অভিযান শুরু হল। দ্বিগুণ বেতন নিয়ে রেজিমেন্ট পোল্যান্ডে ঢুকল, নতুন অফিসাররা এল, এল নতুন সৈন্য ও ঘোড়া, আর সকলেই যুদ্ধ শুরু হবার সময়কার আনন্দ ও উত্তেজনার ভিতর দিয়ে দিন কাটাতে লাগল।
রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও সমর কৌশলগত নানাবিধ কারণে ভিলনা থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়া হল। পশ্চাদপসরণের প্রতিটি পদক্ষেপে প্রধান ঘাঁটিতে নানা জটিলতা ও বিতর্ক দেখা দিল, কিন্তু পাভলোগ্রাদ হুজারদের দলে সবকিছুই শান্তিতে ও নির্বিঘ্নে চলতে লাগল।
১৩ই জুলাই তারিখে পাভলোগ্রাদরা প্রথম একটা বড়রকমের যুদ্ধে অংশ নিল।
যুদ্ধের আগের দিন ১২ই জুলাই বজ্রবিদ্যুৎসহ প্রচণ্ড শিলাবৃষ্টি হল। ১৮১২ সালের গ্রীষ্মকালটায় সাধারণভাবেই খুব ঝড়বৃষ্টি হয়েছিল।
দুটো পাভলোগ্রাদ স্কোয়াড্রন একটা যইয়ের খেতে সাময়িক আস্তানা পাতল। সবে তখন ফসল পাকতে শুরু করেছে, কিন্তু গবাদি পশু ও ঘোড়র পায়ের চাপে সব একেবারে ছত্রখান হয়ে গেল। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। রস্তভ ও তার অধীনস্থ ইলিন নামক একটি তরুণ শিক্ষানবীশ অফিসার তাড়াহুড়া করে বানানো একটা চালাঘরে বসে আছে। তাদের রেজিমেন্টের একজন লম্বা গোঁফওয়ালা অফিসার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ঘোড়া নিয়ে তাদের আশ্রয়ে এসে উঠল।
আমি সদর থেকে আসছি কাউন্ট। রায়েভস্কির যুদ্ধজয়ের কথা শুনেছেন কি?
অফিসারটি সালতানভ যুদ্ধের বর্ণনা দিতে লাগল।
রস্তভ পাইপ টানতে টানতে ছাদ থেকে গড়ানো বৃষ্টির জল এড়াবার জন্য মাথাটা সরিয়ে অন্যমনস্কভাবে তার কথা শুনতে লাগল। ইলিন তার আরো কাছে ঘেঁষে বসল। অফিসারটির বয়স ষোল, সবে রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছে, সাত বছর আগে দেনিসভের সঙ্গে নিকলাসের যে সম্পর্ক ছিল, এখন তারও নিকলাসের সঙ্গে ঠিক সেই সম্পর্ক। সে সব ব্যাপারে রস্তভকে নকল করে, একটি মেয়ের মতো তাকে মনে মনে পূজা করে।
লম্বা গোঁফওয়ালা অফিসারটি সালতানভ বাঁধের যুদ্ধকে রাশিয়ার থার্মোপিলি বলে বর্ণনা করে অনেক বড় বড় কথা বানিয়ে বলতে লাগল। রস্তভ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানে যে এর অনেক কথাই মিথ্যা। তাই এসব শুনতে তার মোটেই ভালো লাগছে না।
সেটা লক্ষ্য করে ইলিন বলে উঠল, না, আর টেকা যাচ্ছে না। আমার মোজা আর শার্ট…আর সমানে বৃষ্টি পড়ে সব ভিজিয়ে দিচ্ছে। বাইরে বেরিয়ে দেখি কোথাও একটু আশ্রয় পাওয়া যায় কি না। বৃষ্টিটা একটু কমেছে বলে মনে হচ্ছে।
ইলিন বেরিয়ে গেল। গোঁফওয়ালা অফিসারটিও ঘোড়া ছুটিয়ে দিল।
পাঁচ মিনিট পরে কাদার ভিতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে ইলিন ফিরে এল।
হুররা! রস্তভ, তাড়াতাড়ি এস! পেয়ে গেছি! প্রায় দুশ গজ দূরে একটা সরাইখানা আছে, আমাদের লোজন সব সেখানে জমে গেছে। সেখানে গেলে অন্ততপক্ষে একটু গরম তো হতে পারব। তাছাড়া মারি হেন্দ্রিখভনা সেখানে আছে।
মারি হেন্দ্রিখভনা রেজিমেন্টের ডাক্তারের স্ত্রী, সুন্দরী জার্মান তরুণী, পোল্যান্ডে তাদের বিয়ে হয়েছে। কোনো ব্যবস্থা করতে না পারার জন্যই হোক, আর তরুণী বধূকে ছেড়ে থাকতে পারে নি বলেই হোক, ডাক্তারটি স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়েই হুজার রেজিমেন্টের সঙ্গে আগাগোড়া চলাফেরা করছে, আর তার সন্দেহ ও ঈর্ষা নিয়ে তামাশা করাটা হুজার অফিসারদের মধ্যে প্রায় দৈনন্দিন ঘটনায় দাঁড়িয়ে গেছে।
জোব্বাটা কাঁধের উপর ফেলে এবং লাভ্রুশকাকে জিনিসপত্র নিয়ে তাদের সঙ্গে আসতে বলে রস্তভ সেই পিচ্ছিল কর্দমাক্ত পথে ইলিনকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। অন্ধকারে দূরে মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
রস্তভ, তুমি কোথায়?
এখানে! কী বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তারা পরস্পরকে হাঁক দিয়ে কথা বলতে লাগল।
.
অধ্যায়-১৩
সরাইয়ের সামনে ডাক্তারের ঢাকা-গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে আছে পাঁচজন অফিসার।
সামনের কোণে বসে আছে সুন্দরী জার্মান তরুণী মারি হেন্দ্রিখভনা। পরনে ড্রেসিং-জ্যাকেট, মাথায় নৈশ টুপি। তার স্বামী ডাক্তারটি তার পিছনে ঘুমিয়ে আছে। রস্তভ ও ইলিন ঘরে ঢুকতেই সকলে হৈ-হৈ করে পদের অভ্যর্থনা জানাল।
রস্তভ হেসে বলল, আরে, বেশ মজায়ই আছে দেখছি!
তুমিই বা ওখানে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছ কেন?
কী রকম মুটিয়েছে দেখ! আরে, ওদের গায়ে যে স্রোত বইছে! আমাদের বসার ঘরটাকে ভিজিয়ে দিও না।
অন্যরা চেঁচিয়ে বলল, মারি হেন্দ্রিখভনার পোশাকটা মাটি করে দিও না।
রস্তভ ও ইলিন একটা কোণ বেছে নিল, যাতে মারি হেখিভনার শালীনতায় আঘাত না দিয়েও তারা শুকনো পোশাক পরে নিতে পারে। মারি হেন্দ্রিখভনা নিজের পেটিকোটটা তাদের ধার দিল, সেটাকেই পর্দা হিসেবে ব্যবহার করে রস্তভ ও ইলিন লাভ্রুশকার সাহায্যে ভেজা পোশাক বদলে শুকনো পোশাক পরে নিল।
ইটের ভাঙা স্টোভটায় আগুন জ্বালানো হল। একখানা কাঠ পেতে তার উপর সামোভার ও আধ বোতল রাম রাখা হল। মারি হেন্দ্রিখভনাকে সভানেত্রীর আসনে বসিয়ে সকলে তার চারদিকে গোল হয়ে বসল। সুন্দর হাত দুখানি মুছবার জন্য একজন এগিয়ে দিল একটা রুমাল, যাতে তার পায়ে ঠাণ্ডা না লাগে সেজন্য একজন পায়ের নিচে একটা কুর্তা পেতে দিল, বৃষ্টির ছাঁট আটকাবার জন্য আর একজন তার কোটটা জানালায় ঝুলিয়ে দিল, পাছে তার স্বামীর ঘুম ভেঙে যায় সেজন্য অপর একজন তার মুখের উপর থেকে মাছি তাড়াতে লাগল।
