প্রিন্সের মনের অবস্থা ভালো নয়; সে বলল, ঠিক উল্টো; আপনি যদি সে যুবকটির সঙ্গে থেকে আমাকে রেহাই দেন তাহলেই আমি খুশি হব।…সে এখানে এসেছে, কিন্তু কাউন্ট তাকে একটিবারও ডেকে পাঠান নি।
সে দুই কাঁধে ঝাঁকুনি দিল। একটি পরিচারক এসে বরিসকে নিয়ে সিঁড়ির এক ধাপ নেমে আর এক ধাপ উঠে পিয়েরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
*
অধ্যায়-১৬
পিয়ের শেষপর্যন্ত পিটার্সবুর্গে নিজের জন্য একটা জীবিকা বেছে নিতে পারে নি। হৈ-হট্টগোল করার অপরাধে তাকে সেখান থেকে মস্কোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাউন্ট রস্তভের বাড়িতে তার সম্পর্কে যে কথা বলা হয়েছে সেটা ঠিকই। একজন পুলিশকে ভালুকের সঙ্গে বাঁধার ব্যাপারে তারও হাত ছিল। কয়েকদিন হল সে মস্কোতে এসেছে এবং যথারীতি তার বাবার বাড়িতেই আছে। যদিও যে আশংকা করেছিল যে তার সেই পলায়নের কাহিনী ইতিমধ্যেই মস্কোতে জানাজানি হয়ে গেছে এবং তার বাবার বাড়ির যে মহিলারা কোনোদিনই তার প্রতি সদয় ছিল না তারা সে গল্প বলে কাউন্টকে তার প্রতি বিরূপ করেই রেখেছে, তবু এখানে পৌঁছে প্রথম দিনেই সে বাড়ির বাবার অংশে চলে গেল। প্রিন্সেসরা বসবার ঘরেই বেশির ভাগ সময় কাটায়। সেই ঘরে ঢুকে সে তাদের সঙ্গে দেখা করল। তাদের মধ্যে দুজন সেলাই নিয়ে বসেছিল, আর তৃতীয় জন গলা ছেড়ে বই পড়ছিল। যে পড়ছিল সেই সকলের বড়-তার সঙ্গেই আন্না মিখায়লভনার দেখা হয়েছিল। ছোট দুজন সেলাই করছিল : দুজনই গোলাপি, সুন্দরী; তাদের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য, একজনের ঠোঁটে একটা তিল থাকায় তাকে আরো সুন্দরী দেখায়। তারা পিয়েরের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সে একটি মরা মানুষ বা কুষ্ঠরোগী। বড় প্রিন্সেস পড়া থামিয়ে ভয়ার্ত চোখে নিঃশব্দে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল; মেজ প্রিন্সেসেরও সেই একই ভাব; কিন্তু ঠোঁটে তিলওয়ালা ছোটটির মেজাজ খুব হাসিখুশি; এই মজার দৃশ্য দেখে হেসে ফেলেই হাসিটা লুকোবার জন্য সে ফ্রেমের উপরে ঝুঁকে বসল। হাসি চাপতে না পেরে যেন একটা প্যাটার্ন তুলবার চেষ্টা করছে এমনিভাবে সেলাইতে নজর দিল।
কেমন আছ বোন? পিয়ের বলল। আমাকে চিনতে পারছ না?
খুব ভালো করেই চিনতে পারছি।
একটু বিব্রত বোধ করলেও না দমে গিয়ে পিয়ের জিজ্ঞাসা করল, কাউন্ট কেমন আছেন? তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারি কি?
একটু বিব্রত বোধ করলেও না দমে গিয়ে পিয়ের জিজ্ঞাসা করল, কাউন্ট কেমন আছেন? তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারি কি?
দেহে ও মনে কাউন্ট খুবই কষ্ট পাচ্ছেন, আর তার মানসিক কষ্টবৃদ্ধিতে তুমি তো সাধ্যমতোই চেষ্টা করেছ।
কাউন্টের সঙ্গে দেখা করতে পারি কি? পিয়ের আবার জিজ্ঞাসা করল।
হুম… তাকে যদি মেরে ফেলতে চাও, একেবারেই মেরে ফেলতে চাও তো দেখা করতে পার… ওলগা, যা তো, দেখে আয় জেটার গোমাংস-চা তৈরি হয়েছে কি না-সময় তো প্রায় হয়ে গেছে। কথাগুলি বলে বড় বোন পিয়েরকে বোঝাতে চাইল যে তারা খুব ব্যস্ত; তারা ব্যস্ত পিয়েরের বারাকে আরাম দিতে, আর পিয়ের ব্যস্ত তাকে শুধু কষ্ট দিতে।
ওলগা চলে গেল। পিয়ের বোনদের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল; তারপর মাথা নুইয়ে বলল, আমি তাহলে আমার ঘরে যাচ্ছি। কখন তার সঙ্গে দেখা করতে পারব আমাকে জানিও।
সে ঘর থেকে চলে গেল, তিলসুন্দরী বোনের খিলখিল হাসি তাকে পিছন থেকে তাড়া করল।
পরদিন প্রিন্স ভাসিলি এসে কাউন্টের বাড়িতেই উঠল। পিয়েরকে ডেকে বলল : দেখ, পিটার্সবুর্গে যেভাবে চলাফেরা করেছ এখানেও যদি তাই কর, তো তোমার কপালে দুঃখ আছে, শুধু এইটুকুই তোমাকে বলতে চাই। কাউন্ট খুব, খুব অসুস্থ, তুমি তার সঙ্গে মোটেই দেখা করবে না।
তারপর থেকে পিয়েরকে কেউ বিরক্ত করে নি; সারাক্ষণ সে উপরের ঘরেই কাটায়। বরিস যখন পিয়েছের ঘরের দরজায় পৌঁছল সে তখন ঘরময় পায়চারি করছে; মাঝে মাঝে এক কোণে থেমে দেয়ালের দিকে এমন অঙ্গভঙ্গি করছে যেন কোনো অদৃশ্য শক্রর বুকে একখানা তলোয়ার ঢুকিয়ে দিচ্ছে, চশমার উপর দিয়ে তাকাচ্ছে হিংস্রভাবে, তারপর আবার পায়চারি করছে, বিড়বিড় করে কথা বলছে, ঘাড় ঝাঁকুনি দিচ্ছে, আর অঙ্গভঙ্গি করছে।
অদৃশ্য কারো দিকে আঙুল বাড়িয়ে হাঁক দিল, ইংল্যান্ড শেষ হয়ে গেল। মি. পিট জাতির প্রতি, মানুষের অধিকারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তার শাস্তি… কিন্তু পিটের শাস্তির কথা উল্লেখ করবার আগেই–সেই মুহূর্তে পিয়ের কল্পনা করছিল যে সে নিজেই স্বয়ং নেপোলিয়ন, এইমাত্র বিপজ্জনক ডোভার প্রণালী পার হয়ে লন্ডন দখল করে নিয়েছে–পিয়ের দেখল একটি সুগঠিত-দেহ সুদর্শন তরুণ অফিসার তার ঘরে ঢুকল। পিয়ের থামল। সে যখন মস্কো ছেড়ে এসেছে বরিস তখন চোদ্দ বছরের ছেলে; তার কথা পিয়ের সম্পূর্ণ ভুলে গেছে; কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ আবেগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে সে বরিসের হাতটা ধরে বন্ধুত্বপূর্ণ হাসি হেসে উঠল।
স্মিত হলে বরিস শান্তভাবে বলল, আমাকে আপনার মনে আছে? আমি মার সঙ্গে এসেছি কাউন্টকে দেখতে, কিন্তু মনে হয় তিনি সুস্থ নন।
হ্যাঁ, মনে হয় তিনি অসুস্থ। সর্বদাই লোজন তাঁকে বিরক্ত করছে, যুবকটিকে স্মরণ করবার চেষ্টা করতে করতে পিয়ের বলল।
বরিস বুঝতে পারল, পিয়ের তাকে চিনতে পারে নি, কিন্তু নিজের পরিচয় দেবার দরকারও বোধ করল না। এতটুকু বিব্রত বোধ না করে সে সোজা পিয়েরের মুখের দিকে তাকাল।
