কাউন্টেস বারকয়েক মেয়ের নরম মুখ ও উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাল তার সাহায্যের জন্য।
অপ্রত্যাশিতভাবে প্রার্থনা-অনুষ্ঠানের ঠিক মাঝখানে ডিয়েকন একটা ছোট টুল নিয়ে এল এবং পর্দার সামনে সেটাকে বসিয়ে দিল। লাল ভেলভেটের পাগড়ি মাথায় দিয়ে পুরোহিত বেরিয়ে এল, মাথার চুল ঠিক করে নিয়ে টুলের সামনে অনেক চেষ্টা করে নতজানু হয়ে বসল। তার অনুকরণ করে প্রত্যেকেই বিস্ময়ে পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগল। তারপরই শুরু হল সাইনড থেকে সদ্যপ্রাপ্ত প্রার্থনা-অনুষ্ঠান-শত্রুর আক্রমণ থেকে রাশিয়াকে উদ্ধার করার প্রার্থনা।
পুরোহিত প্রার্থনা শুরু করল : হে শক্তিমান ঈশ্বর, আমাদের উদ্ধারকর্তা ঈশ্বর! আজকের দিনে তোমার ক্ষীণ জনগণের দিকে করুণা ও আশীর্বাদের দৃষ্টিতে তাকাও, দয়া করে আমাদের প্রার্থনা শোন, আমাদের রক্ষা কর, আমাদের করুণা কর! সমগ্র পৃথিবীকে ধ্বংস করার বাসনা নিয়ে এই শত্রুরা তোমারই দেশে এসে আমাদের আক্রমণ করেছে, এই আইনবিরোধী লোকগুলি সম্মিলিত হয়েছে তোমার রাজ্যের পতন ঘটাতে, তোমার প্রিয় জেরুজালেমকে, তোমার প্রিয় রাশিয়াকে ধ্বংস করতে, তোমার মন্দিরকে অপবিত্র করতে, তোমার পূজা-বেদিকে উচ্ছেদ করতে, আমাদের পবিত্র তীর্থগুলিকে কলুষিত করতে। হে প্রভু, কতকাল, আর কতকাল দুষ্ট বিজয়ী হবে? কতকাল তাদের হাতে থাকবে বে-আইনী ক্ষমতা?
প্রভু ঈশ্বর! তোমার কাছে আমাদের এই প্রার্থনা তুমি শোন, তোমার শক্তি দিয়ে আমাদের পরম দয়ালু অধিপতি প্রভু সম্রাট আলেক্সান্দার পাভলভিচকে তুমি শক্তিশালী করে তোেল, তার ন্যায়নিষ্ঠা ও স্র স্বভাবের কথা স্মরণ রেখে তাকে যথাযথভাবে পুরস্কৃত কর, যাতে আমরা ও তোমার প্রিয় ইজরায়েল রক্ষা পায়। সম্রাটের উপদেশ, তার প্রচেষ্টা, তার কার্যাবলীকে তুমি আশীর্বাদ কর, তোমার সর্বশক্তিমান হাত বাড়িয়ে তার রাজ্যকে শক্তিশালী কর, আর ঠিক যেভাবে তুমি আমালেকের উপর মোজেসকে, মিদিয়ানের উপর গিদিয়নকে এবং গোলিয়াথের উপর ডেভিডকে বিজয়ী করেছিলে তেমনি করেই শত্রুর উপরে তাকে বিজয়ী করে দাও। তার বাহিনীকে রক্ষা কর, তোমার নাম নিয়ে যারা অস্ত্রসজ্জায় সেজেছে তাদের হাতে তুলে দাও পিতলের ধনুক, যুদ্ধের উপযোগী শক্তি দিয়ে তাদের কটিদেশকে বস্ত্রাবৃত কর। বর্শা ও বর্ম নিয়ে আমাদের সাহায্যে উঠে দাঁড়াও। আমাদের বিরুদ্ধে যারা পাপের হাত তুলেছে তাদের তুমি ব্যর্থ করে দাও, লজ্জার মধ্যে নিক্ষেপ কর, তোমার বিশ্বস্ত যোদ্ধাদের সামনে তারা যেন ঝড়ের মুখে ধুলোর মতো উড়ে যায়, তোমার শক্তিমান দেবদূত যেন তাদের বিহ্বল করে দিয়ে পালাতে বাধ্য করে, নিজেদের অজ্ঞাতেই তারা যেন পাশবদ্ধ হয়, গোপনে যে ষড়যন্ত্র তারা করেছে তা যেন তাদেরই প্রত্যাঘাত করে, তারা যেন তোমার সেবকের পায়ে এসে পড়ে আর আমাদের সৈন্যদের হাতে পর্যদস্ত হয়। প্রভু, তুমি তো ছোট-বড় সকলেরই রক্ষাকর্তা, তুমি তো ঈশ্বর, মানুষ কখনো তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না!
হে আমাদের পিতৃপুরুষের ঈশ্বর! পুরাকাল থেকে তোমার যে প্রভূত করুণা ও সপ্রেম দয়া আমরা পেয়ে এসেছি সেকথা স্মরণে রেখ, আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, আমাদের অযোগ্যতাকে তুমি ক্ষমা কর, তোমার মহান সততায় ও অসীম করুণায় আমাদের সব ত্রুটি ও বিচ্যুতি ভুলে যেও! আমাদের হৃদয়কে পবিত্র কর, আমাদের অন্তরে সধর্মকে প্রতিষ্ঠা কর, তোমার প্রতি বিশ্বাসে আমাদের শক্তিমান কর, আমাদের আশাকে কর সুরক্ষিত, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসাকে কর জাগ্রত, যে উত্তরাধিকার তুমি আমাদের ও আমাদের পিতৃপুরুষকে দিয়েছ তাকে রক্ষা করতে একপ্রাণ করে আমাদের গড়ে তোল, যাদের তুমি পবিত্র করেছ তাদের ভাগ্যের বিরুদ্ধে দুষ্টশক্তির রাজদণ্ডকে বিজয়ী হতে দিও না।
নিজের মতো করে নাতাশাও সে প্রার্থনায় যোগ দিল। সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাল, সকলকে ক্ষমা কর, শান্তি দাও, সুখ দাও, তার মন বলল, ঈশ্বর সে প্রার্থনা শুনেছে।
.
অধ্যায়-১৯
নাতাশার সকৃতজ্ঞ দৃষ্টিকে বুকের মধ্যে নিয়ে রস্তভদের বাড়ি থেকে চলে আসার পরে পিয়ের যেদিন আকাশের একটি স্থির ধূমকেতুর দিকে তাকিয়ে অনুভব করেছিল যে তার নিজের দিগন্তে নতুন কোনো কিছুর আবির্ভাব ঘটতে চলেছে-সেদিন থেকেই পার্থিব সবকিছুর অহংকার ও তুচ্ছতার যে সমস্যা তাকে প্রনিয়ত পীড়িত করছিল তার অবসান ঘটেছে। প্রতিটি কাজের মধ্যে কেন? কোথা হতে? রূপী যে ভয়ংকার প্রশ্ন সবসময় তার সামনে হাজির হত, এবার তার জায়গায় দেখা দিল অন্য আর একটি প্রশ্ন যা সেই প্রশ্নের জবাব নয়, দেখা দিল নাতাশার ছবি। যখনই কোনো তুচ্ছ আলোচনা তার কানে আসে, অথবা সে স্বয়ং তাতে অংশ নেয়, যখনই মানুষের নীচতা বা মূর্খতার কথা পড়ে বা শুনতে পায় তখন আর সে আগের মতো আতংকে শিউরে ওঠে না, নিজেকে প্রশ্ন করে না যে সবকিছুই যখন ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বোধ্য তখন তা নিয়ে মানুষ এত লড়াই করে কেন–এখন তার মনে পড়ে যায় নাতাশার শেষবারের মতো দেখা ছবিটি, আর সব সন্দেহ দূরে মিলিয়ে যায়-যে প্রশ্ন তাকে তাড়া করত তার জবাব যে সে পেয়ে গেছে তা নয়, আসলে নাতাশার যে মূর্তি তার মনে গড়ে উঠেছে তাই তাকে মুহূর্তের মধ্যে নিয়ে যায় আর একটি উজ্জ্বলতর আধ্যাত্মিক কর্মের জগতে যেখানে ভালো-মন্দর বিচার নেই-যে সৌন্দর্য ও প্রেমের জগতে বেঁচে থাকাটাই আসল কথা। যে কোনো জাগতিক নীচতার সম্মুখীন হলেই সে নিজেকে বলে, ধরা যাক, এন. এন. দেশকে ও জারকে ঠকিয়েছে, আর দেশ ও জার তাকেই সম্মানে ভূষিত করেছে, কিন্তু তাতে কি হয়েছে। গতকাল সে আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে, আমাকে আবার যেতে বলেছে, আর আমি তাকে ভালোবাসি এবং সেকথা কেউ কোনোদিন জানবে না। সঙ্গে সঙ্গে তার মন শান্ত হয়ে যায়।
