অনেকদিন থেকেই সে নিজেও সেনাদলে যোগদানের কথা ভাবছে, হয়তো এতদিনে যোগ দিত যদি না কতকগুলি বাধা এসে দাঁড়াত। প্রথম, যে ভ্রাতৃসঙ্রে সদস্য হিসেবে সে তাদের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তার মূলমন্ত্রই হচ্ছে নিরবধি শান্তি ও যুদ্ধ বর্জন, দ্বিতীয়, ইউনিফর্ম পরিহিত মস্কোপন্থীদের মুখে দেশপ্রেমের বুলি শুনে সেপথে হাঁটতে তার বড়ই লজ্জাবোধ হয়েছে। কিন্তু সে যে সেনাদলে যোগদানের অভিপ্রায়কে কার্যে পরিণত করতে পারেনি তার প্রধান কারণ ঐ পশুর সংখ্যা ৬৬৬, যে পশুটি মহৎ বাণী ও অপবিত্র বাণী উচ্চারণ করতে পারে তার ক্ষমতার একটা সময় সীমা নির্ধারণের মহৎ কর্মে তার ভূমিকা যখন অনাদিকাল থেকেই নিয়তি-নিয়ন্ত্রিত হয়ে আছে, সেই হেতু সে-ব্যাপারে তার কোনো উদ্যোগ নেওয়াই উচিত নয়, যা অবশ্যম্ভাবী তার জন্য অপেক্ষা করে থাকাই তার কর্তব্য।
.
অধ্যায়-২০
সব রবিবারেই যেরকম হয়ে থাকে, সেদিনও কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর রস্তদের সঙ্গে ডিনারে যোগ দেবার কথা।
তাই তাদের একলা পাবার জন্য পিয়ের একটু আগেই সেখানে হাজির হল।
এবছর সে এতই মোটাসোটা হয়েছে যে সে যদি লম্বা না হত তাহলে তাকে অস্বাভাবিক দেখাত।
বিড় বিড় করতে করতে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। তার কোচোয়ান জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করল না সে অপেক্ষা করবে কি না। সে জানে, রস্তভদের বাড়িতে এলে তার মনিবটি মাঝরাত পর্যন্ত সেখানে থাকে। রস্তভদের পরিচারক ছুটে এসে তার জোব্বা, টুপি ও লাঠি হাতে নিল। ক্লাবের অভ্যাস মতো পিয়ের সবসময়ই টুপি ও লাঠি বাইরের ঘরে রেখে যায়।
প্রথমেই দেখা হল নাতাশার সঙ্গে। দেখা হবার আগে জোব্বা খুলবার সময়ই তার গলা সে শুনেছে। গানের ঘরে সে গলা সাধছিল। পিয়ের জানে, অসুখ হবার পর থেকে নাতাশা গান করে না। তাই তার গলা শুনে সে বিস্মিত ও আনন্দিত হল। আস্তে দরোজাটা খুলে তাকে দেখতে পেল, লিলাক-রঙের পোশাক পরে গান গাইতে গাইতে সে ঘরময় হেঁটে বেড়াচ্ছে। দরোজা খোলার সময় নাতাশার পিঠ ছিল পিয়েরের দিকে, কিন্তু দ্রুত ঘুরতে গিয়ে তার বিস্মিত মুখটা দেখেই নাতাশা আরক্ত মুখে তার কাছে ছুটে এল।
কৈফিয়তের সুরে বলল, আমি আবার গান করতে চাই, তবু তো একটা কিছু করা হবে।
চমৎকার কথা!
আপনি আসায় কত খুশি হয়েছি! আজ আমি খুব সুখী। নাতাশার এমন সজীবতা পিয়ের অনেকদিন দেখেনি। আপনি কি জানেন, নিকলাস সেন্ট জর্জের ক্রশ পেয়েছে। তাকে নিয়ে আমার কত গর্ব।
হ্যাঁ, ঘোষণাটা আমিই পাঠিয়েছি। কিন্তু আপনাকে আর বাধা দেব না, বলেই পিয়ের বৈঠকখানা চলে যাচ্ছিল।
নাতাশা তাকে থামাল।
সলজ্জভাবে বলল, কাউন্ট, গান করা কি অন্যায়?
না…তা কেন হবে? বরং…কিন্তু আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন?
নাতাশা তাড়াতাড়ি জবাব দিল, আমি নিজে ঠিক বুঝতে পারি না, কিন্তু আপনার অমতে কোনো কাজ করতে আমি চাই না। আপনাকে আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি। আপনি যে আমার কাছে কত বড়, আমার জন্য যে কত করেছেন তা আপনি জানেন না…তাড়াতাড়ি কথাগুলি বলতে থাকায় একথা শুনে পিয়েরের মুখ যে লাল হয়ে উঠেছে সেটা নাতাশার নজরে পড়েনি। সেই সামরিক হুকুমনামা আমি দেখেছি যে সে, বলকনস্কি (অতি দ্রুত ফিসফিস করে সে নামটা বলল) রাশিয়াতেই আছে এবং আবার সেনাদলেই যোগ দিয়েছে। আপনি কী মনে করেন? সে কি কোনোদিন আমাকে ক্ষমা করবে? আমার প্রতি কি সবসময়ই তিক্ত মনোভাব পোষণ করবে না? আপনি কী মনে করেন? আপনি কী মনে করেন?
পিয়ের জবাব দিল, আমি মনে করি…তার ক্ষমা করার কিছু নেই…তার জায়গায় যদি আমি হতাম…
ভাবানুষঙ্গক্রমে পিয়ের তৎক্ষণাৎ সেই দিনটিতে ফিরে গেল যেদিন নাতাশাকে সান্ত্বনা দেবার জন্য সে বলেছিল, সে যদি নিজে না হয়ে পৃথিবীর একজন সেরা লোক হত, স্বাধীন হত, তাহলে নতজানু হয়ে সে তার পাণিপ্রার্থনা করত, সেই একই করুণা, মমতা ও ভালোবাসার অনুভূতি আজও তাকে পেয়ে বসেছে, আর সেই একই কথা তার ঠোঁটের আগায় এসেছে। কিন্তু সে কথাগুলি বলার অবসর নাতাশা তাকে দিল না।
সে বলে উঠল, হ্যাঁ, আপনি…আপনি…সেকথা স্বতন্ত্র। আপনার চাইতে দয়ালু, উদার ও ভালো লোক আমি দেখিনি, কেউ তা হতেও পারে না! সেদিন যদি আপনি না থাকতেন, বা এখনো না থাকতেন, তাহলে আমার যে কী হত তা আমি জানি না, কারণ…।
হঠাৎ তার চোখে জল এসে গেল, মুখটা ঘুরিয়ে গানটাকে চোখের সামনে মেলে ধরে সে আবার গাইতে শুরু করল, আবার ঘরময় হাঁটতে লাগল।
ঠিক সেইসময় পেতয়া বৈঠকখানা থেকে ছুটে এল।
পনেরো বছরের সুন্দর ছেলেটি, মুখখানি গোলাপী, ঠোঁট দুটো টুকটুকে লাল, দেখতে নাতাশার মতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার জন্য তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সম্প্রতি সে ও তার বন্ধু অবলেনস্কি স্থির করেছে হুজার-বাহিনীতে যোগ দেবে।
এ-বিষয়ে পিয়েরের মতামত জানবার জন্যই সে ছুটে এসেছে।
তার হাতটা ধরে পেতয়া বলল, আচ্ছা, আমার মতলবটা কেমন? ঈশ্বরের দোহাই পিতর কিরিলিচ! আপনি আমার একমাত্র ভরসা!
ওঃ হ্যাঁ, তোমার সেই মতলব। হুজার-বাহিনীতে যোগ দেওয়া তো? আজই বলব, সব কথা তুলব।
বুড়ো কাউন্ট বলল, আচ্ছা বাবা, তোমার কাছে কি ইস্তাহারটা আছে? কাউন্টেস রাজুমভস্কির প্রার্থনা অনুষ্ঠানে গিয়েছিল, সেখানেই নতুন প্রার্থনাটা শুনে এসেছে। সে তো বলল খুব ভালো হয়েছে।
