হুজাররা ফিরে এলে কাউন্ট অস্তারমান-তলস্তয় তাদের সঙ্গে দেখা করল, রস্তভকে ডেকে আনল, তাকে ধন্যবাদ দিল, আরো বলল যে তার এই দুঃসাহসী কাজের কথা সে সম্রাটকে জানাবে এবং তার জন্য সেন্ট জর্জ ক্ৰশ-এর সুপারিশ করবে। এই আনন্দের সংবাদেও কিন্তু রস্তভের মন থেকে সেই অস্বস্তিকর ভাবটা গেল না। সেনাপতির কাছ থেকে ফিরবার পথে সে ভাবতে লাগল, কেন আমার এরকম অস্বস্তি বোধ হচ্ছেঃ ইলিন? না, সে তো নিরাপদেই আছে। আমি কি নিজের অসম্মান করেছি? না, তাও তো নয়।…হ্যাঁ, হ্যাঁ, থুতনিতে টোল-খাওয়া সেই ফরাসি অফিসারটি। এখন মনে পড়ছে, হাতটা তুলতে গিয়ে কেমন যেন থেমে গিয়েছিল।
রস্তভ তাকিয়ে দেখল, বন্দীদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। থুতনিতে টোল-খাওয়া ফরাসিটিকে দেখবার জন্য সে তাদের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। বিদেশী ইউনিফর্ম পরে একজন হুজারের মালবাহী ঘোড়ার পিঠে চেপে সে উদ্বেগের সঙ্গে চারদিকে তাকাচ্ছে। তার হাতে তলোয়ারের যে কোপ লেগেছিল তাকে ক্ষত বলা যায় না। নকল হাসি হেসে সে রস্তভের দিকে তাকাল, হাত তুলে তাকে অভ্যর্থনা জানাল। রশুভের মনে তখনো সেই লজ্জাকর অনুভূতি।
সারাটা দিন এবং পরদিনও তার বন্ধু ও সহকর্মীরা লক্ষ্য করল যে রস্তভ কেমন যেন চুপচাপ, চিন্তিত ও অন্যমনস্ক হয়ে আছে। মদ খাচ্ছে অনিচ্ছায়, একলা থাকতে চেষ্টা করছে, আর মনের মধ্যে কি নিয়ে যেন নাড়াচাড়া করছে।
নিজের সেই বিশেষ সাফল্যের কথাই সে সবসময় ভাবে, তারই ফলে সে সেন্ট জর্জ ক্রশ লাভ করেছে, সাহসী হিসেবে তার সুখ্যাতি হয়েছে, এবং আরো কি যে হয়েছে তা সে মোটেই বুঝতে পারে না। সে ভাবে, তাহলে অন্যরা আমার চাইতেও ভীরু! তাহলে একেই বলে বীরত্ব! আর একাজ কি আমার দেশের জন্য করেছি। আর সেই গালে টোল-খাওয়া নীল চোখের লোকটিরই বা দোষ কি? সে কী ভয়ই না পেয়েছিল! ভেবেছিল আমি তাকে মেরে ফেলব। কেন তাকে মারব? আমার হাত কাঁপল। অথচ তারা আমাকে দিল সেন্ট জর্জের ক্রশ। এসব আমি বুঝতে পারি না।
নিকলাস যখন এইসব কথা ভাবছে, আর সমস্যার কোনো মীমাংসা খুঁজে পাচ্ছে না, ওদিকে তখন চাকরি ক্ষেত্রে ভাগ্যের চাকা তার পক্ষেই ঘুরে গেল। অস্ত্রভনার ঘটনার পরে তার উপর সকলের নজর পড়ল, সে একটা হুজার ব্যাটেলিয়নের সেনাপতির পদ পেল, আর সাহসী অফিসারের প্রয়োজন হলেই তাকে মনোনীত করা হতে লাগল।
.
অধ্যায়-১৬
কাউন্টেস এখনো সম্পূর্ণ সেরে ওঠেনি, এখনো বেশ দুর্বল, তবু নাতাশার অসুখের সংবাদ পেয়ে পেতয়া এবং বাকি লোকদের সঙ্গে নিয়ে কাউন্টেস মস্কোতে চলে এল, ফলে গোটা পরিবার মারিয়া দিমিত্রিয়েভনার বাড়ি ছেড়ে দিয়ে নিজেদের বাড়িতে উঠে গেল এবং শহরেই সংসার পেতে বসল।
নাতাশার অসুখটা এতই গুরুতর হয়েছিল যে তার আচরণ, বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে দেওয়া প্রভৃতি অসুস্থতার কারণগুলি চাপা পড়ে গিয়েছে, আর নাতাশা ও তার বাবা-মার পক্ষে সেটা ভালোই হয়েছে। সে তখন এতই অসুস্থ যে এ ব্যাপারে তার দোষ কতটা সে বিচার করাটাই তখন অসম্ভব হয়ে পড়ল। সে কিছু খেতে পারে না, ঘুমতে পারে না, ক্রমেই শুকিয়ে যাচ্ছে, কাশছে, আর ডাক্তারের ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছে খুবই বিপদের কথা। এ অবস্থায় তাকে সাহায্য করা ছাড়া আর কোনো কথা কারো মনেই এল না। ডাক্তাররা তাকে দেখতে আসে, কখনো একা, কখনো দল বেঁধে, ফরাসি, জার্মান ও লাতিন ভাষায় অনেক কথা বলে, একে অন্যকে দোষ দেয়, তারা যতরকম রোগের কথা জানে সেসবেরই ওষুধ বাতলে দেয়, কিন্তু এই সহজ কথাটা কখনো তাদের মনে আসে না যে নাতাশা যে রোগে কষ্ট পাচ্ছে তার খবর তারা জানে না, কারণ একজন সুস্থ মানুষ যে রোগে ভোগে তার খবর জানা যায় না, সে রোগ চিকিৎসাশাস্ত্রের অজানা, সে রোগ ফুসফুসের নয়, যকৃতের নয়, ত্বকের নয়, হৃৎপিণ্ডের নয়, স্নায়ুর নয়, চিকিৎসাশাস্ত্রে উল্লেখিত কোনো রোগই নয়, সে রোগ এইসব দেহযন্ত্রের বিকারের অসংখ্য সম্ভাবিত যোগ-বিয়োগের অন্যতম একটি ফলমাত্র। এই সরল কথাটা ডাক্তারদের মাথায় ঢোকে না, কারণ তাদের জীবনের কাজই হচ্ছে রোগ নিরাময় করা, সেজন্য তারা টাকা নেয়, আর সেই কাজেই তারা জীবনের শ্রেষ্ঠ বৎসরগুলি অতিবাহিত করেছে।….
ডাক্তার রোজ আসে, নাড়ি দেখে, জিভ দেখে, তার দুঃখ-জর্জর মুখ দেখেও তার সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশা করে। কিন্তু সে যখনই অন্য ঘরে চলে যায় এবং কাউন্টেস তাড়াতাড়ি তাকে অনুসরণ করে তখনই হঠাৎ তার মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়, চিন্তিতভাবে মাথা নেড়ে বলে, যদিও বিপদ আছে তবু সে আশা করছে যে এই শেষ ওষুধটাতে কাজ হবে, তবে অপেক্ষা তো করতেই হবে, রোগটা তো প্রধানত মানসিক, কিন্তু…আর কাউন্টেসও তার হাতে একটা স্বর্ণমুদ্রা গুঁজে দিয়ে অপেক্ষাকৃত শান্ত মনে রোগীর কাছে ফিরে যায়।
নাতাশার রোগের লক্ষণ হল-সে খায় কম, ঘুমোয় কম, কাশে, আর সবসময় মন মরা হয়ে থাকে। ডাক্তাররা বলল, চিকিৎসা চালিয়েই যেতে হবে, কাজেই তাকে শহরের দম-বন্ধ করা আবহাওয়ার মধ্যেই রেখে দেওয়া হল, ১৮১২-র গ্রীষ্মকালে রস্তভ-পরিবার গ্রামে ফিরে গেল না।
নাতাশাকে অনেক বড়ি খেতে হল, ছোট ঘোট বোতল ও বাক্স থেকে অনেক ফোঁটা, অনেক গুড়ো ব্যবহার করতে হল, মাদাম শশাস সেগুলো সংগ্রহ করে রাখল, আর যে পল্লী-জীবন নাতাশার এত প্রিয় তার থেকে তাকে বঞ্চিত করে রাখা হল। তবু যৌবনেরই জয় হল। দৈনন্দিন জীবনের প্রভাবে নাতাশার দুঃখ চাপা পড়তে লাগল, মনের উপর দুঃখের চাপ কমে গেল, ক্রমে সবকিছুই অতীতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল, নাতাশার শরীরও সারতে শুরু করল।
