খুশির হাসি হেসে মারি হেন্দ্রিখভনা বলল, ওকে একা থাকতে দাও। সারারাত ঘুম হয় নি, তাই এখন অঘোর ঘুমচ্ছে।
জনৈক অফিসার জবাব দিল, আরে না না, মারি হেন্দ্ৰিখভনা, ডাক্তারের দেখাশোনা তো করতেই হবে। যেদিন আমার পা বা হাত কেটে বাদ দিতে হবে সেদিন হয় তো তিনি একটু দয়াধর্ম করবেন।
গ্লাস আছে মাত্র তিনটে। জল এত ঘোলা যে চাটা কড়া হয়েছে কি পাতলা হয়েছে তা বোঝবার উপায় নেই। সামোভারেও জল ধরে মাত্র ছগ্লাস। প্রবীণতার বিচারে একের পর এক মারি হেন্দ্ৰিখভনার পরিষ্কার হাত থেকে গ্লাস নিয়ে পর পর চা খেতে তাদের যেন খুশির সীমা নেই। সেই সন্ধ্যায় প্রতিটি অফিসারেরই মনে হল সে বুঝি জার্মান মহিলাটির প্রেমে পড়েছে। যে কজন অফিসার বেড়ার ওধারে তাস খেলছিল এবার তারাও এখানে এসে মারি হেন্দ্ৰিখভনার তোয়াজ করতে শুরু করল। এতগুলি বিনীত ও দ্র যুবকের দ্বারা পরিবৃত হয়ে তার চোখ-মুখ খুশিতে ঝলমল করতে লাগল, যতবার তার স্বামী ঘুমের মধ্যে নড়ে উঠছে ততবারই সে ভয় পাচ্ছে, পাছে তার ঘুম ভেঙে যায়।
চিনি পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলেও চামচ মাত্র একটা, আর চিনিটা গলতেও অনেক সময় লাগছে, তাই সকলে স্থির করল, মারি হেন্দ্রিখভনাই পর পর সকলের চিনিটা নেড়ে দেবে। রস্তভ তার গ্লাসটা নিয়ে তাতে খানিকটা রাম ঢেলে মহিলাটিকে নেড়ে দিতে বলল।
কিন্তু আপনি চিনি ছাড়াই খান? মহিলাটি হাসতে হাসতে বলল, যেন সে নিজে যা বলছে এবং অন্য সকলে যা বলছে সবই মজার কথা, সবই দ্ব্যর্থবোধক।
আমি তো চিনি চাই না, শুধু চাই আপনার ছোট্ট হাতখানি দিয়ে আমার চাটা নেড়ে দিন।
মারি হেন্দ্রিখভনা রাজি হয়ে চামচটা খুঁজতে লাগল ও এই ফাঁকে আর একজন সেটা নিয়ে নিয়েছে।
রস্তভ বলে উঠল, আপনার আঙুলটা ব্যবহার করুন মারি হেন্দ্রিখভনা, সেটা আরো ভালো হবে।
খুশিতে লাল হয়ে সে জবাব দিল, বড় বেশি গরম যে!
একবালতি জলে কয়েক ফোঁটা রাম ঢেলে সেটাকে মারি হেন্দ্রিখভনার দিকে এগিয়ে দিয়ে ইলিন বলল, এটাই আমার পেয়ালা, আপনার আঙুলটা এতে ডুবিয়ে দিন, আমি সবটাই খেয়ে নেব।
সামোভার খালি করে রস্তভ এক প্যাক তাস এনে মারি হেন্দ্ৰিখভনাকে নিয়ে রাজা-রাজা খেলার প্রস্তাব করল। তার প্রস্তাব মতোই আরো স্থির হল, যে রাজা হবে সেই মারি হেন্দ্রিখভনার হাতে একটা চুমো খাবার অধিকার লাভ করবে, আর যে বোকা হবে, ডাক্তার ঘুম থেকে উঠলে তার জন্য সামোভারটা গরম করার ভার তাকেই নিতে হবে।
কিন্তু ধর, মারি হেন্দ্রিখভনাই যদি রাজা হন? ইলিন বলল।
এমনিতেই তো তিনি রানী, তার কথাই আইন!
খেলা সবে শুরু হয়েছে এমন সময় ডাক্তারের এলোমেলো মাথাটা মারি হেন্দ্রিখভনার পিছন থেকে উঁকি দিল। কিছুক্ষণ আগেই তার ঘুম ভেঙেছে, এদের কথাবার্তা সে শুনেছে, কিন্তু তার মধ্যে মজাদার কিছু সে খুঁজে পায়নি। তার মুখটা বিষণ্ণ ও বিমর্ষ। অফিসারদের সঙ্গে কোনো কথা না বলে তাদের পথটা ছেড়ে দিতে বলল। সে ঘর থেকে চলে যেতেই অফিসাররা সকলেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল, লজ্জায় লাল হতে মারি হেন্দ্রিখভনার চোখে জল এসে গেল, তাতে তাকে সকলের আরো ভালো লাগল। উঠোন থেকে ফিরে এসে ডাক্তার স্ত্রীকে বলল, বৃষ্টি থেমে গেছে, এখন তাদের ঢাকা-গাড়িতে গিয়েই ঘুমতে হবে, নইলে মালপত্র সব চুরি হয়ে যাবে।
রস্তভ বলল, আমি বরং একজন আর্দালি পাঠিয়ে দিচ্ছি ..দুইজন পাঠাচ্ছি! কি বলেন ডাক্তার!
আমি নিজেই পাহারা দেব, ইলিন বলল।
না হে ভদ্রমশায়রা, আপনারা তো ভালোভাবে ঘুমিয়েছেন, আমি দুইরাত ঘুমতে পারিনি, এই কথা বলে ডাক্তার বিমর্ষ মুখে স্ত্রীর পাশে বসে খেলা শেষ হবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
তাকে স্ত্রীর দিকে কুটি করতে দেখে অফিসাররা আরো মজা পেয়ে গেল। কেউ কেউ নানা অজুহাত দেখিয়ে হাসতে লাগল। ডাক্তার স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা-গাড়িতে চলে গেলে অফিসাররা ভিজে জোব্বায় গা ঢেকে সরাইখানাতেই শুয়ে পড়ল, কিন্তু অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউ ঘুমল না। কখনো ডাক্তারের অস্বস্তি ও তার স্ত্রীর খুশি-খুশি ভাব নিয়ে মন্তব্য-বিনিময় করল, আবার কখনো বা ফটকে ছুটে গিয়ে সেখানে ঢাকা-গাড়িতে কি হচ্ছে তার বিবরণ দিল। মাথাটা ঢেকে রস্তভ কয়েকবার ঘুমোতে চেষ্টা করল, কিন্তু কারো না কারো কথায় ঘুম ভেঙে যেতে সেও আলোচনায় যোগ দিল, আর অকারণ ফুর্তিতে ছোট শিশুর মতো হাসতে লাগল।
.
অধ্যায়-১৪
প্রায় তিনটে বাজে। এখনো কেউ ঘুমোয়নি। কোয়াটার-মাস্টার এসে হুকুম জানিয়ে গেল, স্কোয়াড্রনকে ছোট শহর অস্ত্রভনায় যেতে হবে।
হেসে হেসে কথা বলতে বলতেই অফিসাররা তৈরি হতে লাগল। সামোভারে আবার ঘোলা জল ফুটতে লাগল। রস্তভ চায়ের জন্য অপেক্ষা না করেই স্কোয়াড্রনে চলে গেল। দিনের আলো ফুটছে, বৃষ্টি থেমেছে, মেঘ কেটে যাচ্ছে। পোশাক তখনো ভিজে থাকায় স্যাঁৎসেঁতে, ঠাণ্ডা লাগছে। ভোরের আবছা আলোয় সরাইখানা থেকে যেতে যতে রস্তভ ও ইলিন ডাক্তারের গাড়ির বৃষ্টিভেজা চামড়ায় চকচকে ঢাকনাটার নিচ দিয়ে দেখতে পেল, ডাক্তারের পা দুটো এপ্রোনের নিচ দিয়ে বেরিয়ে আছে, আর তার মাঝখানে স্ত্রীর টুপিটা দেখা যাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে স্ত্রীর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে।
