পিয়ের একটু অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বরিস বলল, আজ তাদের সঙ্গে ডিনারে যোগ দিতে কাউন্ট রস্তভ আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ওঃ, কাউন্ট রস্তভ! পিয়ের আনন্দে চেঁচিয়ে বলল। তাহলে তুমি তাঁর ছেলে ইলিয়া? কী আশ্চর্য, প্রথম তোমাকে আমি চিনতেই পারি নি। তোমার কি মনে আছে মাদাম জাকোতের সঙ্গে আমরা স্প্যারো পাহাড়ে গিয়েছিলাম?…এমন দিনকাল পড়েছে…
ঈষৎ ব্যঙ্গাত্মক অথচ বলিষ্ঠ হাসি হেসে বরিস ইচ্ছা করেই বলল, আপনি ভুল করেছেন। আমি বরিস, প্রিন্সেস আন্না মিখায়লভনা বেস্কায়ার ছেলে। বাবা রুস্তভই ইলিয়া, তার ছেলের নাম নিকোলাস। কোনো মাদাম জাকোৎকে আমি চিনি না।
যেন মশা বা মৌমাছিতে কামড়াচ্ছে এমনিভাবে পিয়ের মাথা হাত নাড়তে লাগল।
আরে, এসব আমি কি ভাবছি? সবকিছু গুলিয়ে ফেলেছি। মস্কোতে এতসব আত্মীয়স্বজন বাস করে। তাহলে তুমি বরিস? অবিশ্য। আচ্ছা, এবার বুঝতে পারছি আমরা কোথায় আছি। বোলন অভিযান সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? কি জান, নেপোলিয়ন যদি চ্যানেল পার হয় তাহলে ইংরেজদের বড়ই দুর্দিন। আমি তো মনে করি অভিযানটা খুবই সহজসাধ্য। শুধু যদি ভিলেনুভ সবকিছু তালগোল পাকিয়ে না ফেলে!
বরিস বোলন অভিযানের কিছুই জানে না; সে খবরের কাগজ পড়ে না; আর ভিলেনুভের নামও সে এই প্রথম শুনল।
শান্ত বিদ্রুপাত্মক গলায় সে বলল, এখানে মস্কোতে আমরা রাজনীতির চাইতে ভোজসভা আর কুৎসা রটনা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকি। এ সব কথা আমি কিছু জানি না, আর ভেবেও দেখিনি। মস্কো প্রধান্ত গালগল্প, নিয়েই ব্যস্ত। এই মুহূর্তে তারা আপনার ও আপনার বাবার কথাই বলাবলি করছে।
পিয়ের ভালোমানুষি হাসি হাসল; যেন সঙ্গীটির জন্য তার ভয় হয়েছে পাছে সে এমন কিছু বলে বসে যার জন্য পরে তাকে অনুতাপ করতে হবে। কিন্তু পিয়েরের চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বরিস স্পষ্ট উচ্চারণে, পরিষ্কার ভাষায়, কঠিন কণ্ঠে কথা বলতে লাগল।
গাল-গল্প করা ছাড়া মস্কোর আর কোনো কাজ নেই। প্রত্যেকেরই ভাবনা, কাউন্ট তার বিষয়-সম্পত্তি কাকে দিয়ে যাবেন, যদিও তিনি হয়তো আমাদের সকলের চাইতে বেশিদিন বেঁচে যেতেও পারেন; আমার তো আন্তরিক আশা, তাই তিনি বাঁচবেন।…
পিয়ের বাধা দিয়ে বলল, হ্যাঁ, এ সবই ভয়ংকর, খুব ভয়ংকর।
পিয়েরের তখনো ভয় যে এই তরুণ অফিসার হয়তো এমনকিছু বলে ফেলবে যাতে যে নিজেই গোলমালে পড়ে যাবে।
বরিস ঈষৎ লজ্জা পেলেও গলার স্বর বা মনের ভাবের কোনো পরিবর্তন না করেই বলল, আর এটাও আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে এই ধনী লোকটির কাছ থেকে সকলেই কিছু হাতাবার চেষ্টা করছে।
তাই তো মনে হয়, পিয়ের ভাবল।
কিন্তু পাছে আপনি ভুল বোঝেন তাই আমি বলতে চাই, আপনি যদি আমাকে বা আমার মাকে সেই দলের লোক বলে মনে করে থাকেন তাহলে আপনি খুবই ভুল করেছেন। আমরা খুব গরিব, কিন্তু অন্তত আমার দিক থেকে বলতে পারি যে যেহেতু আপনার বাবা ধনী লোক শুধু সেই কারণেই নিজেকে তার আত্মীয় বলে আমি মনে করি না, এবং আমি বা আমার মা কোনোদিনই তার কাছে কিছু চাইব না, বা নেব না।
অনেকক্ষণ পর্যন্ত পিয়ের ব্যাপারটা বুঝতে পারল না; কিন্তু যখন বুঝল তখন সোফা থেকে লাফিয়ে উঠে কনুইর নিচ দিয়ে বরিসকে জড়িয়ে ধরে বরিসের চাইতেও বেশি লজ্জা পেয়ে লজ্জা ও বিরক্তির একটা মিশ্র অনুভূতির সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
আরে, এ তো খুব আশ্চর্য! তুমি কি মনে কর যে আমি… কে ভাবতে পারত?… আমি ভালোভাবেই জানি…
কিন্তু বরিস আবার তাকে বাধা দিল।
সব কথা বলতে পারায় আমি খুশি হয়েছি। আপনার হয়তো ভালো লাগেনি? আমাকে ক্ষমা করবেন, কিন্তু আশা করি আমি আপনাকে আঘাত দেইনি। খোলাখুলি কথা বলাই আমার রীতি।. আচ্ছা, কী জবাব আমি নিয়ে যাব? রস্তভদের বাড়িতে খেতে যাচ্ছেন তো?
একটা কর্তব্যের হাত থেকে রেহাই পেয়ে এবং একটা বিসদৃশ পরিস্থিতি থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে এনে অন্য একজনকে তার মধ্যে আটকে দিয়ে বরিস আবারও বেশ খুশি হয়ে উঠল। একটু শান্ত হয়ে পিয়ের বলল, না, কিন্তু আমি বলছি, তুমি একটি আশ্চর্য ছেলে! এইমাত্র তুমি যা বললে সেটা ভালো কথা, খুব ভালো কথা। অবশ্য, আমাকে তুমি জান না। দীর্ঘদিন আমাদের মধ্যে দেখাসাক্ষাৎ নেই… ছেলেবেলার পরে আমাদে আর দেখা হয়নি। তুমি হয়তো ভাবতে পার যে আমি…আমি বুঝতে পেরেছি, ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি। আমি নিজে এটা পারতাম না, সে সাহস থাকা উচিতও নয়, কিন্তু এটা চমৎকার। তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়ে খুব খুশি হয়েছি। একটু থেমে আবার বলল, তুমি যে আমাকে সন্দেহ করেছ এটা অদ্ভুত! সে হাসতে শুরু করল। আরে, তাতে কী হয়েছে। আশা করি আমাদের পরিচয় আরো ঘনিষ্ঠ হবে। সে বরিসের হাতে চাপ দিল। তুমি কি জান, আমি একবারও কাউন্টের সঙ্গে দেখা করতে যাইনি। তিনিও আমাকে ডেকে পাঠাননি।… মানুষ হিসেবে তার জন্য আমার দুঃখ হয়, কিন্তু আমি কী করতে পারি?
বরিস হেসে জিজ্ঞেস করল, তাহলে আপনি মনে করেন যে নেপোলিয়ন তার বাহিনী নিয়ে ওপারে যেতে পারবে?
পিয়ের বুঝল যে বরিস প্রসঙ্গটা পাল্টাতে চাইছে; তার নিজেরও তাই ইচ্ছা, সুতরাং সে বোলন অভিযানের সুবিধা অসুবিধাগুলি বুঝিয়ে বলতে লাগল।
