সম্রাট ভিতরে চলে গেল, ভিড়ও পাতলা হয়ে গেল। হল তো! বলেছিলাম না অপেক্ষা করলেই–আর তাই তো হল! অনেকেই খুশিভরা গলায় বলতে লাগল।
পেতয়াও খুব খুশি। কিন্তু আজকের মতো সব আনন্দ শেষ হয়ে গেছে বুঝতে পেরে এবং এবার বাড়ি ফিরে যেতে হবে ভেবে তার মন খারাপ হয়ে গেল। ক্রেমলিন থেকে সে সোজা বাড়ি ফিরে গেল না, বন্ধু অকলনস্কির সঙ্গে দেখা করতে গেল, তার বয়স পনেরো, সেও রেজিমেন্টে যোগ দিচ্ছে। বাড়ি ফিরে পেতয়া দৃঢ়স্বরে জানিয়ে দিল, তাকে যদি সেনাদলে ঢুকতে না দেওয়া হয় তাহলে সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবে। আর পরদিনই কাউন্ট ইলিয়া রস্তভ-ব্যাপারটা পুরোপুরি মেনে না নিলেও-পেতয়ার চাকরির ব্যবস্থা কোথায় করতে পারলে বিপদের সম্ভাবনা সবচাইতে কম হবে সেই খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।
.
অধ্যায়-২২
দুদিন পরে ১২ই জুলাই তারিখে সুবোদা প্রাসাদের বাইরে প্রচুর গাড়ির ভিড় দেখা গেল।
বড় হলটা লোকে ভর্তি। প্রথমত, ইউনিফর্ম পরিহিত সম্ভ্রান্ত ও ভদ্রজনরা, দ্বিতীয়ত, নীল কাপড়ের পুরো স্কুলের কোটপরিহিত, মেডেলশোভিত দাড়িওয়ালা বণিকের দল। সম্ভ্রান্তজনদের হলে অনবরত চলাফেরা ও ওজনন শেহে। অংশ ও গুঞ্জন-ধ্বনি চলেছে। প্রধান প্রধান ব্যক্তিরা সম্রাটের প্রতিকৃতির নিচে বড় টেবিলটা ঘিরে উঁচু পিঠওয়ালা চেয়ারগুলোতে বসেছে, কিন্তু দ্ৰজনরা বেশির ভাগই ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ক্লাবে অথবা তাদের নিজ নিজ বাড়িতে এইসব সম্ভ্রান্ত লোকদের সঙ্গে পিয়েরের রোজই দেখা হয়। আজ তারা সকলেই ইউনিফর্মে সজ্জিত-কেউ পরেছে ক্যাথারিনের সময়কার পোশাক, কেউ বা সম্রাট পলের সময়কার, আবার কারো পরিধানে আলেক্সান্দারের সময়কার নতুন ইউনিফর্ম। ক্ষীণদৃষ্টি, দন্তবিহীন, টাকমাথা, হলদে ও ফুলো-ফুলো, অথবা কৃশকায় ও ভাঁজ পড়া চামড়ার বুড়োরাই বেশি করে চোখে পড়ছে। তাদের বেশির ভাগই চুপচাপ আসনে বসে আছে, আর হাঁটাচলা ও কথাবার্তার সময়ও অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সীদের সঙ্গে মিশছে। তাদের সকলের মুখেই একটা বিচিত্র পরস্পরবিরোধী ভাব : সাধারণভাবে একটা গুরুগম্ভীর ঘটনার প্রত্যাশায়, আবার সেই সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের তাসের বোস্টন-খেলা, রাঁধুনি পিতর, জিনাইদা দিমিত্রিয়েভনার স্বাস্থ্য ইত্যাদির প্রতি আগ্রহ।
সম্রাটের ইস্তাহার পড়া হল। সকলের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। তারপর শুরু হল আলোচনা। সম্রাট যখন ঢুকবে তখন মার্শালরা কোথায় দাঁড়াবে, সম্রাটের সম্মানে কখন একটা বল-নাচের আয়োজন করা হবে, তারা জেলাওয়ারি ভাগ হবে না, প্রদেশওয়ারি, ইত্যাদি সব বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা হল। কিন্তু যেই যুদ্ধের কথা উঠল, অমনি আলোচনার জোয়ারে ভাটা পড়ল, সকলেই বক্তা হবার বদলে শ্রোতা হতে চাইল।
পিয়েরের কিছু বলার ইচ্ছা হল। সে সবে মুখ খুলবে এমন সময় জনৈক দন্তবিহীন সেনেটর তাকে বাধা দিয়ে নিচু অথচ স্পষ্ট স্বরে বলতে শুরু করল, জনাব, আমি মনে করি, বর্তমান মুহূর্তে বাধ্যতামূলক সৈন্যকরণ সাম্রাজ্যের পক্ষে ভালো, না বেসরকারি বাহিনী ডাকা হয় নি। আমাদের প্রতি যে আবেদন রেখে মহামান্য সম্রাট আমাদের সম্মানিত করেছেন তার জবাব দিতেই আমাদের ডাকা হয়েছে। বাধ্যতামূলক সৈন্যকরণ না বেসরকারি বাহিনী-এর মধ্যে কোনটা শ্ৰেয় সে বিচার আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হাতেই ছেড়ে দিতে পারি…।
হঠাৎ পিয়ের তার উত্তেজনা প্রকাশের একটা পথ পেয়ে গেল। এগিয়ে গিয়ে বক্তাকে বাধা দিল। কি বলবে তা সে এখনো জানে না, কিন্তু সাগ্রহে বলতে শুরু করল-কখনো ফরাসিতে, কখনো পুঁথিগত রুশ ভাষায়।
সে বলতে শুরু করল, ক্ষমা করবেন ইয়োর এক্সেলেন্সি। (সেনেটরটি তার পরিচিত হলেও তার মনে হল যে এখানে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্বোধন করাই প্রয়োজন।) যদিও আমি এই ভদ্রলোকের সঙ্গে একমত নই…তার সঙ্গে পরিচিত হবার সৌভাগ্য আমার হয় নি…তবু আমি মনে করি, কেবলমাত্র সহানুভূতি ও উদ্দীপনা প্রকাশের জন্যই এতগুলি সম্ভ্রান্ত মানুষকে এখানে ডাকা হয় নি, সেইসঙ্গে কীভাবে আমরা পিতৃভূমিকে সাহায্য করতে পারি সে উপায়ের কথাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। আমি মনে করি, সম্রাট নিশ্চয়ই চান না যে আমরা শুধু কতকগুলি ভূমিদাসের মালিক হিসেবে ম্রাটের সেবায় তাদের নিয়োজিত করব এবং নিজেদেরও কামানের মুখে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকব, তিনি অবশ্যই চান যে আমরা তাঁকে সুপরামর্শ দেব।
পিয়ের আরো বলল, আমি মনে করি, এইসব প্রশ্ন আলোচনা করার আগে আমাদের সম্রাটকে জিজ্ঞাসা করা উচিত–হিজ ম্যাজেস্টির প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গেই জিজ্ঞাসা করা উচিত-বর্তমানে আমাদের সৈন্য সংখ্যা কত এবং এই মুহূর্তে আমাদের সেনাদল কি অবস্থায় আছে, তারপরে…।
পিয়েরের মুখ থেকে এই কথাগুলি উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই তিনদিক থেকে আক্রমণ শুরু হল। সবচাইতে প্রচণ্ড আক্রমণ এল তার একজন পূর্বপরিচিতের কাছ থেকে। এই বোস্টন-খেলোয়াড়টির সঙ্গে আগাগোড়াই তার খুব প্রীতির সম্পর্ক। নাম স্তেপান স্তেপানভিচ আদ্রাকসিন। নিজের বয়স্ক মুখের উপর একটা আকস্মিক বিদ্বেষের ভাব ফুটিয়ে আদ্রাকসিন চিৎকার করে পিয়েরকে বলল, প্রথমত, আমি আপনাকে বলতে চাই যে এ বিষয়ে সম্রাটকে প্রশ্ন করবার কোনো অধিকার আমাদের নেই, দ্বিতীয়ত, রুশ সম্ভ্রান্ত মহলের যদি সে অধিকার থাকেও তবু এ ধরনের প্রশ্নের কোনো জবাব সম্রাট দিতে পারেন না। সৈন্য চলাচল করে শত্রুপক্ষের চলাচলের সঙ্গে তাল রেখে, আর সৈন্য সংখ্যাও বাড়ে-কমে…
