পিয়ের বলল, হ্যাঁ, আমার কাছে আছে। সম্রাট কাল এখানে আসছেন।…ভদ্রজনদের একটা বিশেষ সভা হবে, শোনা যাচ্ছে, প্রতি হাজারে দশ জনের যুদ্ধে যোগদান করা বাধ্যতামূলক হবে। ও হ্যাঁ, আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! আচ্ছা, যুদ্ধের সংবাদ কি?
আমরা আবার পশ্চাদপসরণ করছি। শোনা যাচ্ছে, এরমধ্যেই আমরা স্মোলেনস্কের কাছে এসে গেছি, পিয়ের জবাব দিল।
হে প্রভু, প্রভু হে! কাউন্ট বলে উঠল। ইস্তাহারটা কোথায়?
সম্রাটের আবেদন ঠিক আছে।
পিয়ের পকেট হাতড়াতে লাগল, কিন্তু পেল না। সেইসময় কাউন্টেস ঘরে ঢুকল পিয়ের তার হাতে চুমো খেল।
কী মুস্কিল, কোথায় যে সেটা রাখলাম, পিয়ের বলল।
এই এক ছেলে, সবসময় সবকিছু হারায়, কাউন্টেস বলল।
নাতাশা ঘরে ঢুকল। নীরবে পিয়েরের দিকে তাকিয়ে বসল। সে ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই পিয়েরের বিষণ্ণ মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ইস্তাহারটা খুঁজতে খুঁজতেই বারবার তার দিকে তাকাতে লাগল।
না, সত্যি! এখনই বাড়ি যাচ্ছি, নিশ্চয় সেখানে ফেলে এসেছি। এখনই যাচ্ছি…
কিন্তু তোমার যে খেতে দেরি হয়ে যাবে।
তাই তো! আর আমার কোচোয়ানও তো চলে গেছে।
কাগজপত্র খুঁজতে বাইরের ঘরে গিয়ে সোনিয়া সেগুলি পেয়ে গেছে। পিয়ের সেগুলি যত্ন করে তার টুপির লাইনিংয়ের ভিতর খুঁজে রেখেছিল। ইস্তাহারটা হাতে নিয়ে পিয়ের সেটা পড়তে গেল।
বুড়ো কাউন্ট বাধা দিয়ে বলল, না, ডিনারের পরে। তার ইচ্ছা, বেশ আরাম করে খবরটা শুনবে।
ডিনারের সময় সেন্ট জর্জের নতুন বীরের উদ্দেশ্যে শ্যাম্পেন পান করা হল, শিনশিন সবিস্তারে শহরের সংবাদ পরিবেশন করল : জর্জিয়ার বৃদ্ধা প্রিন্সেসের অসুখ, মস্কো থেকে মেতিভিয়েরের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, ফরাসি টিকটিকি সন্দেহে জনৈক জার্মানকে ধরে রন্তপচিনের কাছে নিয়ে আসা, আর রস্তপচিন কর্তৃক তাকে ছেড়ে দিয়ে জনসাধারণকে এই বলে আশ্বাস দেওয়া যে লোকটা মোটেই টিকটিকি নয়, একটা জার্মান হাভাতেমাত্র।
কাউন্ট বলল, লোকজনকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আমি তো কাউন্টেসকে বলে দিয়েছি, অত বেশি ফরাসি বলা ভালো নয়। ওসবের সময় এখন নয়।
শিনশিন শুধাল, আর শুনেছেন কি? রুশ ভাষা শেখার জন্য প্রিন্স গলিৎসিন একজন মাস্টার রেখেছেন। রাজপথে ফরাসিতে কথা বলা এখন বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
বুড়ো কাউন্ট পিয়েরকে সম্বোধন করে বলল, তোমার কি খবর কাউন্ট পিতর কিরিলিচ? তারা যদি বেসরকারি সৈনিকদের ডাক দেয় তাহলে তো তোমাকেও ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হতে হবে।
পিয়ের আপন মনে কি যেন ভাবছিল। কথাটা বুঝতে না পেরে কাউন্টের দিকে তাকাল।
তারপর বলল, ও, হ্যাঁ, যুদ্ধের কথা। না! আমি আর কি যুদ্ধ করব? তবু এখন তো সবকিছুই অদ্ভুত, কী অদ্ভুত! আমি ঠিক বুঝতে পারি না। আমি জানিও না। যুদ্ধ-বিগ্রহ আমার মোটেই ভালো লাগে না। কিন্তু আজকের দিনে কারো নিজের কথা তো চলবে না।
ডিনারের পরে কাউন্ট আরামকেদারায় আরাম করে বসে সোনিয়াকে বলল আবেদনটা পড়তে। সোনিয়া চমৎকার পড়তে পারে।
আমাদের প্রাচীন রাজধানী মস্কোর প্রতি।
অসংখ্য সৈন্য নিয়ে শত্রুপক্ষ রুশ সীমান্তে ঢুকে পড়েছে। সে আসছে আমাদের প্রিয় স্বদেশকে ধ্বংস করতে। সোনিয়া গলা চড়িয়ে পড়ছে। কাউন্ট চোখ বুজে শুনছে আর মাঝে মাঝে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছে।
নাতাশা সোজা হয়ে বসে একবার বাবার দিকে, একবার পিয়েরের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকাচ্ছে।
রাশিয়ার আসন্ন বিপদ, মস্কোর উপর, বিশেষ করে তার সম্ভ্রান্ত সমাজের উপর ম্রাটের ভরসার কথা পড়া শেষ করে সোনিয়া কাঁপা-কাঁপা গলায় শেষের কথাগুলি পড়তে শুরু করল : জনসাধারণের সঙ্গে পরামর্শ করতে এবং লেডির নির্দেশ জানাতে রাজধানীতে এবং রাজ্যের অন্যসব অঞ্চলে গিয়ে হাজির হতে আমরা বিলম্ব করব না। আমাদের ধ্বংস করবার যে আশা নিয়ে শত্রু আসছে সে ধ্বংস তার নিজের মাথায়ই যেন পড়ে, দাসত্বমুক্ত ইওরোপ যেন রাশিয়ার নামে গৌরব বোধ করে!
কাউন্ট ভেজা চোখ খুলে বার বার নাক ঝেড়ে বলে উঠল, ঠিক, ঠিক তাই! সম্রাট শুধু মুখের কথাটি বলুন, তাহলেই আমরা সর্বস্ব ত্যাগ করব, কোনো কিছুতেই পিছ-পা হব না।
কাউন্টের দেশপ্রেমের উপর শিনশিন একটা তামাশার কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই নাতাশা লাফিয়ে উঠে একদৌড়ে বাবার কাছে গেল।
বাপি কী ভালো! বলে সে বাবাকে চুমো খেল, তারপর নিজের অজান্তেই লাস্যময় চোখে পিয়েরের দিকে তাকাল।
এই যে! এই তোমাদের আর এক দেশভক্ত! শিনশিন বলল।
দেশভক্ত মোটেই নয়, কিন্তু সোজা কথায়… আহত সুরে নাতাশা জবাব দিল। আপনার সবকিছুতেই ঠাট্টা, কিন্তু এটা মোেটই ঠাট্টার ব্যাপার নয়…
কাউন্ট লল, ঠাট্টাই বটে! ওকে ওর কথা বলতে দাও, আমরা সকলেই যাব…আমরা তো জার্মান নই!
কিন্তু কথাটা লক্ষ্য করেছেন কি? পরামর্শ করতে পিয়ের বলল।
তা সে যেজন্যই হোক…।
এতক্ষণ পেতয়ার দিকে কেউ নজর দেয়নি। এবার সে মুখটা লাল করে বাবার কাছে এগিয়ে গেল, কখনো গম্ভীর, কখনো কর্কশ ভাঙা গলায় বলল, দেখ বাপি, তোমাকে পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, মামণিকেও বলছি, তোমরা যা খুশি মনে করতে পার, কিন্তু আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, আমাকে সেনাদলে যেতে দিতেই হবে, কারণ তা না হলে…বাস, আর কিছু না…।
