পলুচি জার্মান জানে না, সে প্রশ্ন করতে লাগল ফরাসিতে। ওলযোগেন তার প্রধানকে সাহায্য করতে এগিয়ে এল, সে অত্যন্ত খারাপ ফরাসি বলে। মাঝে মাঝেই পফুয়েলের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তাই নয় কি ইয়োর এক্সেলেন্সি? তা শুনে পফুয়েল চটে উঠে বলে, তা তো বটেই, একথা এত বেশি করে বুঝিয়ে বলার কি আছে?
পলুচি ও মিচদ দুজনই একযোগে ওলযোগেনকে ফরাসিতে আক্রমণ করতে লাগল। আর্মফেল্ট পফুয়েলের সঙ্গে কথা বলতে লাগল জার্মান ভাষায়, আর তল বলকনফিকে বোঝাতে লাগল রুশ ভাষায়। প্রিন্স আন্দ্রু চুপচাপ শুনতে লাগল।
আলোচনা চলল অনেকক্ষণ ধরে, যত সময় যেতে লাগল বিতর্ক ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠল, শেষপর্যন্ত হৈ হট্টগোল ও গালাগালিতে গিয়ে দাঁড়াল, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হবার সম্ভাবনা ক্রমেই কমতে লাগল। সব কিছু শুনতে শুনতে একটা পুরনো চিন্তাই নতুন করে প্রিন্স আন্দ্রুর মাথায় এল, সামরিক বিভাগে কাজ করতে করতে প্রায়ই তার মনে হয় যে সমরবিজ্ঞান বলে কিছু নেই, থাকতে পারে না, আর তাই সামরিক প্রতিভা বলেও কিছু নেই, এ চিন্তাটা এখন স্পষ্ট সত্য হয়ে তার কাছে ধরা পড়ল। যে বিষয়ের পরিবেশ ও অবস্থান সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ও সংজ্ঞাতীত, এবং বিরোধী শক্তিগুলির কর্মক্ষমতা যখন আগে থেকে নিরূপণ করা যায় না, তখন সে বিষয়ে কোনো মতবাদ এবং বিজ্ঞান কেমন করে গড়ে উঠবে? একটা দিনের মধ্যে আমাদের অথবা শত্রুপক্ষের সেনাদলের অবস্থা কি দাঁড়াবে তাই তো কেউ আগে থেকে বুঝতে পারে না, যেকোন একটি সেনাদলের সত্যিকারের শক্তি নির্ণয়ই তো কেউ করতে পারে না। আর লোকে সামরিক প্রতিভার কথাই বা বলে কেন? যে লোক ঠিকসময়ে রুটি পরিবেশনের হুকুম দিতে পারে, এবং কে ডাইনে যাবে আর কে বায়ে যাবে সেকথা বলে দিতে পারে সেই কি প্রতিভা? বরং আমি যেসব সেরা সেনাপতিদের জানি তারা হয় নির্বোধ, না হয় তো মনভোলা। এদিক থেকে ব্যাগ্রেশন তো সেরা, আর নেপোলিয়ন নিজেই একথা স্বীকার করেছে। আসলে সামরিক ক্রিয়াকলাপের সাফল্য তাদের উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে তাদের উপর যারা সেনাদলের ভিতর থেকে চেঁচিয়ে বলে আমরা হেরে গেলাম অথবা হুররা! যুদ্ধক্ষেত্রে একমাত্র সেখানে থেকেই কাজের কাজ করা যায়।
সকলের কথাবার্তা শুনতে শুনতে প্রিন্স আন্দ্রু এই কথাই ভাবছিল। সকলে চলে যেতে শুরু করলে পলুচি যখন তাকে ডাকল তখনই তার সম্বিত ফিরে এল।
পরদিন সেনা-পরিদর্শনের সময় সম্রাট জানতে চাইল সে কোথায় কাজ করতে চায়, আর ম্রাটের কাছাকাছি থাকবার প্রার্থনা না জানিয়ে সেনাদলে কাজ করার অনুমতি ভিক্ষা করে প্রিন্স আন্দ্রু রাজদরবারে আসন লাভের সুযোগটা চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলল।
.
অধ্যায়-১২
অভিযান শুরু হবার আগে রস্তভ বাবা-মার কাছ থেকে একটা চিঠি পেল, তাতে সংক্ষেপে নাতাশার অসুখ এবং প্রিন্স আন্দ্রুর সঙ্গে তার বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যাবার কথা জানিয়ে (তারা জানিয়েছে যে নাতাশাই বিয়েটা বাতিল করে দিয়েছে) তাকে সেনাদল থেকে অবসর নিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলা হয়েছে। চিঠি পেয়ে নিকলাস ছুটি নেবার অথবা অবসর নেবার কোনো চেষ্টাই করল না, বাবা-মাকে লিখল, নাতাশার অসুখ ও বিয়েটা ভেঙে যাবার সংবাদে সে খুব দুঃখিত হয়েছে, এবং তাদের ইচ্ছামতো কাজ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। সোনিয়াকে আলাদা চিঠি লিখল।
লিখল : আত্মার আত্মীয় বন্ধু আমার! সম্মানের প্রশ্ন না থাকলে আমার বাড়ি ফিরে যাওয়া কেউ রুখতে পারত না। কিন্তু এখন অভিযান শুরুর মুখে আমি যদি পিতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা ও কর্তব্যের চাইতে নিজের সুখটাকেই বড় করে দেখি তাহলে শুধু যে সহকর্মীদের চোখেই আমার সম্মানহানি ঘটবে তাই নয়, আমার নিজের কাছেও আমি ছোট হয়ে যাব। কিন্তু এটাই আমাদের শেষ বিরহ। বিশ্বাস কর, যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্রই, আমি যদি তখন বেঁচে থাকি এবং তোমার ভালোবাসা অক্ষুণ্ণ থাকে, আমি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে তোমার কাছেই উড়ে যাব, চিরদিনের মতো তোমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখব।
বস্তুত, অভিযান শুরু হওয়াতেই রস্তভ কথামতো বাড়ি ফিরতে এবং সোনিয়াকে বিয়ে করতে পারল না। হেমন্তকালে অত্রাদণুতে শিকার, শীতকালে বড়দিনের উৎসব ও সোনিয়ার ভালোবাসা-এই দুইয়ে মিলে পল্লীজীবনের সুখ-শান্তির যে উদার অবকাশ তার সামনে মেলে ধরেছিল তেমনটি সে আগে কখনো দেখেনি, আর তাই সে সুখ-শান্তির স্বপ্ন এখনো তার মনকে টানছে। চমৎকার একটি স্ত্রী, সন্তান, একদল শিকারি কুকুর, কৃষিকাজ, প্রতিবেশী, নির্বাচনে জয়লাভ… এইসব চিন্তাই তার থাকতে হবে। আর থাকতে যখন হবেই তখন নিজের স্বভাবমতোই নিকলাস রস্তভ এই রেজিমেন্ট-জীবনকেই মেনে নিল, এবং সেই জীবনের মধ্যেই সুখের সন্ধান করতে লাগল।
ছুটি থেকে ফিরে এলে সহকর্মীরা তাকে সানন্দে অভ্যর্থনা জানাল, তাকে ঘোড়া বেছে আনতে পাঠানো হল, আর সেও ইউক্রেন থেকে ভালো ঘোড়া এনে সকলকে তাক লাগিয়ে দিল। এদিকে তার অনুপস্থিতির সময়েই তাকে ক্যাপ্টেনের পদে উন্নীত করা হয়েছিল, এখন যুদ্ধকালীন ব্যবস্থায় রেজিমেন্টের সৈন্যসংখ্যা বাড়াবার ফলে তাকে তার পুরনো স্কোয়াড্রনেই যুক্ত করে দেওয়া হল।
