পরিবারের সকলে একসঙ্গেই ডিনারে বসে, কিন্তু সকলেই কেমন যেন অস্বস্তিতে কাটায়। প্রিন্স আন্দ্রু বুঝতে পারল, এখন সে এখানে অতিথি বলেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, আর তার উপস্থিতি সকলকেই অস্বস্তিতে ফেলেছে। প্রথম দিন ডিনারে বসেই এটা বুঝতে পেরে সে চুপ করে গেল, আর সেটা লক্ষ্য করে বুড়ো প্রিন্সও মুখ বুজে ডিনার সেরে সঙ্গে সঙ্গে তার ঘরে চলে গেল। সন্ধ্যার পরে প্রিন্স আন্দ্রু যখন তার ঘরে গিয়ে কাউন্ট কামেনস্কির অভিযানের কথা বলতে শুরু করল, বুড়ো প্রিন্স তখন অপ্রত্যাশিতভাবে প্রিন্সেস মারির কথা তুলল, এবং তার কুসংস্কার ও মাদময়জেল বুরিয়ের প্রতি বিরূপতার জন্য তার উপর দোষারোপ করতে লাগল অথচ তার মতে একমাত্র সেই মানুষটিই তার প্রতি সত্যি সত্যি অনুরক্ত।
বুড়ো প্রিন্স বলল, তার অসুখের জন্য প্রিন্সেস মারিই দায়ী :ইচ্ছা করে সে তাকে বিরক্ত করে, যন্ত্রণা দেয় এবং বেশি আদর দিয়ে ও আজে-বাজে কথা বলে ছোট্ট প্রিন্স নিকলাসকেও নষ্ট করছে। তারপরই সে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে লাগল কেন মেয়ের অযৌক্তিক আচরণকে সে মেনে নিতে পারছে না।
চোখ না তুলেই প্রিন্স আন্দ্রু বলল (জীবনে এই প্রথম সে বাবার কাজের নিন্দা করছে), এ বিষয়ে কথা বলার ইচ্ছা আমার ছিল না, কিন্তু তুমি যখন জানতে চাইছ তখন আমার যা মত তা খোলাখুলিই বলব। তোমার ও মারির মধ্যে যদি কোনো ভুল-বোঝাবুঝি ও বিরোধ ঘটে থাকে তবে সেজন্য আমি মোটেই তাকে দোষ দিতে পারি না। আমি জানি সে তোমাকে ভালোবাসে, ভক্তি করে। তুমি জিজ্ঞাসা করলে বলেই বলছি, কোনো ভুল-বোঝাবুঝি যদি ঘটে থাকে তার জন্য দায়ী শুধু ঐ অযোগ্যা স্ত্রীলোকটি–আমার বোনের সহচরী হবার যোগ্যতা তার নেই।
বুড়ো প্রথমে স্থিরদৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকাল, একটা অস্বাভাবিক হাসিতে তার ফোকলা দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল।
কোন সহচরী হে বাপু? অ্যাঁ? তুমি আবার ঐ কথা তুলেছ?
তিক্ত, কঠোর কণ্ঠে প্রিন্স আন্দ্রু বলল, আমি তো বিচার করতে চাইনি বাবা, তুমি আমাকে বলতে বাধ্য করেছ, আর তাই আমি বলছি, চিরদিন বলব, যে মারির কোনো দোষ নেই, কাউকে যদি দোষ দিতে হয়-একজনকেও যদি দোষ দিতে হয়তো সে ওই ফরাসি নারী।
আরে, এও দেখি রায় দিতে বসেছে…রায় দিচ্ছে! বুড়ো মানুষটি নিচু গলায় বলল, প্রিন্স আন্দ্রুর মনে হল তার কণ্ঠে একটা বিব্রতভাব ফুটে উঠেছে, কিন্তু পরক্ষণেই হঠাৎ সে লাফিয়ে উঠে চিৎকার করে বলল : চলে যাও, চলে যাও! তোমার চিহ্নমাত্র যেন এখানে না থাকে!…।
প্রিন্স আন্দ্রু তখনই চলে যেতে চাইল, কিন্তু প্রিন্সেস মারির পীড়াপীড়িতে আরো একদিন থেকে গেল। সেদিনটা সে বাবার সঙ্গে দেখা করল না, বুড়ো প্রিন্সও তার ঘর থেকে বের হল না, এবং মাদময়জেল বুরিয়ে ও তিখন ছাড়া আর কাউকে ঘরে ঢুকতে দিল না, তবে ছেলে চলে গেছে কিনা বারকয়েক সে খবর নিল। পরদিন যাবার আগে প্রিন্স আন্দ্রু ছেলের ঘরে গেল। মায়ের মতোই ছেলেটির মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল, সুস্বাস্থ্যে উজ্জ্বল। ছেলে তার হাঁটুর উপর বসল, আর সেও ছেলেকে নীল দাড়িওয়ালা-র গল্প বলতে শুরু করল। কিন্তু গল্প শেষ না করেই একটা দিবাস্বপ্নে ডুবে গেল। ছেলের বদলে নিজের কথা ভাবতে লাগল।
ছেলে বলল, তারপর? বলে যাও!
কোনও জবাব না দিয়ে ছেলেকে হাঁটু থেকে নামিয়ে দিয়ে প্রিন্স আন্দ্রু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
তাহলে তুমি যাবেই স্থির করেছ আঃ বোন শুধাল।
প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে আমি যেতে পারছি। কিন্তু আমার দুঃখ যে তুমি তা পারছ না।
প্রিন্সেস মারি বলল, সেকথা বলছ কেন? বাবার এই বুড়ো বয়সে তুমি এই ভয়ংকর যুদ্ধে চলে যাচ্ছ? মাদময়জেল বুরিয়ে বলছে, বাবা তোমার খোঁজ করছিল…
সেকথা বলতে গিয়েই তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল, চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। প্রিন্স আন্দ্রু মুখ ঘুরিয়ে ঘরময় পায়চারি করতে লাগল।
ওঃ, ঈশ্বর! ঈশ্বর! কত তুচ্ছ কারণেই যে মানুষ দুঃখ পেতে পারে সেকথা ভাবাও যায় না! এমন বিদ্বেষভরা গলায় সে কথাগুলি বলল যে প্রিন্সেস মারি শংকিত হয়ে উঠল।
সে বুঝতে পারল, তুচ্ছ বলতে সে শুধু মাদময়জেল বুরির্যের কথাই বলেনি, বলেছে তার কথাও যে তার জীবনের সব সুখ নষ্ট করেছে। পানিতে ভেজা চকচকে চোখে প্রিন্স আন্দ্রুর দিকে তাকিয়ে তার কনুই ধরে প্রিন্সেস মারি বলল আন্দ্রু! তোমার কাছে আমার একটি ভিক্ষা, একটি মিনতি আছে। তোমাকে আমি বুঝি। কখনো ভেবো না যে দুঃখ মানুষের সৃষ্টি। মানুষ তো তাঁর হাতের যন্ত্রমাত্র। দুঃখ তিনিই পাঠান, মানুষ নয়। মানুষ তার হাতের যন্ত্র, তাদের কোনো দোষ নেই। যদি মনে কর কেউ তোমার প্রতি অন্যায় করেছে, সেকথা ভুলে যাও, তাকে ক্ষমা কর! শাস্তি দেবার অধিকার আমাদের নেই। তাহলেই ক্ষমার যে কী আনন্দ তা তুমি জানতে পারবে।
আমি মেয়েমানুষ হলে এই কথাই বলতাম মারি। ওটা তো নারীর ধর্ম। কিন্তু পুরুষমানুষ ক্ষমা করতে পারে না, ভুলে যেতে পারে না, প্রিন্স আন্দ্রু বলল। যদিও সেই মুহূর্তে কুরাগিনের কথা তার মনে আসেনি, তবু সহসা দুর্বার ক্রোধে তার বুকটা ভরে উঠল।
প্রিন্সেস মারি তাকে আরো একটা দিন থেকে যেতে অনুরোধ করল, বলল, বাবার সঙ্গে একটা মিটমাট না করে সে যদি চলে যায় তাহলে বাবা বড়ই দুঃখ পাবে। কিন্তু প্রিন্স আন্দ্রু জবাব দিল, হয় তো শিগগিরই সে সেনাদল থেকে ফিরে আসবে, বাবার কাছে নিশ্চয়ই চিঠি লিখবে, কিন্তু এখন যত বেশি দিন সে এখানে থাকবে তাদের সম্পর্ক ততই তিক্ততর হবে। বোনের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় তার এই শেষ কথাগুলিই প্রিন্স আন্দ্রুর কানে এল : বিদায় আন্দ্রু! মনে রেখো, দুর্ভাগ্য আসে ঈশ্বরের কাছ থেকে, মানুষের কোনো দোষ নেই।
