কাউন্টেসের মুখে হাসি দেখা দিল, নিজের নখের দিকে তাকিয়ে সৌভাগ্যের আশায় একটু থুথু ফেলে (রুশ প্রথা) সে বৈঠকখানায় চলে গেল।
.
অধ্যায়-১৮
জুলাইয়ের শুরুতেই যুদ্ধের নানারকম অস্বস্তিকর খবর মস্কোতে ছড়াতে লাগল, সকলেই বলাবলি করতে লাগল, সম্রাট জনসাধারণের কাছে আবেদন রেখেছে এবং নিজে সেনাদল ছেড়ে মস্কোতে আসছে। কিন্তু ১১ জুলাই পর্যন্ত কোনো ইস্তাহার বা আবেদন না পাওয়ায় সে সম্পর্কে এবং রাশিয়ার অবস্থা সম্পর্কে অতিশয়োক্তি ভরা নানা সংবাদ প্রচারিত হতে লাগল। সকলে বলতে লাগল, সেনাদলের বিপদ বুঝেই সম্রাট তাদের ছেড়ে আসছে, লোলেন আত্মসমর্পণ করেছে, নেপোলিয়নের সৈন্য-সংখ্যা দশ লক্ষে পৌঁছেছে এবং একমাত্র অঘটন ছাড়া রাশিয়ার বাঁচার কোনো আশা নেই।
১১ জুলাই, শনিবার। ইস্তাহার পাওয়া গেল, কিন্তু তাও ছাপানো নয়। পিয়ের তখন রস্তভদের বাড়িতেই ছিল, সে কথা দিল পরদিন রবিবারে সে ডিনারে আসবে এবং কাউন্ট রস্তপচিনের কাছ থেকে ইস্তাহার ও আবেদনের কপি নিয়ে আসবে।
সেই রবিবারে রস্তভরা যথারীতি রাজুমভস্কিদের ভজনালয়ে গেল। জুলাই মাসের গরম দিন। এমন কি বেলা দশটার সময় রস্তভরা যখন গাড়ি থেকে ভজনালয়ের সামনে নামল তখন বাইরের গরম হাওয়া, ফেরিওয়ালাদের চিৎকার, জনসাধারণের গ্রীষ্মকালীন হাল্কা পোশাক, রাজপথে শুকনো পাতার ছড়াছড়ি, ব্যান্ডের তালে তালে শাদা ট্রাউজার পরিহিত সৈন্যদের প্যারেড, পাথুরে রাস্তায় চাকার ঘর্ঘর শব্দ, আর উজ্জ্বল, উত্তপ্ত রোদ-সবকিছুর মধ্যেই সেই গ্রীষ্মকালীন অবসন্নতা, বর্তমানকে নিয়ে সেই সন্তোষ ও অসন্তোষ, যা যে কোনো উজ্জ্বল, উত্তপ্ত দিনে শহরবাসীরা বড় বেশি করে অনুভব করে।…তকমা-পরা পরিচারক ভিড় হটিয়ে পথ করে দিচ্ছে, সেই পথ দিয়ে মার পাশে হাঁটতে হাঁটতে নাতাশার কানে এল একটি যুবক বেশ জোরেই ফিসফিস করে তার কথা বলছে।
ঐ হলেন রস্তভা, যিনি… ।
অনেক শুকিয়ে গেছেন, কিন্তু তাহলেও কত সুন্দরী!
সে শুনল, অথবা শুনল বলে তার মনে হল, কুরাগিন ও বলকনস্কির নামও উল্লেক করা হল। সে তো সবসময় তাদের কথাই ভাবে। তার মনে হল, তাকে দেখলেই লোকে তাকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছে সেই কথাই বলে। একথা মনে হতেই তার মন খারাপ হয়ে গেল। রবিবারের কথা স্মরণ করে সে ভাবতে লাগল : আবার সেই রবিবার এসেছে–একটা সপ্তাহ কেটে গেছে, অথচ সেই একই জীবনে-যেটা কোনো জীবনই নয়, সেই একই পরিবেশ–যেখানে বেঁচে থাকা কত সহজই না ছিল। আমি সুন্দরী, আমি তরুণী, আমি জানি এখন আমি ভালো হয়ে গেছি। খারাপ ছিলাম, কিন্তু আমি তো জানি এখন আমি ভালো হয়েছি, অথচ আমার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি চলে যাচ্ছে, কারো কোনো কাজে লাগছে না। মার পাশে দাঁড়িয়ে সে পরিচিত জনকে দেখলেই মাথা নাড়ছে।
একটি সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে, তার মৃদু গাম্ভীর্য সমবেত ভক্তগণের মনে শান্তির স্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছে। পর্দার ওপাশ থেকে একটি রহস্যময় মৃদু কণ্ঠস্বর কী যেন উচ্চারণ করে চলেছে। অকারণেই উদ্বেলিত অশ্রুধারায় নাতাশার বুকটা ফুলে-ফুলে উঠছে, একটা আনন্দময় অথচ চাপা অনুভূতি তাকে চঞ্চল করে তুলেছে।
সে বলতে লাগল, আমাকে শিখিয়ে দাও আমি কী করব, কেমন করে বাঁচব, কেমন করে চিরকালের মতো ভালো হয়ে উঠতে পারব!
বেদির পর্দার সম্মুখস্থ উঁচু জায়গাটায় এসে দাঁড়াল ডিয়েকন। বুড়ো আঙুলটা বাড়িয়ে বুকের উপর ক্রুশ চিহ্ন এঁকে গম্ভীর উদাত্তকণ্ঠে সে প্রার্থনার বাণী উচ্চারণ করতে লাগল…
আসুন আমরা শান্তিতে প্রভুর কাছে প্রার্থনা করি।
এক সম্প্রদায়রূপে, শ্ৰেণীনির্বিশেষে, কারো প্রতি শত্রুতা পোষণ না করে, ভ্রাতৃপ্রেমে সকলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে–আসুন আমরা প্রার্থনা করি! নাতাশা ভাবল।
ঊর্ধ্বলোক হতে আসে যে শান্তি তার জন্য আর আমাদের আত্মার উদ্ধারের জন্য। দেবদূতদের জগতের জন্য, আর যে ঊর্ধ্বলোকে সব আত্মারা থাকে তার জন্য, নাতাশা প্রার্থনা জানাল।
যখন সকলে যোদ্ধাদের জন্য প্রার্থনা করল তখন নাতাশার মনে পড়ল তার ভাই ও দেনিসভের কথা। স্থলপথে ও জলপথে যারা ঘুরে বেড়ায় তাদের জন্য যখন প্রার্থনা করা হল তখন তার মনে পড়ল প্রিন্স আন্দ্রুকে, সে তার জন্য প্রার্থনা করল, ঈশ্বরকে মিনতি জানাল, প্রিন্স আন্দ্রুর প্রতি যত অন্যায় সে করেছে ঈশ্বর যেন তা ক্ষমা করেন। যারা আমাদের ভালোবাসে তাদের জন্য যখন প্রার্থনা করা হল তখন সে প্রার্থনা করল নিজের পরিবারের লোকজনদের জন্য, বাবা, মা ও সোনিয়ার জন্য, এই প্রথম সে যেন বুঝতে পারল তাদের প্রতি কত অন্যায় সে করেছে। যারা আমাদের ঘৃণা করে তাদের জন্য যখন প্রার্থনা করা হল, তখন নিজের শত্রুদের জন্য প্রার্থনা করতে সে তাদের খুঁজতে লাগল। অন্য অনেকের সঙ্গে তার মনে পড়ল আনাতোলকে। তার জন্যও সে প্রার্থনা করল।
প্রার্থনা-অনুষ্ঠান শেষ করে ডিয়েকন চাদরটা বুকের উপর আড়াআড়িভাবে রেখে বলল, আসুন, আমাদের সমগ্র জীবনকে প্রভু খৃস্টের কাছে উৎসর্গ করি!
নাতাশা নিজের মনেই আবৃত্তি করতে লাগল, ঈশ্বরের কাছে নিজেদের উত্সর্গ করি। ঈশ্বর, তোমার ইচ্ছার কাছেই নিজেকে নিবেদন করলাম। আমি কিছুই চাই না, আমার কোনো বাসনা নেই, শুধু আমাকে শিখিয়ে দাও-আমি কি করব, কেমন করে আমার বাসনাকে ব্যবহার করব। তুমি আমাকে গ্রহণ কর, গ্রহণ কর!
