এই দলের লোকজনরা সকলেই রুবল, সামরিক সম্মান ও পদোন্নতি হাতাতেই ব্যস্ত, আর সেই উদ্দেশ্যে সবসময়ই নজর রাখে সম্রাটের দাক্ষিণ্যের বায়ু-পাখির দিকে, সেটা যখন যেদিকে ঘোরে সেনাদলের এই মৌমাছি-দল তখন সে দিকেই সদলে ঝুঁকে পড়ে, আর তার ফলে সেটাকে অন্য কোনোদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্রাটের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়ে। চারদিককার অনিশ্চয়তা, আসন্ন বিপদের আশংকা, ষড়যন্ত্র, স্বার্থপরতা ও ধ্যান-ধারণার সংঘাত, এবং এইসব মানুষের স্বার্থসিদ্ধির দৌড়-এইসবের কেন্দ্রস্থল হিসেবে অষ্টম ও বৃহত্তর দলটাই পরিস্থিতিকে আরো ঘোরালো ও অনিশ্চিত করে তুলেছে। যখনই কোনো সমস্যা দেখা দেয় তখনই এই দলটি ঝাঁক বেঁধে এসে সেখানে গুন-গুন শুরু করে দেয়, এবং যারা সরল মনে কোনো বিতর্ক তুলতে চায় তাদের কণ্ঠস্বর সেই গুঞ্জনে চাপা পড়ে যায়।
ঠিক যে সময় প্রিন্স আন্দ্রু সেনাদলে গিয়ে পৌঁছল তখন এইসব দলের ভিতর থেকে আরো একটা নবম দল সবে গড়ে উঠে গলা তুলতে শুরু করেছে। সেটা হচ্ছে প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও রাষ্ট্রীয় কর্মপরিচালনায় দক্ষ লোকদের দল, এই সব দলগুলির সঙ্গে যুক্ত না থেকে দলটি প্রধান ঘাঁটির কাজকর্মকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে পারে এবং এই অস্থিরতা, জটিলতা ও দুর্বলতার হ-য-ব-র-ল থেকে উদ্ধারের একটা উপায় বলে দিতে জানে।
এই দলের লোকরা এই কথাই ভাবতে লাগল ও বলতে চাইল যে সামরিক দরবারসহ সম্রাটের সেনাদলে উপস্থিতিই সব দোষের মূল কারণ, এ ধরনের ব্যবস্থা রাজ-দরবারে চলে, কিন্তু সেনাদলের পক্ষে ক্ষতিকর, সম্রাটের কাজ রাজ্য শাসন করা, সৈন্য-পরিচালনা নয়, এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার লাভের একমাত্র পথ সম্রাটের দলবলসহ সেনাবাহিনীকে ছেড়ে চলে যাওয়া, যে পঞ্চাশ হাজার লোক সম্রাটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজন একমাত্র সম্রাটের উপস্থিতির ফলেই তাদের সব কর্মক্ষমতা পঙ্গু হয়ে যায়, এবং সবচাইতে বাজে প্রধান সেনাপতিও যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তাহলে সেও সম্রাটের উপস্থিতি ও কর্তৃত্বের দ্বারা শৃঙ্খলিত একজন সেরা প্রধান সেনাপতির চাইতে ভালোভাবে কাজ চালাতে পারে।
ঠিক যে সময় প্রিন্স আন্দ্রু বেকার হয়ে দ্রিসাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে তখনই এই দলের একজন প্রধান প্রতিনিধি ও স্বরাষ্ট্রসচিব শিশকভ সম্রাটকে একটা চিঠি লিখল, আরাকচিভ ও বলাশেভও তাতে সই করতে রাজি হল। রাজধানীর লোকদের মধ্যে একটা যুদ্ধকালীন মনোভাব গড়ে তোলা ম্রাটের দিক থেকে খুবই দরকারি কাজ–এই অজুহাত দেখিয়ে ওই চিঠিতে শিশকভ সসম্মানে প্রস্তাব করল যে ম্রাটের উচিত সেনাদল ছেড়ে চলে যাওয়া।
সম্রাট কর্তৃক জনসাধারণকে জাগিয়ে তোলা, তাদের প্রতি দেশ রক্ষার আহ্বান জানানোমস্কোতে জারের ব্যক্তিগত উপস্থিতির ফলে এইভাবে যে অনুপ্রেরণার সৃষ্টি হবে সেটাই রাশিয়ার জয়লাভের প্রধান কারণ হবে-সম্রাট কর্তৃক সেনাদল পরিত্যাগের অজুহাত হিসেবে তার কাছে এই প্রস্তাবই রাখা হল এবং সম্রাটও সে প্রস্তাব মেনে নিল।
.
অধ্যায়-১০
চিঠিটা তখনো সম্রাটের হাতে দেওয়া হয় নি এমন সময় একদিন ডিনারে বসে বার্কলে বলকনস্কিকে জানাল, সম্রাট স্বয়ং তার সঙ্গে দেখা করতে চায়, তুরস্ক সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় এবং সেদিন সন্ধ্যা ছটায় প্রিন্স আন্দ্রু যেন বেনিংসেনের বাসায় হাজির থাকে।
প্রিন্স আন্দ্রু যথাসময়ে বেনিংসেনের বাসভবনে হাজির হল, নদীর একেবারে তীর ঘেঁষে জনৈক গ্রাম্য ভদ্রলোকের একটা মোটামুটি আকারের বাড়িতে বেনিংসেনের অস্থায়ী আস্তানা। বেনিংসেন বা সম্রাট কেউ সেখানে নেই, ম্রাটের এড-ডি-কং চের্নিশেভ তাকে অভ্যর্থনা করে জানাল, জেনারেল বেনিংসেন ও মার্কুইস পলুচিকে সঙ্গে নিয়ে সম্রাট দ্বিতীয়বার দ্রিসা শিবিরের রক্ষা-ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখতে গেছেন, কারণ সেখানকার রক্ষা-ব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুতর সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
একটা ফরাসি উপন্যাস হাতে নিয়ে চের্নিশেভ প্রথম ঘরের জানালার পাশে বসে ছিল। ঘরটা সম্ভবত গানের ঘর ছিল, এককোণে একটা অর্গান রয়েছে, তার উপর কতকগুলি কম্বল তূপ করে রাখা হয়েছে, আর কোণে আছে বেনিংসেনের অ্যাডজুটান্টের ভাঁজ-করা খাটটা। কাজের ফলে বা ভোজনের ফলে ক্লান্ত হয়ে অ্যাডজুটান্টটি গোল-করা বিছানার উপর বসে ঝিমুচ্ছে। ঘরের দুটো দরজা, একটা দিয়ে বসার ঘরে যাওয়া যায়, ডান দিককার দরজাটা দিয়ে যাওয়া যায় পড়ার ঘরে। প্রথম দরজাটা দিয়ে জার্মান ভাষায় এবং মাঝে মাঝে ফরাসি ভাষায় আলোচনার শব্দ ভেসে আসছে। বসার ঘরে একটা সভা বসেছে, ঠিক সামরিক পরিষদ নয়, এমন কয়েকজন জমায়েত হয়েছে আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সম্রাট যাদের মতামত জানতে ইচ্ছুক। এই আধা পরিষদে আমন্ত্রিত হয়েছে সুইডিশ জেনারেল আর্মফেল্ট, অ্যাডজুটান্ট-জেনারেল ওলযোগেন, উইন্তজেবোদ, মিচদ, তোল, কাউন্ট স্তিন ও পফুয়েল স্বয়ং। প্রিন্স আন্দ্রু আগেই শুনেছে যে এই লোকটিই নাটের গুরু। তাকে ভালো করে দেখবার একটা সুযোগ প্রিন্স আন্দ্রু পেয়ে গেল, কারণ তার ঠিক পরেই সে এসেছে এবং বসার ঘর পার হয়ে যাবার সময় মিনিটখানেক থেকে চের্নিশেভের সঙ্গে কিছু কথা বলে গেছে।
