বল্ড হিলসের বাড়ি থেকে যেতে যেতে প্রিন্স আন্দ্রু ভাবল, তাহলে তাই হবে!…বেচারি নির্দোষ মানুষটি এখানে থেকে এমন একটি বৃদ্ধের নির্যাতনের শিকার হবে যার বুদ্ধিভ্রংশ ঘটেছে। বুড়ো জানে যে দোষ তারই, কিন্তু নিজেকে বদলাতে পারে না। আমার ছেলে বড় হচ্ছে, তার জীবনে আনন্দ আছে, সেও হয় প্রতারণা করবে, আর না হয় প্রতারিত হবে। আর আমি চলেছি সৈন্যদলে। কেন? তা আমি নিজেই জানি না। যে লোকটাকে আমি ঘৃণা করি তার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই, আমাকে হত্যা করে আমাকে দেখে হাসবার একটা সুযোগ তাকে দিতে চাই।
জীবনের এই অবস্থাগুলি আগেও ছিল, কিন্তু তখন সব ছিল সুসংবদ্ধ, এখন সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। প্রিন্স আন্দ্রুর মনের সামনে একের পর এক ভেসে আসতে লাগল যতসব অর্থহীন, অসংবদ্ধ ছবি।
.
অধ্যায়-৯
জুনের শেষভাগে প্রিন্স আন্দ্রু সেনাদলের প্রধান ঘাঁটিতে পৌঁছে গেল। স্বয়ং সম্রাটসহ প্রথম সেনাদল তখন দ্রিসার সুরক্ষিত শিবিরে অবস্থান করছে, দ্বিতীয় সেনাদল পশ্চাদপসরণ করছে, একটা বড় ফরাসি বাহিনীদ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা তখন প্রথম সেনাদলের সঙ্গে মিলিত হবার চেষ্টা করছে। রুশ বাহিনীর অবস্থা নিয়ে সকলেই অসন্তুষ্ট, কিন্তু ফরাসিরা মূল রুশ ভূখণ্ড আক্রমণ করবে এ আশংকা তখনো কারো মনে দেখা দেয়নি, কেউ ভাবেনি যে পশ্চিমাঞ্চলের পোলিশ ভূখণ্ড (রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত) ছাড়িয়ে যুদ্ধ আরো ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দ্রিসার তীরেই বার্কলে দ্য তলির সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রুর দেখা হয়ে গেল, তার সেনাদলে যোগ দিতেই সে এসেছে। শিবিরের কাছাকাছি কোনো শহর বা বড় গ্রাম না থাকায় সেনাদলের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য সেনাপতি ও সভাসদরা নদীর দুই তীরবর্তী বিভিন্ন গ্রামের ভালো ভালো বাড়িগুলোতে বাস করছে, বার্কলে দ্য তলির বাসস্থানটি সম্রাটের বাসভবনের প্রায় তিন মাইল দূরে অবস্থিত। বার্কলে কিছুটা রুক্ষ ও নিরাসক্তভাবেই তাকে গ্রহণ করল, বলল, তার চাকরি সম্পর্কে একটা সিদ্ধান্ত নিতে সে সম্রাটকে বলবে, তবে আপাতত সে তার সঙ্গেই থাকবে। আনাতোল কুরাগিনকে এখানেও পাওয়া গেল না। সে পিটার্সবুর্গ চলে গেছে, কিন্তু একথা শুনে প্রিন্স আন্দ্রু খুশি হল। কুরাগিনের চিন্তা থেকে অব্যাহতি পেয়ে এখানকার এই বিরাট যুদ্ধের আয়োজনের মধ্যেই সে ডুবে গেল। প্রথম চারদিন হাতে কোনো কাজ না থাকায় সে সুরক্ষিত শিবিরটাকে ঘুরে ঘুরে দেখল এবং নিজের জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞদের কথাবার্তা থেকে এই যুদ্ধ সম্পর্কে একটা নিজস্ব ধারণা গড়ে তুলতে লাগল। সে ধারণাটা নিম্নরূপ।
সম্রাট ভিলনাতে থাকতেই সেনাবাহিনীকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। প্রথম দল বার্কলে দ্য তলির অধীন, দ্বিতীয় দল ব্যাগ্রেশনের অধীন, এবং তৃতীয় দলের কমান্ডার তর্মাসভ। সম্রাট প্রথম দলে থাকলেও প্রধান সেনাপতি হিসেবে ছিল না। প্রচারিত হুকুমনামায় বলা হয়েছিল, সম্রাট সৈন্য পরিচালনার ভার নেবে না, শুধু তাদের সঙ্গে থাকবে। তদুপরি প্রধান সেনাপতির কর্মচারীবৃন্দের পরিবর্তে সম্রাটের সঙ্গে ছিল রাজকীয় কর্মচারীবৃন্দ। তার সঙ্গে আর ছিল রাজকীয় কর্মচারীবৃন্দের প্রধান কোয়ার্টার-মাস্টার-জেনারেল প্রিন্স ভলকনস্কি এবং সেনাপতিগণ, রাজকীয় এড-ডি-কংগণ, কূটনৈতিক কর্মচারীবৃন্দ ও বহুসংখ্যক বিদেশী, শুধু ছিল না সামরিক বিভাগের কর্মচারীবৃন্দ। এছাড়া কোনো বিশেষ পদে নিযুক্ত না হয়েও ছিল : প্রাক্তন সমরমন্ত্রী আরাকচিভ, মর্যাদার প্রধান সেনাপতি কাউন্ট বেনিংসেন, গ্র্যান্ড ডিউক জায়রেভিচ কনস্তান্তিন পাভলভিচ, চ্যান্সেলর কাউন্ট রুমিয়ান্তসেভ, প্রাক্তন প্রুশিয় মন্ত্রী স্তিন, সুইডিস সেনাপতি আর্মফেল্ট, অভিযান-পরিকল্পনার প্রধান রচয়িতা পফুয়েল, সার্দিনিয়া থেকে এসে বসবাসকারী অ্যাডজুটান্ট-জেনারেল পলুচি, ওলযোগেন এবং আরো অনেকে। এটা বাইরের চিত্র, কিন্তু সম্রাট ও এইসব লোকের উপস্থিতির আসল তাৎপর্য হল এই : প্রধান সেনাপতির পদ গ্রহণ না করেও সম্রাটই সমস্ত সৈন্য পরিচালনা করত, আর এইসব লোক ছিল তার সহকারী। হুকুম তামিল করার ভার ছিল আরাকচিভের উপর, সম্রাটের দেহরক্ষীর কাজও সে করত। বেনিংসেন ভিলনা অঞ্চলের একজন জমিদার, আসলে একজন ভালো সেনাপতি ও পরামর্শদাতা, প্রয়োজন হলে তাকে বার্কলের জায়গায় বসানো যেতে পারে। গ্র্যান্ড ডিউক দলে ছিল নিজেরই প্রয়োজনে। প্রাক্তন মন্ত্রী স্তিন ছিল কারণ তার পরামর্শ খুব দরকারি, আর সম্রাট আলেক্সান্দার তাকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে। আর্মফেল্ট নেপোলিয়নকে ভীষণভাবে ঘৃণা করে, সেনাপতি হিসেবেও সে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, আর সেই গুণেই সে সম্রাটের প্রিয়পাত্র। পলুচি স্থান পেয়েছে সাহস ও বাগ্মিতার জন্য। অ্যাডজুটান্ট-জেনারেলরা তো সবসময় ম্রাটের সঙ্গে সঙ্গেই ফেরে, আর সকলের শেষে পফুয়েল দলে এসেছে কারণ নেপোলিয়ন-বিরোধী অভিযানের পরিকল্পনাটি তারই রচনা এবং সে ব্যাপারে সেই সরেস।
প্রিন্স আন্দ্রু আরো লক্ষ্য করল যে এই কর্মচঞ্চল প্রকাণ্ড জগৎটাকে নানান ধ্যান-ধারণার নিরিখে সরাসরি আটটা দলে ভাগ করা যায়। তার মধ্যে সাতটি দল গড়ে উঠেছে নানা সেনাপতি ও প্রভাবশালী লোকদের কেন্দ্র করে। প্রতিটি দলই একে অন্যের বিরোধী ও নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু তাদের তুলনায় সবচাইতে বড় হচ্ছে অষ্টম দলটি, অন্য দলের তুলনায় তাদের সংখ্যার আনুপাতিক হার নিরানব্বই জনে একজন : তারা যুদ্ধ বা শান্তি কোনোটাই চায় না, সৈন্যদল অগ্রসর হোক অথবা দ্রিসা বা অন্য কোথাও শিবিরে বসে থাকুক তাতেও তাদের কিছু যায়-আসে না, বার্কলে বা সম্রাট, পফুয়েল বা বেনিংসেন-কাউকে নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই, তাদের একমাত্র লক্ষ্য–নিজেদের জন্য যত বেশি সম্ভব সুখ-সুবিধার ব্যবস্থা করা। পারস্পরিক বিরোধিতা ও ষড়যন্ত্রের যে ঘূর্ণি-স্রোত তখন ম্রাটের প্রধান ঘটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছিল তার ভিতর থেকে ফায়দা তোলা এখন যতটা সম্ভব অন্য সময় তা কল্পনাও করা যায় না। সকলেই না ফন্দি-ফিকিরে যার যার কাজ গুছাতেই ব্যস্ত।
