পিয়ের এখনো সমাজে আসা-যাওয়া করে, আগের মতোই মদ খায়, সেই একই অলস, ইন্দ্রিয়াসক্ত জীবন যাপন করে, কারণ রস্তভদের বাড়িতে যতটা সময় সে কাটায় তারপরেও অনেক সময় তার হাতে থাকে, আর মস্কোতে থেকে যেসব অভ্যাস ও পরিচয় সে গড়ে তুলেছে তাদের স্রোত দুর্বার বেগে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীকালে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে যতই বেশি করে খারাপ সংবাদ আসতে লাগল, আর নাতাশার স্বাস্থ্য যতই ভালো হতে থাকল, ততই তার প্রতি সযত্ন করুণা ও অবিরাম চঞ্চলতায় ভাটা পড়তে লাগল। তার কেবলই মনে হতে লাগল, যে অবস্থায় সে আছে সেটা দীর্ঘদিন চলতে পারে না, এমন একটা দুর্বিপাক আসছে যা তার সমগ্র জীবনটাকেই বদলে দেবে, আর সেই আসন্ন দুর্বিপাকের লক্ষণই সে সর্বত্র খুঁজে বেড়াতে লাগল। একজন গুরুভাই সন্ত জন-এর প্রত্যাদেশ থেকে নেপোলিয়ন সম্পর্কে নিম্নলিখিত ভবিষ্যদ্বাণী পিয়েরের কাছে প্রকাশ করেছে।
(নিউ টেস্টামেন্ট-এর শেষ পর্ব) অ্যাপোক্যালিন্স-এর ১৩ অধ্যায়, ১৮ শ্লোকে বলা হয়েছে :
এই তো জ্ঞানের কথা। যার বুদ্ধি আছে সে পশুর সংখ্যাটা গণনা করুক : কারণ সেটাই তো মানুষের সংখ্যা, আর তার সংখ্যা হল ছয়শত তিনকুড়ি হয়।
আর সেই একই অধ্যায়ের পঞ্চম শ্লোকে আছে :
আর তাকে একটা মুখ দেওয়া হয়েছিল মহৎ বাণী ও অপবিত্র বাণী উচ্চারণ করতে, আর তাকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল চল্লিশ ও দুই মাস চলবার।
ফরাসি বর্ণমালা যদি হিব্রুদের সংখ্যাগত মূল্য অনুসারে এমনভাবে লেখা যায় যেখানে প্রথম নয়টি অক্ষর একককে বোঝায় এবং বাকিগুলি দশককে বোঝায়, তাহলে তার তাৎপর্য দাঁড়াবে এরকম :
| a | b | c | d | e | f | g | h | i | k | l | m | n |
| 1 | 2 | 3 | 4 | 5 | 6 | 7 | 8 | 9 | 10 | 20 | 30 | 40 |
| o | p | q | r | s | t | u | v | w | x | y | z | |
| 50 | 60 | 70 | 80 | 90 | 100 | 110 | 120 | 130 | 140 | 150 | 160 |
L’Empereur Napoleon শব্দগুলি যদি সংখ্যা দিয়ে লেখা যায় তাহলে তাদের যোগফল দাঁড়াবে ৬৬৬, আর তাহলে নেপোলিয়নই হল সেই পশু যার কথা অ্যাপোক্যালিপ্স-এ আগেই বলে দেওয়া হয়েছে। (Empereur-এর আগেকার Le শব্দ থেকে e অক্ষরের বিলোপ ঘটানোর ফলে তার দরুন ৫ ধরে নিয়ে।) তাছাড়া, যে পশুকে একটা মুখ দেওয়া হয়েছিল মহৎ বাণী ও অপবিত্র বাণী উচ্চারণ করতে তাকে বোঝাবার জন্য যে quarante-deux (বিয়াল্লিশ) শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে তার উপরেও ঐ একই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে সেই একই ৬৬৬ সংখ্যাটাই পাওয়া যায়, তার থেকে এটাই ধরে নেওয়া যায় যে নেপোলিয়নের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার শেষ সীমা সে ই ১৮১২ সাল যখন ফরাসি সম্রাটের বয়স হয়ে বিয়াল্লিশ। এই ভবিষ্যদ্বাণীতে পিয়ের খুবই খুশি হল, কেমন করে সেই পশু অর্থাৎ নেপোলিয়নের ক্ষমতার অবসান ঘটবে-এই প্রশ্নটা সে প্রায়ই নিজেকে করতে লাগল এবং তাই নিয়েই মেতে রইল।
.
পিয়ের রস্তভদের কথা দিয়েছিল যে জনসাধারণের কাছে আবেদন ও সেনাদলের সর্বশেষ সংবাদ সে কাউন্ট রস্তপচিনের কাছ থেকে এনে দেবে। সেই উদ্দেশ্যে রবিবার সকালে রস্তপচিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সেখানে সেনাদল থেকে সদ্য-আগত একজন সংবাদ-বাহকের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। লোকটি তার পরিচিত, মস্কোর অনেক বল-নাচে সে অংশ নিয়েছে।
সংবাদ-বাহকটি বলল, ঈশ্বরের দোহাই, দয়া করে আমার কিছু কাজ হাল্কা করে দিন। বাবা-মাদের জন্য আমি এক বস্তাভর্তি চিঠি নিয়ে এসেছি।
সেই চিঠিগুলির মধ্যে একটা চিঠি নিকলাস রস্তভ লিখেছে তার বাবাকে। পিয়ের সে চিঠিটা নিল, রস্তপচিন তাকে দিল সদ্যমুদ্রিত সম্রাটের আবেদনপত্র, সেনাবাহিনীর প্রতি সর্বশেষ হুকুমনামাএবং একেবারে সাম্প্রতিক একটা সংবাদ-বুলেটিন। সেনাবাহিনীর হুকুমনামায় চোখ বুলিয়ে পিয়ের দেখতে পেল, নিহত, আহত ও পুরস্কৃতদের তালিকায় রয়েছে নিকলাস রস্তভের নাম, অস্ত্রভনার যুদ্ধে সাহস প্রদর্শনের জন্য তাকে দেওয়া হয়েছে চতুর্থ শ্রেণীর সেন্ট জর্জের ক্রশ। সেখানে প্রিন্স আন্দ্রু বলকনস্কির নামও আছে, তাকে অশ্বারোহী রেজিমেন্টের কমান্ডার-পদে নিযুক্ত করা হয়েছে। রস্তভ-পরিবারে বলকনস্কির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে সে চায় না, অবশ্য ছেলের সম্মান লাভের সুখবরটা তাদের না জানিয়ে সে পারবে না। তাই সেনাদলের মুদ্রিত হুকুমনামা এবং নিকলাসের চিঠিটা সে রস্তভদের কাছে পাঠিয়ে দিল, আর আবেদনপত্র, বুলেটিন ও অন্য হুকুমনামাগুলি নিজের কাছেই রেখে দিল, ডিনারে যাবার সময় সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।
কাউন্ট রস্তপচিনের সঙ্গে আলোচনাকালে তার কণ্ঠস্বরের উদ্বেগ, সংবাদ-বাহিনীর সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে সেনাদলের খারাপ অবস্থা সম্পর্কে তার মন্তব্য, মস্কোতে গুপ্তচর আবিষ্কারের গুজব, এমন একটি বিজ্ঞপ্তির ব্যাপক প্রচার যাতে বলা হয়েছে যে নেপোলিয়ন হেমন্তকালের মধ্যেই রাশিয়ার উভয় রাজধানীতে পদার্পণ করতে কৃতসংকল্প, আর ঠিক পরদিনই সম্রাটের এখানে আসার কথা–এই সবকিছু মিলিয়ে পিয়েরের মনে আবার নতুন করে সেই উত্তেজনা ও প্রত্যাশাকে জাগিয়ে তুলল যা তার সচেতন অন্তরে জেগে আছে ধূমকেতুর আবির্ভাবের দিন থেকে, বিশেষ করে যেদিন যুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে সেইদিন থেকে।
