বস্তভ পিছন ফিরে ইলিনকে বলল, সত্যি, মেয়েটি বড় ভালো।
ষোল বছরে ছেলের পক্ষে যতটা সম্ভব গম্ভীর গলায় ইলিন বলল, মনোরমা নারী।
আধ ঘণ্টা পরে গোটা স্কোয়াড্রন রাস্তায় সার দিয়ে দাঁড়াল। ঘোড়ায় চড়ার নির্দেশ শোনা যেতেই সকলে ক্রুশ চিহ্ন এঁকে ঘোড়ায় চাপল। সকলের সামনে ঘোড়ায় চেপে রস্তভ হুকুম দিল আগে বাঢ়! সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রের ঝনঝন ও মৃদু গুঞ্জন এবং কাদার মধ্যে ঘোড়র ক্ষুরের ছপছপ শব্দ তুলে হুজাররা চারজন করে সারি বেঁধে চওড়া রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। দুই পাশে বাৰ্চগাছের সারি। সামনে চলেছে পদাতিক বাহিনী ও কামানের গাড়ি।
ছেঁড়া-ছেঁড়া নীল-লাল মেঘের দল পুবের আকাশকে রাঙিয়ে দিয়ে বাতাসের আগে ভেসে চলেছে। ক্রমেই বেশি করে আলো ফুটছে। গ্রাম্য পথের দুধারে রাতের বৃষ্টিতে ভেজা কোঁকড়া ঘাসগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বৃষ্টিতে বাচগাছের ডালগুলি নুয়ে পড়েছে, বাতাসের দোলা লেগে জলের ফোঁটাগুলি ঝরে পড়ছে। সৈন্যদের মুখগুলি ক্রমেই স্পষ্টতর হচ্ছে। ইলিনকে পিছনে নিয়ে রস্তভ এগিয়ে চলেছে বার্চ-বীথির মাঝখান দিয়ে। সে ভাবছে ঘোড়াটার কথা, সকাল বেলাটার কথা, ডাক্তারের স্ত্রীর কথা, কিন্তু আসন্ন বিপদের কথা একবারও ভাবছে না।
আগে যুদ্ধে যাবার সময় রস্তভের ভয় করত, কিন্তু এখন তার মনে এতটুকু ভয় হয় না। গোলাগুলির সম্মুখীন হতে অভ্যস্ত হয়েছে বলে যে সে নির্ভয় হয়েছে তা নয়, তার নির্ভয় হবার কারণ বিপদে পড়ে নিজের চিন্তাকে কেমন করে সংযত রাখতে হয় সেটা সে শিখে ফেলেছে। ইলিনের চোখে-মুখে উত্তেজনা ফুটে উঠেছে, গভীর উত্তেজনায় সে অনবরত কথা বলছে, তার দিকে তাকিয়ে রস্তভের করুণা হল।
একখণ্ড পরিষ্কার আকাশে মেঘের আড়াল থেকে সূর্য দেখা দিতেই বাতাস পড়ে গেল, যেন ঝড়ের পরে গ্রীষ্মের সকাল বেলাকার সৌন্দর্যটাকে মাটি করবার সাহস তার হয় নি, বৃষ্টির ফোঁটাগুলি সোজাসুজি মাটিতে পড়ছে, চারদিক নিস্তব্ধ। দিগন্তে গোটা সূর্যটা একবার দেখা দিয়েই একটা লম্বা, সরু মেঘের ফালির নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল। কয়েক মিনিট পরেই সেই মেঘের আঁচল ছিঁড়ে উজ্জ্বলতর দীপ্তিতে সূর্য আবার দেখা দিল। সবকিছুই উজ্জ্বল, জলমল করে উঠল। আর সেই আলোর সঙ্গে সঙ্গে, বুঝি বা তারই প্রত্যুত্তরে সামনে থেকে ভেসে এল বন্দুকের শব্দ।
বন্দুকের শব্দ কতটা দূর থেকে এসেছে সেটা ভাববার এবং স্থির করবার আগেই কাউন্ট অস্তারমান-তলস্তয়ের অ্যাডজুটান্ট ঘোড়া ছুটিয়ে বিতেবস্ক থেকে এসে হুকুম জানিয়ে দিল, তাদের জোরকদমে এগিয়ে যেতে হবে।
অগ্রবর্তী পদাতিক বাহিনী ও কামানোর গাড়িতে দ্রুতগতিতে পার হয়ে স্কোয়াড্রনটি একটা পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে জনশূন্য পরিত্যক্ত গ্রাম পার হয়ে আবার চড়াই ভেঙে উঠতে লাগল। ঘোড়র গায়ে মুখে ফেনা জমে গেল, মানুষগুলোর মুখ লাল হয়ে উঠল।
থাম! পোশাক ঠিক করে নাও! সামনে শোনা গেল রেজিমেন্ট-কমান্ডারের হুকুম। বদিক ধরে এগিয়ে যাও। হাঁটো, আগে বাঢ়!
হুজাররা আমাদের উহলানদের পাশে থেমে গেল। ডানদিকে ঘন-সন্নিবেশে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের পদাতিক বাহিনী : তারা সংরক্ষিত সেনাদল। পাহাড়ের আরো উপরে প্রায় দিগন্তরেখায় প্রাতঃসূর্যের তির্যক কিরণে ঝলসিত আমাদের কামানগুলো চোখে পড়ছে। সম্মুকে একটা খোলা প্রান্তরের ওপারে শত্রু-সেনা ও তাদের কামানও দেখা যাচ্ছে। আমাদের অগ্রবর্তী সৈন্যরা যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে, প্রান্তরে অবস্থিত শত্রুদের সঙ্গে নিয়ে তাদের গুলিবিনিময় চলছে।
দীর্ঘদিন অনভ্যস্ত এই শব্দ শুনে খুশির গান শোনার মতো রস্তভের মনটা চনমন করে উঠল। ট্রাপ-টা-টা টাপ! গুলি-গোলা ছুটছে কখনো একযোগে, কখনো অতি দ্রুত একটার পর একটা। আবার সব চুপচাপ। আবার সেই শব্দ, কেউ যেন বিস্ফোরকের উপর পা ফেলে ফেলে সেগুলো ফাটিয়ে দিচ্ছে।
প্রায় এক ঘণ্টা হুজাররা এক জায়গায়ই রইল। কামানের অবিশ্রান্ত গোলাবর্ষণ চলল। কাউন্ট অস্তারমান দলবল নিয়ে উপরে উঠে গেল, সেখানে থেমে রেজিমেন্ট-কমান্ডারকে কি যেন বলল, তারপর পাহাড় বেয়ে কামানে কাছে চলে গেল।
অস্তারমান চলে যাবার পরেই উহলানদের লক্ষ্য করে হুকুম ঘোষিত হল : সার বেঁধে দাঁড়াও! কামান দাগতে প্রস্তুত হও!
সামনের পদাতিক বাহিনী অশ্বারোহীদের পথ করে দেবার জন্য দুইদিকে সরে গেল। উহলানদের যাত্রা শুরু হল, তাদের উদ্যত বর্শা ঝিকমিকিয়ে উঠল, ঘোড়া ছুটিয়ে তারা নিচের বাঁ দিকে ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেল।
উহলানরা পাহাড় বেয়ে নেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে হুজারদের উপর হুকুম হল, পাহাড়ের উপরে উঠে কামানশ্রেণীকে সুরক্ষিত রাখ। তারা যার যার জায়গায় দাঁড়াতেই সম্মুখ থেকে শাশা করে ছুটে এল বুলেট, সেগুলো মাটিতে পড়ল, কিন্তু কিছুই করতে পারল না।
অনেকদিন পরে এইসব শব্দ শুনে রশুভের মন নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। একটা ভালো জায়গা নিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে সে সামনে প্রসারিত যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকাল, সমস্ত অন্তর দিয়ে উহলানদের গতিবিধি দেখতে লাগল। তারা সবগে ফরাসি অশ্বারোহীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, চারদিকে ধোঁয়ায় ঢেকে গেল, পাঁচ মিনিট পরে উহলানরা ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরতে লাগল, যে স্থানটা তারা দখল করেছে সেদিকে নয়, আরো কিছুটা বাঁদিকে, আর বাদামি রঙের ঘোড়র উপর কমলা রঙের উহলানদের মধ্যে এবং তাদের পিছনে একটা বড় দলে ধূসর ঘোড়ার উপর নীল পোশাকের ফরাসি অশ্বারোহীদের দেখা গেল।
