনার সময় নয়, কাজের সময় : রাশিয়াতে যুদ্ধ চলেছে! শত্রু এগিয়ে আসছে রাশিয়াকে ধ্বংস করতে, আমাদের পিতৃপুরুষদের সমাধিকে অপবিত্র করতে, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের অপহরণ করতে। লোকটি বুকে করাঘাত করতে লাগল। আমাদের পিতা জারের পক্ষে আমরা জেগে উঠব, প্রত্যেকে এগিয়ে যাব! রক্তবর্ণ চোখ ঘুরিয়ে সে চিৎকার করে বলল। ভিড়ের ভিতর থেকে সমর্থনসূচক ধ্বনি উঠল। আমরা রুশ, আমাদের ধর্ম আমাদের সিংহাসন, আমাদের পিতৃভূমি রক্ষায় রক্ত ঢেলে দিতে আমরা পশ্চাৎপদ হব না! আমরা যদি পিতৃভূমির সন্তান হই তাহলে প্রলাপ বকা বন্ধ করতে হবে। ইওরোপকে দেখাতে হবে, রাশিয়া কেমন করে পিতৃভূমিকে রক্ষা করে।
পিয়ের জবাব দিতে চাইল, কিন্তু কথা খুঁজে পেল না। সে বলতে চাইল, তার অর্থ, তার লোজন, অথবা নিজেকে উৎসর্গ করতে সে প্রস্তুত, শুধু অবস্থার উন্নতিবিধানের জন্য প্রকৃত অবস্থাটা তার জানা দরকার, কিন্তু কিছুই সে বলতে পারল না। অনেক কণ্ঠস্বর একসঙ্গে সোচ্চার হয়ে ওঠায় কাউন্ট রস্তভও তার সমর্থন জানাবার সময় পেল না। পিয়েরের বক্তৃতা যে বিফলে গেল তাই শুধু নয়, তাকে নির্মমভাবে বাধা দেওয়া হল, ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হল, আর সকলে তার কাছ থেকে দূরে সরে গেল। তার বক্তব্য যে তাদের অখুশি করেছে। তা নয়, আসলে জনতা হাতের কাছে এমন কিছু চায় যাকে ভালোবাসা যায় এবং ঘৃণা করা যায়। পিয়ের শেষের দলে পড়ে গেল। উত্তেজিত লোকটির পরে আরো অনেক বক্তা ওই একই সুরে কথা বলল। অনেকেই বাকপটুতার সঙ্গে নতুন কথাও বলল।
রাশিয়ান মেসেঞ্জারের সম্পাদক বলল, নরক দিয়ে নরককে প্রতিরোধ করতে হবে, বিদ্যুতের চমক দেখে ও বজ্রের গর্জন শুনে সে একটি শিশুকে হাসতে দেখেছে, কিন্তু আমরা সেই শিশু হব না।
ভিড়ের পিছনের সারি থেকে সমর্থনসূচক আওয়াজ উঠল, ঠিক, ঠিক, বজের গর্জনের সামনে!
সকলে এখন বড় টেবিলটার কাছে। সেখানে বসে আছে সত্তর বছরের বৃদ্ধ অভিজাতরা, কারো মাথায় পাকা চুল, কারো টাক, পরনে ইউনিফর্ম, চাদর, তাদের প্রায় সকলকেই পিয়ের তাদের বাড়িতে দেখেছে ভড়দের সঙ্গে, অথবা ক্লাবে দেখেছে বোর্স্টন খেলতে। অবিরাম কলগুঞ্জনের সঙ্গে সেই ভিড় টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ভিড়ের চাপে উঁচু পিঠওয়ালা চেয়ারের সঙ্গে লেপ্টে গিয়ে বক্তারা একের পর এক বলে যেতে লাগল, কখনো দুইজন একই সঙ্গে বলছে। পিয়েরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। অন্য সকলের কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে বলে উঠল, আমি শুধু বলেছি, কি প্রয়োজন সেটা জানা থাকলে ত্যাগের উদ্দেশ্যটা আরো কার্যকরী হতে পারে।
তার কাছাকাছি একটি বৃদ্ধ ঘুরে তাকাল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে টেবিলের অন্য দিক থেকে কে যেন চিৎকার করে ওঠায় তার মনোযোগ সেইদিকে ঘুরে গেল।
একজন চেঁচিয়ে বলল, ঠিক, মস্কো আত্মসমর্পণ করবে। সেই হবে আমাদের প্রায়শ্চিত্ত!
অন্য একজন বলে উঠল, লোকটি মানবজাতির শত্রু! আমাকে বলতে দিন… ভদ্রমহোদয়গণ, আপনারা আমাকে চেপে মেরে ফেলছেন!…
.
অধ্যায়-২৩
সেইমুহূর্তে উঁচু থুতনি ও সতর্ক চোখ নিয়ে কাউন্ট রন্তপচিন ঘরে ঢুকল, ইউনিফর্ম পরা, কাঁধের উপর চাদর। দ্রুতপায়ে সে দ্রজনদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
বলল, আমাদের সর্বাধীপ সম্রাট এখনই এসে পড়বেন। রাজপ্রাসাদ থেকেই আমি সোজা চলে এসেছি। যে অবস্থার মধ্যে আমরা আছি তাতে আলোচনার কিছুটা প্রয়োজন আছে। সম্রাট অনুগ্রহ করে আমাদের ও বণিকদের এখানে আহ্বান করেছেন। বণিকদের হলটা দেখিয়ে বলল, ওখান থেকে লক্ষ লক্ষ আসবে, কিন্তু আমাদের কাজ মানুষ সরবরাহ করা, তাই বলে নিজেদের রেহাই দেওয়া নয়…এটুকু আমাদের করতেই হবে!
টেবিলে উপবিষ্ট বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটা বৈঠক বসল। আলোচনা পর্ব শান্তিতেই চুকে গেল। এতক্ষণের হৈ-হল্লার পরে তাদের বার্ধক্যজীর্ণ গলায় আমি রাজি অথবা বড় জোর আমারও ঐ একই মত প্রভৃতি কথাগুলি কেমন যেন শোকাবহ শোনাল।
মস্কোর সম্ভ্রান্ত মহল এবং ভদ্রমহল প্রস্তাব নিয়েছে যে, সমালেনস্ক ভদ্রমহলের মতোই তারাও প্রতি এক হাজার ভূমিদাসের দরুন দশজন করে সশস্ত্র সৈনিক সরবরাহ করবে। এই প্রস্তাবটি সচিবকে লিখে নিতে বলা হল। বৈঠক সেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভদ্রমহোদয়রা সশব্দে চেয়ার ছেড়ে উঠল এবং জোড়ায় জোড়ায় হাত ধরাধরি করে ঘরময় পায়চারি করতে করতে কথা বলতে লাগল।
সম্রাট! সম্রাট! একটা আকস্মিক চিঙ্কারে হলগুলি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। সকলেই ফটকের দিকে ছুটে গেল।
দুই সারি সম্ভ্রান্তজনের মাঝখান দিয়ে সম্রাট হলে প্রবেশ করল। প্রত্যেকের মুখে সশ্রদ্ধ, ভয়চকিত কৌতূহল। পিয়ের অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, সম্রাটের সব কথা সে শুনতে পেল না। যতটুকু শুনল তাতে বুঝল যে, সাম্রাজ্যের আসন্ন বিপদ এবং মস্কোর সম্ভ্রান্ত মহলের উপর তার ভরসার কথাই সম্রাট বলল। প্রত্যুত্তরে সদ্যগৃহীত প্রস্তাবটির কথা তাকে জানিয়ে দেওয়া হল।
