.
অধ্যায়-১৭
নাতাশা আগের চাইতে শান্ত হয়েছে, কিন্তু সুখী হয় নি। বল-নাচ, প্রমোদ-ভ্রমণ, কনসার্ট, থিয়েটার প্রভৃতি বাহ্যিক আমোদ-প্রমোদ তো ত্যাগ করেছেই, এমন কি যখন হাসে তখন সে হাসিতেও যেন চোখের জলের ছোঁয়া লাগে। গাইতেও পারে না। যখনই হাসতে বা গাইতে চেষ্টা করে তখনই কান্নায় গলা আটকে যায় : বিষাদের কান্না, স্মৃতির কান্না, সুন্দর জীবনকে অকারণে নষ্ট করায় বিরক্তির কান্না। এই দুঃখের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসি ও গানকে অন্যায় বলে মনে হয়। সে মুখে বলে, অন্তরেও অনুভব করে, কোনো মানুষই তার কাছে আজ ভাড় নাতাসিয়া আইভানভনার চাইতে বেশি কিছু নয়। কোনো প্রহরী যেন ভিতর থেকে সবরকম আনন্দ থেকে তাকে নিবৃত্ত রাখে।
সে যে পৃথিবীর আর কারো চাইতে ভালো তো নয়ই, বরং অনেক, অনেক বেশি খারাপ–এই চিন্তা থেকেই সে সান্ত্বনা পায়। কিন্তু সেটাই তো যথেষ্ট নয়। সে নিজেকেই প্রশ্ন করে, তারপরে কি? কিন্তু ভবিষ্যতের কোনো আশাই তো নেই। জীবনে কোনো আনন্দ নেই, অথচ জীবন বয়েই চলেছে। বাড়ির সকলের কাছ থেকে সে দূরে সরে থাকে, শুধু ভাই পেতয়ার কাছেই কিছুটা স্বস্তি পায়। অন্য সকলের চাইতে তার কাছে থাকতেই ভালোবাসে, তার কাছে একা থাকলে কখনো কখনো হাসে। বাড়ি থেকে কদাচিৎ বের হয়, যারা বাড়িতে আসে তাদের মধ্যেও একমাত্র পিয়েরকে দেখেই তার সুখ। কাউন্ট বেজুখভের চাইতে বেশি যত্ন-আত্তি আর কেউ করতে পারে না, আর সেটা বোঝে বলেই তার সঙ্গেই নাতাশা বেশি সুখ পায়। এর কারণ এই নয় যে পিয়ের বিবাহিত, আসল কারণ-কুরাগিনের বেলায় যে নৈতিক ব্যবধানের অভাব ছিল এক্ষেত্রে নাতাশা সেই ব্যবধানটাই খুব বেশি করে বোধ করে, একথা কখনো তার মনে হয় না যে তাদের দুজনের সম্পর্কটা কখনো তার দিক থেকে ভালোবাসার পথ ধরতে পারে, অথবা মমতাময়, আত্ম-সচেতন, রোমান্টিক বন্ধুত্বের সেই পথ ধরতে পারে নর-নারীর যে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা তার জীবনে কয়েকবারই হয়েছে। পিয়েরের দিক থেকে সে সম্ভাবনা তো আরো কম।
সেন্ট পিতরের উপবাসের শেষের দিকে আগ্রাফেনা আইভানভনা বেলোভা নামের জনৈকা গ্রামের প্রতিবেশিনী মস্কো এল মস্কোর সন্তদের উদ্দেশে ভক্তি নিবেদন করতে। সেই পরামর্শ দিল, পবিত্র উৎসব উপলক্ষে প্রস্তুতি নেওয়া ও উপবাস করা নাতাশার পক্ষে ভালো হবে। নাতাশা সানন্দে সে পরামর্শ গ্রহণ করল। ডাক্তার তাকে ভোরে বাড়ি থেকে বের হতে নিষেধ করেছে, তবু নাতাশা উপবাস ও প্রস্তুতির জন্য পীড়াপীড়ি করতে শুরু করল। রস্তভ-পরিবারে নিজেদের বাড়িতেই তিনবার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়, নাতাশা কিন্তু তার পরিবর্তে আগ্রাফেনা আইভানভনার মতো এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গির্জায় যেতে লাগল এবং কোনো অনুষ্ঠানই বাদ দিল না।
নাতাশার এই উৎসাহ দেখে কাউন্টেসও খুশি হল, ডাক্তারি চিকিৎসায় ভালো ফল না হওয়ায় কাউন্টেস। মনে মনে এই আশাই পোষণ করত যে চিকিৎসার চাইতে প্রার্থনাতেই তার মেয়ের বেশি উপকার হবে। তাই ডাক্তারকে না জানিয়ে সে নাতাশার ইচ্ছার সঙ্গে একমত হয়ে তাকে বেলোভার হাতে ছেড়ে দিল। আগ্রাফেনা আইভানভনা সকাল তিনটের সময় নাতাশাকে ঘুম থেকে জাগাতে আসে, কিন্তু সাধারণত তাকে জেগে থাকতেই দেখে। তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে সবচাইতে বাজে পোশাকটা পরে ভোরের খোলা হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে নাতাশা ঊষার পরিষ্কার আলোয় আলোকিত নির্জন পথে নেমে যায়। আগ্রাফেনা আইভানভনার পরামর্শ মতোই তারা নিজেদের পল্লীর গির্জায় না গিয়ে কিছুটা দূরের আর একটা গির্জায় যায়, কারণ আগ্রাফেনা আইভানভনার মতে সেই গির্জার পুরোহিতটি খুব কড়া ও আদর্শবাদী মানুষ। সেখানে যেসব প্রার্থনায় তারা যোগ দেয় সেগুলি প্রায় সবই অনুশোচনামূলক। খুব ভোরে বাড়ি ফিরবার পথে তাদের সঙ্গে দেখা হয় শুধু রাজমিস্ত্রি আর ঝাড় দারদের সঙ্গে দুপাশের বাড়িতে তখন সকলেই ঘুমে অচেতন। সেই পরিবেশে নাতাশার মনের মধ্যে একটা নতুন অনুভূতি জেগে ওঠে, জেগে ওঠে নিজের দোষ সংশোধনের সম্ভাবনার চিন্তা, একটি নতুন, পরিচ্ছন্ন, সুখের জীবনের সম্ভাবনার আশা।
একটি সপ্তাহ সে এইভাবে কাটাল, আর প্রতিটি দিনই এই একই অনুভূতি জাগল তার মনে। খৃস্টের নৈশ ভোজনপর্বে অংশ নেওয়ায় তার মনে এত বেশি আনন্দের ঢেউ খেলে গেল যে নাতাশার মনে হল সে বুঝি পবিত্র রবিবার পর্যন্ত বাঁচবে না।
কিন্তু সেই সুখের দিনটি এল। সেই স্মরণীয় রবিবারে নৈশ ভোজনপর্বে যোগদান করে সে যখন শাদা মসলিনের পোশাকে সজ্জিত হয়ে বাড়ি ফিরল তখন বিগত কয়েক মাসের মধ্যে এই প্রথম সে তার মনের শান্তি ফিরে পেল, ভবিষ্যৎ জীবনের চিন্তার কোনো ভার সেখানে রইল না।
সেদিন তাকে দেখতে এসে ডাক্তার বলল, পক্ষকাল আগে যে ডোটা খাবার ব্যবস্থা দেওয়া হয়েছিল সেটা আরো কিছুদিন চালিয়ে যেতে হবে।
নিজের সাফল্যে পরিতুষ্ট হয়ে বলল, সকাল-সন্ধ্যা অতি অবশ্য এটা চালিয়ে যেতে হবে। দয়া করে এদিকে বিশেষ নজর রাখবেন।
স্বর্ণমুদ্রাটা হাত পেতে নিয়ে খুশির মেজাজে বলল, মনকে শান্ত করুন। মেয়ে অচিরেই গাইতে ও লাফাতে শুরু করবে। শেষের ওষুধটা খুব ভালো কাজ করছে। মেয়ে তো অনেক তাজা হয়ে উঠেছে।
