সম্রাট কম্পিত গলায় বলল, ভদ্রমহোদয়গণ! রুশ সম্ভান্তজনের অনুরাগে আমি কখনো সন্দেহ করিনি, কিন্তু আজ তাদের অনুরাগ আমার প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। পিতৃভূমির নামে আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি! ভদ্রমহোদয়গণ, আসুন, আমরা কাজে নেমে পড়ি! সময় বড়ই মূল্যবান…।
সম্রাট থামল। সকলে চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরল। সকলের মুখে আনন্দের উচ্ছ্বাস।
কাউন্ট রস্তভ ফুঁপিয়ে বলে উঠল, হা, বড়ই মূল্যবান…সম্রাটের মতোই কথা। সে পিছনে দাঁড়িয়েছিল। কিছুই শুনতে না পেলেও নিজের মতো করেই সে সবকিছু বুঝে নিয়েছে।
সম্ভ্রান্ত মহলের হল থেকে সম্রাট বণিকদের হলে ঢুকল। সেখানে প্রায় দশ মিনিট কাটাল। অন্য অনেকের সঙ্গে পিয়ের দেখল, বণিকদের হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় ম্রাটের চোখ থেকে আবেগে জল ঝরছে। পরে জানা গেল, সেখানে ভাষণ শুরু করতে না করতেই তার চোখে অশ্রু ঝরতে শুরু করে আর কম্পিত গলায় তার ভাষণটি শেষ হয়। পিয়ের যখন সম্রাটকে বেরিয়ে আসতে দেখল তখন তার সঙ্গে ছিল দুইজন বণিক, তাদের একজনকে পিয়ের চেনে–এক পেটমোটা Otkupshchik (মদের দোকানের মালিক)। অপরজন মেয়র-ছুঁচলো পাণ্ডুর মুখ, সরু দাড়ি। দুজনই কাঁদছে। সরু লোকটির দুই চোখ জলে ভরেছে, আর মোটা Otkupshchik শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বারবার বলছে :
আমাদের জীবন, আমাদের সম্পত্তি–সব আপনি গ্রহণ করুন ইয়োর ম্যাজেস্টি।
সেইমুহূর্তে পিয়েরের মনেও একটিমাত্র বাসনা-সেও দেখাতে চায় যে সবকিছু করতে, সর্বস্ব উৎসর্গ করতে সে প্রস্তুত। নিজের বক্তৃতার নিয়মতান্ত্রিক সুরের জন্য এখন তার লজ্জা হচ্ছে, সুযোগ পেলেই সে তা মুছে ফেলতে চায়। কাউন্ট মামোনভ একটা রেজিমেন্ট পাঠাবে শুনে বেজুখভ সঙ্গে সঙ্গে রস্তপচিনকে জানিয়ে দিল যে সে একহাজার সৈনিক ও তাদের খরচ দেবে।
চোখের জল না ফেললেও তার মনে যে কি হচ্ছে বুড়ো রস্তভ সেকথা তার স্ত্রীকে বলতে পারল না। তক্ষুনি পেতয়ার অনুরোধ মেনে নিয়ে সে নিজে গিয়ে ছেলের নাম লিখিয়ে দিল।
পরদিন সম্রাট মস্কো ছেড়ে চলে গেল। সমবেত স্ক্রান্তজনরা তাদের ইউনিফর্ম খুলে ফেলে যার যার বাড়িতে ও ক্লাবে ফিরে গেল, মনের মধ্যে কিছুটা আর্তনাদ চেপে রেখে নায়েবদের সৈন্যসংগ্রহের হুকুম জারি করল, আর নিজেদের কাজে নিজেরাই অবাক হয়ে গেল।
১০.১ রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ
দশম পর্ব – অধ্যায়-১
নেপোলিয়ন রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেছে কারণ সে ড্রেসডেনে না গিয়ে পারেনি, যে সম্মান সে পেয়েছে তাতে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি, একটা পোলিশ ইউনিফর্ম গায়ে না চড়িয়ে পারেনি, জুন মাসের সকালবেলাকার উত্তেজক প্রভাবকে এড়াতে পারেনি এবং কুরাকিন ও পরে বলাশেভের উপর রাগে ফেটে না পড়ে পারেনি।
আলেক্সান্দার আলোচনায় বসতে অস্বীকার করেছে কারণ সে ব্যক্তিগতভাবে অপমানিত বোধ করেছে। বার্কলে দ্য তলি সাধ্যমতো সৈন্যপরিচালনা করতে চেষ্টা করেছে কারণ স্বীয় কর্তব্য পালন করে সেনাপতি হিসেবে সুনাম অর্জন করতে চেয়েছে। রস্তভ ফরাসিদের আক্রমণ করেছে কারণ সমতল মাঠের উপর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে যাবার লোভ সে সামলাতে পারেনি। ঠিক সেই একইভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অসংখ্য মানুষ প্রত্যেকেই নিজ নিজ ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য, অভ্যাস, পরিবেশ ও উদ্দেশ্য অনুসারে কাজ করেছে। তারা কাজ করেছে ভয় অথবা অহংকারের বশে, কখনো উল্লসিত হয়েছে বা ক্ষুব্ধ হয়েছে, মনে মনে কল্পনা করেছে যে নিজেদের জ্ঞানবুদ্ধি মতো স্বাধীনভাবেই তারা কাজ করেছে, কিন্তু আসলে তারা সকলেই ইতিহাসের হাতের পুতুল, যে কাজ তারা করেছে তার আসল চেহারা তাদের কাছে ছিল লুকনো, আর আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট ও পরিষ্কার। কর্মবীর মানুষদের এটাই অনিবার্য নিয়তি; সাময়িক মর্যাদার যত উঁচু ধাপে তারা অধিষ্ঠিত থাকে ততই তাদের স্বাধীনতা কমতে থাকে।
১৮১২-র অভিনেতারা অনেকদিন হল রঙ্গমঞ্চও ছেড়ে চলে গেছে, তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ নিশ্চিহ্ন হয়ে মুছে গেছে, একমাত্র ঐতিহাসিক ফলাফল ছাড়া সেকালের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
যে মানুষগুলো ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যসাধনে ব্রতী হয়েছিল বিধাতাপুরুষ তাদের বাধ্য করেছে এমন একটি প্রচণ্ড উদ্দেশ্য সাধন করতে যা তারা কেউ আশা করেনি-নেপোলিয়ন নয়, আলেক্সান্দার নয়, এমন কি সত্যিকারের যুদ্ধ যারা করেছিল তারাও নয়।
১৮১২-তে ফরাসি বাহিনী কেন বিধ্বস্ত হয়েছিল তার কারণ আজ আমাদের কাছে পরিষ্কার। এ-কথা কেউ অস্বীকার করবে না যে সে কারণ একদিকে যেমন একটা যুদ্ধকালীন অভিযানের কোনোরকম প্রস্তুতি না নিয়ে রাশিয়ার একেবারে ভিতরে ঢুকে পড়া, অন্যদিকে তেমনই রাশিয়ার সব শহরগুলি জ্বালিয়ে দিয়ে রুশ জনসাধারণের মনে শক্রর প্রতি একটা তীব্র ঘৃণা জাগিয়ে তুলে যুদ্ধের চরিত্রটাকেই বদলে দেওয়া। কিন্তু সেসময় এটা কেউই বুঝতে পারেনি (এখন সেটা খুবই পরিষ্কার) যে একমাত্র এই পথেই শ্রেষ্ঠ সেনাপতির দ্বারা পরিচালিত পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ আট লক্ষ সৈন্য নিয়ে গঠিত একটি বাহিনী তার অর্ধেক সৈন্য নিয়ে গঠিত এবং অনভিজ্ঞ সেনাপতিদের দ্বারা পরিচালিত রুশ বাহিনীর কাছে বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে। শুধু যে কেউ এটা বুঝতে পারেনি তাই নয়, রাশিয়ার দিক থেকে একমাত্র যে পথে রাশিয়া বাঁচতে পারত সেই পথ রোধ করবার সর্বপ্রকার চেষ্টাই করা হয়েছিল, আর ফ্রান্সের দিক থেকে নেপোলিয়নের অভিজ্ঞতা এবং তথাকথিত সামরিক প্রতিভা সত্ত্বেও গ্রীষ্মের শেষে মস্কোর দিকে অগ্রসর হবার সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল, অর্থাৎ ঠিক সেই কাজটি করা হয়েছিল যার ফল অনিবার্য ধ্বংস হতে বাধ্য।
