কাউন্টেস দুই হাত জোড় করে সভয়ে আকাশের দিকে তাকাল, তারপর সক্রোধে স্বামীর দিকে মুখ ঘোরাল।
বলল, এই তো তোমার কথাবার্তার ফল!
কিন্তু ততক্ষণে কাউন্ট তার উত্তেজনা কাটিয়ে উঠেছে।
বলল, হয়েছে, হয়েছে! একজন যোদ্ধা বটে! না! যতসব বাজে কথা! তোমার এখন লেখাপড়ার বয়স!
মোটেই বাজে কথা নয় বাপি! ফেদিয়া অবলেনস্কি আমার চাইতে বয়সে ছোট, আর সেও তো যাচ্ছে। তাছাড়া, আর যাই হোক, এ সময় আমি তো লেখাপড়া নিয়ে থাকতে পারি না যখন… পেতয়া থেমে গেল, তার মুখ লাল হতে হতে ঘাম ঝরতে লাগল, তবু সে কোনোরকম বলল, যখন আমার পিতৃভূমি বিপন্ন।
খুব হয়েছে, খুব হয়েছে–যতসব…
কিন্তু তুমি তো নিজেই বললে সবকিছু ত্যাগ করবে।
পেতয়া! থাম। আমি বলছি, থাম! স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কাউন্ট বলল, বিবর্ণ মুখে কাউন্টেস ছেলের দিকেই একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আর আমি বলছি–এখানে উপস্থিত পিতর কিরিলিচও তোমাকে বলবেন…
আমি বলছি, সব বাজে কথা। এখনো তোমার মুখ থেকে মায়ের দুধ শুকোয়নি, আর তুমি কিনা যুদ্ধে যেতে চাও! আমি বলছি, ওসব ছাড়। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য কাউন্ট উঠে দাঁড়াল। কগজপত্রগুলো নিয়েই গেল, হয়তো পড়ার ঘরে ঘুমোবার আগে আর একবার পড়ার ইচ্ছা আছে।
বলল, ওহে পিতর কিরিলিচ, চল, একটু ধূমপান করা যাক।
পিয়ের উত্তেজিত ও অস্থির। নাতাশার উজ্জ্বল চোখের সাদর আহ্বানই তার এই অবস্থা করেছে।
না, ভাবছি এবার বাড়ি যাব।
বাড়ি? সেকি, তোমার তো সন্ধ্যাটা এখানেই কাটাবার কথা।…আজকাল তো তুমি আর ঘন ঘন আস না, অথচ তুমি এলেই আমার এই মেয়েটির চোখমুখ ঝলমল করে ওঠে।
পিয়ের তাড়াতাড়ি বলে উঠল, তা ঠিক, আমি ভুলেই গিয়েছিলাম…আমাকে বাড়ি যেতেই হবে…কাজ…
আচ্ছা, তাহলে অ রিভোয়া! বলে কাউন্ট ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পিয়েরের চোখের দিকে সদর্পে তাকিয়ে নাতাশা শুধাল, কেন আপনি চলে যাচ্ছেন? কেন এত বিচলিত হয়েছেন?
পিয়ের বলতে চাইল, কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি! কিন্তু সেকথা বলল না, মুখটা লাল হতে হতে চোখে জল এসে গেল, সে চোখ নামিয়ে নিল।
কারণ আরো কমদিন আসাই আমার পক্ষে ভালো…কারণ…না, আমার কাজ আছে তাই…
সে কি? না, আমাকে বলুন! দৃঢ়তার সঙ্গে শুরু করেও নাতাশা হঠাৎ থেমে গেল।
বিষণ্ণ, বিব্রত মুখে তারা পরস্পরের দিকে তাকাল। পিয়ের হাসতে চাইল, কিন্তু পারল না : তার হাসিতে কষ্টই প্রকাশ পেল, নিঃশব্দে নাতাশার হাতে চুমো খেয়ে বেরিয়ে গেল।
পিয়ের মনে মনে স্থির করল, আর কোনোদিন রস্তভদের বাড়ি যাবে না।
.
অধ্যায়-২১
চূড়ান্ত আপত্তির কথা শোনার পর পেতয়া নিজের ঘরে গিয়ে দরোজা বন্ধ করে দিয়ে অনেক কাঁদল। সে যখন নিঃশব্দে চা খেতে এল তখনো তার মুখ বিষণ্ণ, তাতে চোখের জলের দাগ, প্রত্যেকেই তাকে না দেখার ভান করল।
পরদিন সম্রাট মস্কোয় এল, রস্তভ-বাড়ির কয়েকজন ভূমিদাস তাকে দেখতে যাবার জন্য অনুমতি চেয়ে নিল। সেদিন সকালে পেতয়া অনেকক্ষণ ধরে সাজ-পোশাক পরল, চুল ও কলার ঠিক করল, যাতে তাকে বেশ বয়স্ক দেখায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভ্রুকুটি করল, অঙ্গভঙ্গি করল, কাঁধে ঝাঁকুনি দিল এবং শেষপর্যন্ত কাউকে কিছু না বলে টুপিটা নিয়ে পিছনের দরোজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। সে স্থির করেছে, সোজা সম্রাটের কাছে চলে যাবে এবং তার কোনো পারিষদকে বুঝিয়ে বলবে যে, ছেলেমানুষ হলেও সে, কাউন্ট রস্তভ, দেশের সেবা করতে চায়, তার অল্পবয়স রাজভক্তির পথে বাধা হতে পারে না…পোশাক পরতে পরতে পারিষদকে বলবার মতো অনেক কথাই সে মনে মনে ঠিক করে নিল।
পেতয়া যতই ক্রেমলিনের দিকে এগোতে লাগল ততই ভিড় বাড়তে লাগল। ত্রিমূর্তি ফটকের ভিতরে ঢুকবার পরে ভিড়ের চাপে সে এমনভাবে দেয়ালের দিকে সরে গেল যে সে বাধ্য হয়ে থেমে গেল, আর গাড়িগুলো সশব্দে তার পাশ দিয়ে চলে যেতে লাগল। পেতয়ার পাশে দাঁড়িয়েছিল একটি চাষী রমণী, একটি পরিচারক, দুইজন ব্যবসায়ী ও একজন বরখাস্ত সৈনিক। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরে পেতয়া আবার এগিয়ে যেতে চেষ্টা করল এবং কনুই তুলে পথ করতে লাগল। কিন্তু তার ঠিক সামনেই ছিল চাষী রমণীটি, কনুইয়ের ধাক্কা খেয়ে সে রেগে চিৎকার করে উঠল, ধাক্কাধাক্কি করছ কেন ছোটকর্তা? দেখতে পাচ্ছ না আমরা সকলেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি? তাহলে ঠেলছ কেন?
যে কেউই ঠেলতে পারে, এই কথা বলে পরিচারকটি একধাক্কায় পেতয়াকে একটা নোংরা জায়গায় ফেলে দিল।
পেতয়া হাত দিয়ে মুখের ঘাম মুছল, অনেক যত্ন করে পরা ভেজা কলারটা তুলে নিল। সে বুঝতে পারল, এখন তাকে যেরকম দেখাচ্ছে তাতে তাকে সম্রাটের কাছে হাজির করা যাবে না। তার ভয় হল, পারিষদের কাছে যেতে পারলেও এ অবস্থায় সে তাকে সম্রাটের কাছে নিয়ে যেতে রাজি হবে না। অথচ এই ভিড়ের মধ্যে নিজের সাজপোশাক ঠিক করা বা অন্য কোথাও যাওয়াও সম্ভব নয়। ক্রমে সবগুলি গাড়ি চলে গেলে ভিড়ের সঙ্গে সঙ্গে পেতয়াও ক্রেমলিন স্কোয়ার ঢুকে পড়ল। ক্রেমলিন স্কোয়ার তখন লোকে লোকারণ্য। লোক যে শুধু স্কোয়ারেই ভিড় করেছে তাই নয়, আশপাশের ঢালু জায়গায় ও বাড়ির ছাদেও লোকের পর লোক।
কিছুক্ষণের জন্য ভিড় একটু পাতলা হল। তারপরেই হঠাৎ সকলে মাথার টুপি খুলে একসঙ্গে একই দিকে ছুটতে লাগল। সকলে পেতয়াকে এমনভাবে চেপে ধরল যে তার শ্বাস বন্ধ হয় হয়। সকলেই চেঁচাচ্ছে হুররা! হুররা! পেতয়া গোড়ালির উপরে ভর করে দাঁড়িয়েও চারদিকে শুধু মানুষ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না।
