সকলের চোখে-মুখে একই উত্তেজনা ও উৎসাহের প্রকাশ। পেতয়ার পাশে দাঁড়িয়ে একটি বণিক-পত্নী ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, তার গাল বেয়ে জল গড়াতে লাগল।
আঙুল দিয়ে চোখের জল মুছে সে বারবার বলছে, বাবা! দেবদূত! মানিক!
একমুহূর্ত চুপ করে থেকে জনতা আবার সামনে ছুটতে লাগল। অন্য সকলের সঙ্গে পেতয়াও দাঁতে দাঁত চেপে, হিংস্রভাবে চোখ ঘুরিয়ে, কনুইয়ের ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে চিৎকার করে বলতে লাগল হুররা! মনে হল, সেইমুহূর্তে সে বুঝি অন্য সকলকে, এমন কি নিজেকেও খুন করতে প্রস্তুত।
পেতয়া ভাবতে লাগল, তাহলে এই হচ্ছেন সম্রাট! না, তার কাছে আমি নিজে কোনো আবেদন রাখতে পারব না, সেটা হবে খুবই দুঃসাহসের কাজ। কিন্তু তৎসত্ত্বেও সে মরিয়া হয়ে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য লড়াই করতে লাগল। একসময় অপ্রত্যাশিতভাবে পেতয়ার বুকে ও পাঁজরে এত জোরে একটা আঘাত লাগল, আর চারদিককার ভিড় তাকে এমনভাবে চেপে ধরল যে হঠাৎ তার চোখের সামনে সবকিছু কেমন,ধোয়াটে হয়ে গেল, সে জ্ঞান হারাল। যখন সম্বিৎ ফিরে এল তখন সে দেখল, মাথার পিছনে একগুচ্ছ পাকা চুল আর পরনে একটা নোংরা নীল জোব্বা পাদরির মতো দেখতে একটি লোক এক হাতে তাকে তুলে ধরে অন্য হাতে ভিড়ের চাপকে ঠেকিয়ে রাখছে।
পাদরি বলছে, এই ছেলেমানুষ ভদ্রলোকটিকে আপনারা যে পিষে মেরে ফেলছেন! কী করছেন আপনারা? আস্তে!…এরা ওকে পিষে ফেলবে, পিষে ফেলবে!
সম্রাট গির্জায় প্রবেশ করল। ভিড়টা আবার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। পাদরি রুদ্ধশ্বাস, বিবর্ণ পেতয়াকে জার-কামানের কাছে বয়ে নিয়ে গেল। পেতয়ার জন্য অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করল। যারা কাছাকাছি দাঁড়িয়েছিল তারা তার সেবা করতে লাগল, কোটের বোতাম খুলে দিল, কামানের উঁচু বেদীর উপর তাকে বসিয়ে দিল, যারা তাকে পিষে ধরেছিল তাদের বকতে লাগল।
এরকম অবস্থায় পড়লে তো মানুষ মরতেই পারে! এসবের অর্থ কি? মানুষকে খুন করা! আহা বেচারি, কাগজের মতো শাদা হয়ে গেছে!–নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল।
অচিরেই পেতয়া আত্মস্থ হল, তার মুখের রং ফিরে এল, ব্যথাটা চলে গেল, বরং সেই সাময়িক কষ্টের মূল্যে কামানের পাশে এমন একটা জায়গা পেয়ে গেছে যেখান থেকে ফিরবার পথে সে সম্রাটকে দেখতে পাবে। এখন আর পেতয়া আবেদন পেশ করার কথা ভাবছে না। সম্রাটকে যদি একটিবার দেখতে পায় তাহলেই সে খুশি!…
সহসা নদীর তীর থেকে কামানের গর্জন শোনা গেল। তুর্কীদের সঙ্গে সন্ধি-পত্রে স্বাক্ষর উপলক্ষে উৎসব শুরু হচ্ছে। সে-দৃশ্য দেখতে সকলেই নদীর দিকে ছুটে গেল। হয়তো পেতয়াও যেত, কিন্তু সেই পদারি তাকে থামিয়ে দিল। কামানের গর্জন তখনো চলেছে। অফিসার, সেনাপতি ও পারিষদের দলও গির্জা থেকে ছুটে বেরিয়ে এল, তাদের পিছনে অন্যরা এল ধীরে সুস্থে : আবার সকলেই মাথার টুপি খুলে সেইখানে ফিরে এল। অবশেষে ইউনিফর্ম ও চাদর গায়ে চারটি লোক গির্জার দরোজা দিয়ে বেরিয়ে এল। পুনরায় ভিড়ের ভিতর থেকে চিৎকার উঠল হুররা! হুররা!
তিনি কোন জন? কোন জন? অশ্রুসিক্ত গলায় পেতয়া আশেপাশের লোকদের জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু কেউ জবাব দিল না, সকলেই সমান উত্তেজিত। আনন্দের অশ্রুতে দুই চোখ ভরে আসায় ভালো করে দেখতে না পেলেও সেই চারজনের একজনের উপর স্থির দৃষ্টি রেখে–যদিও আসলে সে লোকটি সম্রাট নয়-পেতয়া মহা উৎসাহে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল হুররা! মনে মনে সংকল্প করল, যাই ঘটুক না কেন আগামীকাল সে সেনাদলে যোগ দেবেই।
জনতা সম্রাটের পিছনে ছুটতে লাগল, রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত তাকে অনুসরণ করল, তারপর যার যার মতো সরে পড়তে লাগল। বেলা অনেক হয়েছে। পেতয়া কিছুই খায়নি, শরীর ঘামে ভিজে গেছে, তবু সে বাড়ি না ফিরে তখনো প্রাসাদের সামনে যে ভিড় জমেছিল তাদের সঙ্গেই রয়ে গেল। সম্রাট তখন ডিনার খাচ্ছে। সে প্রাসাদের জানালাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। কিসের আশায় তা সে নিজেই জানে না। সম্রাটের সঙ্গে ডিনার খেতে বিশিষ্ট ব্যক্তি যারা ফটক দিয়ে ঢুকছে, তাদের দেখে আর দরবারের যেসব পরিচারক খাবার পরিবেশন করছে, জানালাপথে চকিতে তাদের দেখে সমবেত জনতার সঙ্গে পেতয়ার মনেও কেমন যেন ঈর্ষা দেখা দিল।
সম্রাট ডিনার খাচ্ছে। সেইসময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভালুয়েভ বলল : ওরা এখনো ইয়োর ম্যাজেস্টিকে আর একবার দেখবার আশায় রয়েছে।
একটা বিস্কুট চিবুতে চিবুতে সম্রাট উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়াল। পেতয়াসহ ভিড়ের লোকরা সকলেই ব্যালকনির দিকে ছুটল।
দেবদূত! সোনা-মানিক! হুররা! বাবা!…জনতা চিৎকার করে উঠল। পেতয়াও গলা মেলাল। যেসব নরনারী দুর্বলচিত্ত তার আনন্দে আবার কেঁদে ফেলল। পেতয়াও তাদেরই একজন।
বিস্কুটের যে বড় টুকরোটা সম্রাটের হাতে ছিল সেটা ভেঙে প্রথমে ব্যালকনির আলসেতে এবং পরে মাটিতে পড়ে গেল। যে কোচোয়ানটি খুব কাছে দাঁড়িয়েছিল সে একলাফে সামনে গিয়ে সেটা তুলে নিল। ভিড়ের ভিতর থেকে আরো কয়েকজন কোচয়ানের দিকে ছুটে গেল। তা দেখে সম্রাট এক প্লেটভর্তি বিস্কুট আনিয়ে সেগুলো ছুঁড়ে দিতে লাগল। পেতয়ার চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল, জনতার চাপে পিষ্ট হবার বিপদের কথা ভেবে আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে সেও বিস্কুটের দিকে ছুটে গেল। কেন যে গেল তা সে জানে না, কিন্তু জারের হাতের একটা বিস্কুট তাকে পেতেই হবে, কোনোমতেই সে হার মানবে না। একটি বুড়ি একটা বিস্কুট ধরতে যাচ্ছিল, এক লাফে এগিয়ে গিয়ে পেতয়া তাকে ফেলে দিল, মাটিতে পড়ে গিয়েও বুড়ি হার মানল না-বিস্কুট নেবার জন্য হাত বাড়াল, কিন্তু তার হাত বিস্কুট পর্যন্ত পৌঁছল না। পেতয়া হাঁটু দিয়ে বুড়ির হাতটা সরিয়ে দিয়ে একটা বিস্কুট আঁকড়ে ধরল এবং পাছে বেশি দেরি হয়ে যায় এই আশংকায় আবার চেঁচিয়ে বলল হুররা! তখন তার গলার স্বর কর্কশ হয়ে উঠেছে।
