.
অধ্যায়-১৫
খেলোয়াড়সুলভ চোখের দৌলতে আরো কয়েকজনের সঙ্গে রস্তভই প্রথম দেখতে পেল যে নীল পোশাক-পরা ফরাসি অশ্বারোহী সৈন্যরা আমাদের উহলানদের পিছু নিয়েছে। উহলানরা ক্রমেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ছে, আর ফরাসি অশ্বারোহীরা তাদের তাড়া করছে। পাহাড়ের পাদদেশে লোকগুলিকে কত ছোট ছোট দেখাচ্ছে, হাত তুলে বাতাসে তলোয়ার ঘুরিয়ে তারা পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করছে।
শিকারি যেভাবে শিকারকে দেখে রস্তভও সেইভাবে নিচের ঘটনাবলীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে, হুজাররা যদি এখন ঘুরে দাঁড়িয়ে ফরাসি অশ্বারোহীদের আঘাত করে তাহলে সে আঘাত তারা সইতে পারবে না, কিন্তু সে আঘাত এখনই, এই মুহূর্তে করতে হবে, অন্যথায় অনেক দেরি হয়ে যাবে। সে চারদিকে তাকাল। তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন ক্যাপ্টেনও সেই একইভাবে নিচের অশ্বারোহী বাহিনীর দিকে তাকিয়ে আছে।
রস্তভ বলল, আন্দ্রু সেবাস্তিয়ানিচ, আপনি তো বোঝেন, ওদের আমরা পিষে মারতে পারতাম… ।
ক্যাপ্টেন বলল, সে তো খুবই ভালো হত! আর সত্যি… ।
রস্তভ তার কথা শুনবার জন্য অপেক্ষা করল না, ঘোড়ার পিঠে চেপে তার স্কোয়াড্রনের সামনে ছুটে গেল, আর তার হুকুম ঘোষণা শেষ হবার আগেই গোটা স্কোয়াড্রন তারই মতো উদ্বুদ্ধ হয়ে তাকে অনুসরণ করল। কেন বা কেমন করে সে একাজ করছে তা রস্তভ নিজেও জানে না। শিকারের সময়ের মতোই কোনোকিছু না ভেবে, না বিচার করেই সে কাজটা করছে। সে দেখল, ফরাসি অশ্বারোহীরা অনেক কাছে এসে পড়েছে, তারা ছুটছে বিশৃঙ্খলভাবে, সে জানে, আক্রমণ করলে তারা তা সামলাতে পারবে না–সে আরো জানে, একটিমাত্র মুহূর্ত সময় তার হাতে আছে, আর সেটি হাতছাড়া হলে আর ফিরে আসবে না। চারদিকে শাঁ শাঁ করে গোলা গুলি ছুটছে, তার ঘোড়াটাও ছুটে যেতে উদগ্রীব হয়ে উঠেছে, সে আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। ঘোড়ার পিঠে হাতটা রাখল, মুখে হুকুম জারি করল, আর সঙ্গে সঙ্গে নিজের স্কোয়াড্রনের ঘোড়র পায়ের শব্দ শুনতে পেয়ে জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল পাহাড়ের নিচে ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনীকে লক্ষ্য করে। পাহাড়ের নিচে পৌঁছবার আগেই তাদের গতি ক্রমেই দ্রুততর হতে লাগল। ক্রমেই তারা উহলানদের ও তাদের পশ্চাদ্ধাবনকারী ফরাসিদের আরো কাছে পৌঁছে গেল। ফরাসিরা একেবারে হাতের কাছে এসে গেল। আমাদের হুজারদের দেখেই যে সকলের আগে ছিল সে ঘুরে দাঁড়াল, আর পিছনের বাকিরা থেমে গেল। যে মনোভাব নিয়ে সে একটা নেকড়ের পথ আটকে দিতে ঘোড়া চুটিয়ে দেয় ঠিক সেইভাবে রস্তভ দোনেৎ-এর রাশ আলগা করে দিয়ে বিশৃঙ্খল ফরাসিদের পথটা আটকে দিল। প্রায় সব ফরাসি অশ্বারোহীই ঘোড়ার মুখ ফিরিয়ে জোর কদমে চুটতে লাগল। জনৈক ধূসর ঘোড়ার সওয়ারকে বেছে নিয়ে রস্তভ তার দিকে ছুটে গেল। পথে একটা ঝোঁপ পড়ল, তার সাহসী ঘোড়াটা একলাফে সেটা পেরিয়ে গেল, পুনরায় নিজের ঘোড়র উপর ভালোভাবে বসেই সে বুঝতে পারল যে এই মুহূর্তেই সে তার আকাক্ষিত শত্ৰুটিকে ধরে ফেলতে পারবে। ফরাসিটির ইউনিফর্ম দেখেই বোঝা যায় সে একজন অফিসার, ঘোড়ার পিঠে উপুড় হয়ে বসে সে তলোয়ার দিয়ে সেটাকে খোঁচা মেরে আরো জোরে ছুটিয়ে নিচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে রভের ঘোড়া নিজের বুক দিয়ে ফরাসি অফিসারের ঘোড়ার পাছায় একটা ধাক্কা মেরে সেটাকে প্রায় উল্টে ফেলে দিল, আর ঠিক সেইমুহূর্তে কিছু না বুঝেই রস্তভ তার তলোয়ার তুলে ফরাসি অফিসারটিকে আঘাত করল।
কাজটা করার সঙ্গে সঙ্গেই রভের সব উদ্দীপনা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। অফিসারটি পড়ে গেল-তার আঘাতের ফলে যতটা নয়-কারণ আঘাতে হাতের কনুইয়ের উপরে খানিকটা কেটে গেছে মাত্র-যতটা তার ঘোড়ার ধাক্কায় ও ভয়ে। রস্তভ ঘোড়ার রাশ টেনে ধরল, তার চোখ দুটি তাকাল শত্রুর দিকে, যাকে পরাজিত করেছে তাকে একবার দেখতে। ফরাসি অফিসারটির একটা পা ঘোড়ার রেকাবে আটকে যাওয়ায় সে আর এক পায়ে মাটিতে লাফাচ্ছে। যেকোন মুহূর্তে তলোয়ারের আর একটা কোপ নেমে আসতে পারে এই ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে সে রশুভের দিকে তাকাল। বিবর্ণ কাদামাখা মুখখানি বড় সুন্দর, থুতনিতে একটা টোল, পড়েছে, চোখ দুটি হাল্কা নীল-এ মুখ যেন রণক্ষেত্রের কোনো শত্রুকে মানায় না, অত্যন্ত সাধারণ একখানি পারিবারিক মুখ। রস্তভ তাকে নিয়ে কি করবে স্থির করার আগেই অফিসারটি চিৎকার করে বলল, আমি আত্মসমর্পণ করছি! রেকাব থেকে পাটা ছাড়িয়ে নিতে অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না, ভয়ার্ত নীল চোখ দুটোকেও রশুভের মুখের উপর থেকে সরিয়ে নিল না। কয়েকজন হুজার ঘোড়া ছুটিয়ে এসে তার পাটা ছাড়িয়ে দিল, তাকে ঘোড়ার পিঠে চাপতে সাহায্য করল। চারদিকেই হুজাররা ফরাসিদের নিয়ে ব্যস্ত, একজন আহত হয়েছে, মুখ বেয়ে রক্ত ঝরছে, তবু ঘোড়াটা ছাড়ছে না, আর একজনকে পিছমোড়া করে বেঁধে একজন হুজারের পিছনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর একজনকেও ঘোড়ায় তুলে দেওয়া হচ্ছে। সম্মুখে ফরাসি পদাতিক সৈন্যরা পালাতে পালাতেও যুদ্ধ করে যাচ্ছে। হুজাররা বন্দীদের নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। বাকিদের নিয়ে রস্তভ ঘোড়া ছুটিয়ে দিল, একটা অপ্রীতিকর অনুভূতির কাঁটা বুকের মধ্যে যেন অনবরত ফুটছে। অফিসারটিকে আঘাত করা এবং বন্দী করার পর থেকেই এতটা অস্পষ্ট বিচলিত ভাব তাকে পেয়ে বসেছে, অথচ তার কোনো কারণ সে বুঝতে পারছে না।
