পফুয়েলের শরীরটা বেঁটে ও সরু হলেও তার হাড় মোটা, গড়ন বলিষ্ঠ, উরু চওড়া ও কাঁধ উঁচু। মুখের অনেকগুলো ভাঁজ, চোখ গর্তে বসা। মাথার চুল তাড়াতাড়ি বুরুশ করা, কপালের উপর পরিপাটি, কিন্তু পিছনে এলোমেলো। চঞ্চল ও ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে তাকাতে সে ঘরে ঢুকল, যেন সবকিছুতেই তার ভয়। অদ্ভুতভাবে তলোয়ারে হাত রেখে চের্নিশেভকে ডেকে জার্মান ভাষায় জানতে চাইল সম্রাট কোথায়। চের্নিশেভের জবাব শুনে ব্যঙ্গের হাসি হেসে অস্ফুটে কি যেন বলে উঠল। প্রিন্স আন্দ্রু তার পরিচয় দিয়ে বলল যে প্রিন্স আন্দ্রু তুরস্ক থেকে সবে ফিরেছে, আর সেখানকার যুদ্ধটাও বেশ ভালোভাবেই শেষ হয়েছে। কোনোরকমে একবার চোখ তুলে তাকিয়ে পুফয়েল হেসে বলল, সেটা অবশ্যই রণকৌশলঘটিত একটি চমৎকার যুদ্ধ, বলেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে সে বসার ঘরে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো খুঁতখুঁতে গম্ভীর গলা তার কানে এল।
.
অধ্যায়-১১
প্রিন্স আন্দ্রু পফুয়েলের দিকেই তাকিয়েছিল, এমন সময় দ্রুতপায়ে ঘরে ঢুকল কাউন্ট বেনিংসেন। বলকনস্কিকে দেখে মাথা নাড়ল, কিন্তু দাঁড়াল না, অ্যাডজুটান্টকে কিছু নির্দেশ দিয়ে পড়ার ঘরে ঢুকে গেল। সম্রাট আসছে, তাই বেনিংসেন তাড়াতাড়ি চলে এসেছে কিছু প্রস্তুতি নিয়ে সম্রাটকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য তৈরি হয়ে নিতে। চের্নিশেভ ও প্রিন্স আন্দ্রু ফটকের দিকে এগিয়ে গেল। সম্রাট তখন ঘোড়া থেকে নামছে। তাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। মার্কুইস পলুচি বিশেষ উৎসাহের সঙ্গে কি যেন বলছে, আর সম্রাট মাথাটা বদিকে কাৎ করে অসন্তোষের ভঙ্গিতে তার কথাগুলি শুনছে। কথায় ইতি টানবার জন্যই সম্রাট সামনের দিকে এগিয়ে গেল, কিন্তু ইতালিয় ভদ্রলোকটি উত্তেজনাবশে ভদ্রতার রীতিনীতি ভুলে গিয়ে তার পিছন পিছন এগিয়ে অনবরত কথা বলতে লাগল।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রিন্স আন্দ্রুকে দেখে সম্রাট তার অপরিচিত মুখটার দিকে ভালো করে তাকাল, ওদিকে পলুচি তখনো বলেই চলেছে, এই শিবির, দ্রিসার শিবির গড়বার পরামর্শ যে লোক দিয়েছিল স্যার, তার জন্য আমি তো পাগলা গারদ অথবা ফাঁসি-কাঠ ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখি না!
ইতালিয় লোকটির শেষের কথায় কান না দিয়ে, এমন কি সেকথা যেন শুনতেই পায়নি এমনি ভাব দেখিয়ে সম্রাট এবার বলকনস্কিকে চিনতে পেরে বলল :
তোমাকে দেখে খুব খুশি হলাম। যেখানে সকলে অপেক্ষা করছে সেখানে যাও, আমার জন্য অপেক্ষা কর।
সম্রাট পড়ার ঘরে গেল। তার পিছন পিছন ঢুকল প্রিন্স পিতার মিখায়লভিচ বলকনস্কি ও ব্যারণ স্তিন, দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। সম্রাটের অনুমতির সুযোগ নিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু পলুচির সঙ্গেই বসার ঘরে ঢুকল। সেখানেই পরিষদের সভা বসেছে।
প্রিন্স পিতর মিখায়লভিচ ভলকনস্কি যে আসনটি দখল করল তাতে মনে হল সেই বুঝি ম্রাটের পরিষদবর্গের প্রধান। কয়েকটা মানচিত্র টেবিলের উপর মেলে ধরে সে নানারকম প্রশ্ন করে উপস্থিত ভদ্রলোকদের মতামত শুনতে চাইল। ঘটনাটা হল : আগের দিন রাতে খবর এসেছে (যদিও পরবর্তীকালে খবরটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে) যে ফরাসিরা দ্রিসা শিবির ভেদ করে অগ্রসর হচ্ছে।
প্রথমে কথা বলল জেনারেল আর্মফেল্ট, অপ্রত্যাশিতভাবে সে প্রস্তাব করল যে এই বিপদের মোকাবিলা করতে পিটার্সবুর্গ ও মস্কোর রাস্তা থেকে দূরে কোথাও নতুন ঘাঁটি করা হোক, আর সেইখানে সব সেনাদল মিলিত হয়ে শত্রুর জন্য অপেক্ষা করে থাকুক। কেউ তার প্রস্তাবের বিরোধিতা করল, আবার কেউ বা সমর্থন করল। তরুণ কাউন্ট তল আপত্তি জানিয়ে একটা নতুন পরিকল্পনা পেশ করল। তার জবাবে পলুচি প্রস্তাব করল, অগ্রসর হয়ে আগেই আক্রমণ করা হোক, তাহলেই এই অনিশ্চয়তা ও ফাঁদের হাত থেকে আমরা রক্ষা পাব। এইসব আলোচনার সময় পফুয়েল ও তার ভাষ্যকার ওলযোগেন চুপ করে থাকল। কাজেই সভাপতি প্রিন্স বলকনস্কি যখন তার মতামত চাইল তখন সে শুধু বলল :
আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? জেনারেল আর্মফেল্ট তো চমঙ্কার প্রস্তাব দিয়েছেন-পিছন অরক্ষিত রেখে নতুন ঘাঁটি বানানো হোক, আর এই ইতালিয় ভদ্রলোকের আক্রমণের প্রস্তাবই বা নয় কেন-সেটাও তো ভালো, অথবা পশ্চাদপসরণ, তাও ভালো! আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন? আরে, আপনারা তো সবকিছুই আমার চাইতে ভালো জানেন।
কিন্তু বলকনস্কি যখন ভ্রুকুটি করে বলল যে সম্রাটের নামেই সে তার মতামত জানতে চেয়েছে তখন পফুয়েল উঠে দাঁড়িয়ে সহসা উত্তেজিত হয়ে বলতে শুরু করল :
সব ভেস্তে গেছে, জগাখিচুরি হয়ে গেছে, সকলেই ভাবল তারা আমার চাইতে বেশি জানে, আর এখন আপনি এসেছেন আমার কাছে! কেমন করে অবস্থা সামাল দেওয়া যায়? সামাল দেবার আর কিছু নেই। হারসর্বস্ব আঙুল দিয়ে টেবিলটা সাজিয়ে সে বলে উঠল, আমি যে বিধান দিয়েছি সেটাকেই কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। কিন্তু তাতে অসুবিধা কি? অর্থহীন, ছেলেমানুষ!
মানচিত্রের কাছে গিয়ে দ্রুতলয়ে কথা বলে সে প্রমাণ করতে লেগে গেল যে, কোনো অবস্থাতেই দ্রিসা শিবিরের সুরক্ষা-ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে না, সবকিছুই আগে থেকে খতিয়ে দেখা হয়েছে এবং শত্রুপক্ষ যদি তাকে ভেদ করতে চেষ্টা করে তাহলে তার ধ্বংস অনিবার্য।
