.
অধ্যায়-৮
মস্কোতে পিয়েরের সঙ্গে দেখা হবার পরে প্রিন্স আন্দ্রু পিটার্সবুর্গ চলে গেল। বাড়িতে বলে গেল সেখানে কাজ আছে, কিন্তু আসলে গেল আনাতোল কুরাগিনের সঙ্গে একটা বোঝাঁপড়া করতে। পিটার্সবুর্গে পৌঁছে সে কুরাগিনের খোঁজ করল, কিন্তু কুরাগিন ততদিনে শহর ছেড়ে চলে গেছে। পিয়ের আগেই শ্যালককে সতর্ক করে দিয়েছিল যে প্রিন্স আন্দ্রু তার খোঁজ করছে। আনাতোল কুরাগিন তখনই সমর দপ্তর থেকে একটা চাকরি পেয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে মলদাভিয়াতে চলে গেছে। পিতার্সবুর্গে তার প্রাক্তন কমান্ডার কুতুজভের সঙ্গে প্রিন্স আন্দ্রুর দেখা হয়ে গেল। কুতুজভ বরাবরই তাকে সুনজরে দেখে, তাই সে প্রস্তাব করল, প্রিন্স আন্দ্রু তার সঙ্গে মলদাভিয়া চলুক, বর্তমানে সে সেখানকার প্রধান সেনাপতি পদে নিযুক্ত হয়েছে।
চিঠি লিখে কুরাগিনকে দ্বৈতযুদ্ধে আহ্বান করাটা প্রিন্স আন্দ্রুর কাছে সমীচীন বলে মনে হয় নি। সে ভাবল, কোনো নতুন কারণ ছাড়াই যদি সে তাকে যুদ্ধে আহ্বান করে তাহলে কাউন্টেস রস্তভা তাতে জড়িয়ে পড়তে পারে, কাজেই সে চাইল, নিজে কুরাগিনের সঙ্গে দেখা করে দ্বৈতযুদ্ধের একটা অজুহাত খুঁজে নেবে। কিন্তু তুরষেন ও কুরাগিনের সঙ্গে তার দেখা হল না, প্রিন্স আন্দ্রু সেখানে পৌঁছবার অনতিপরেই সে রাশিয়াতে ফিরে গেছে। নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে, প্রিন্স আন্দ্রুর কাছে জীবনটা কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠল। বাকদত্তা বধূর বিশ্বাসভঙ্গের পরে সেই একই পরিবেশে থাকা তার পক্ষে কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। অস্তারলিজের রণক্ষেত্রে আকাশের দিকে তাকিয়ে যে চিন্তা তার মনকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, আজ আর সে চিন্তা তার মনে আসে না, বরং সে চিন্তাকে আজ সে ভয় করে। সুদূর আকাশের যে অসীম চন্দ্রাতপ একদিন তার চোখের সামনে গড়ে উঠেছিল, সহসা সেটা একটা নিচু নীরেট ভূগর্ভ-প্রকোষ্ঠ হয়ে তাকে যেন চেপে ধরেছে, আজ সেখানে সবকিছুই অত্যন্ত স্পষ্ট, রহ্যসের ছায়ামাত্র সেখানে নেই।
তার সামনে যেসব কাজের সুবিধা তখন ছিল তার মধ্যে সামরিক চাকরিই সবচাইতে সরল ও পরিচিত। কুতুজভের অধীনস্থ কর্তব্যরত সেনাপতি হিসেবে এত উৎসাহ ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে সে কাজ করতে লাগল যে কুতুজতও তা দেখে অবাক হয়ে গেল। তুরস্কে কুরাগিনের সঙ্গে দেখা না হলেও প্রিন্স আন্দ্রু তক্ষুণি তার খোঁজে রাশিয়ায় ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। কিন্তু সেইসঙ্গে সে এটাও জানত, যত দেরিতেই হোক, কুরাগিনের সঙ্গে যেদিন তার দেখা হবে সেদিন তার মুখোমুখি দাঁড়াবার লোেভ সে সামলাতে পারবে না, ঠিক যেমন একটা ক্ষুধার্ত মানুষ খাবার সামনে পেলে সেটা ছিনিয়ে নেবার লোভ সামলাতে পারে না। অপমানের প্রতিশোধ এখন নেওয়া হয় নি, সব বিদ্বেষই বুকের মধ্যে জমা হয়ে আছে-এই চেতনাই তার বুকের উপর সারাক্ষণ চেপে বসে আছে, তুরস্কে এসে অবিশ্রাম কাজের টানে এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রেরণায় যে কৃত্রিম শান্তির সন্ধান সে পেয়েছে, তাকে সারাক্ষণ বিষাক্ত করে তুলছে।
১৮১২ সালে নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধের খবর যখন বুখারেন্টে এসে পৌঁছল–সেইসময় কুতুজভ দুমাস যাবৎ একটি ওয়ালাচিয়ান স্ত্রীলোকের সঙ্গে বুখারেস্টেই রাতদিন কাটাচ্ছিল-তখন প্রিন্স আন্দ্রু কুতুজভকে অনুরোধ করল তাকে পশ্চিম সেনাদলে বদলি করা হোক। কুতুজভ সঙ্গে সঙ্গে সে প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল এবং তাকে বার্কলে দ্য তলি-র সেনাদলে পাঠিয়ে দিল।
তখন মে মাস। পশ্চিম সেনাদল শিবির ফেলেছে দ্রিসা-তে। সেখানে যাবার পথেই মাত্র তিন ভাস্ট দূরে বন্ড হিলস পাড়ায় পশ্চিম সেনাদলে যোগ দেবার আগে প্রিন্স আন্দ্রু বল্ড হিলসে গেল। বিগত তিন বছরে তার জীবনে এত বেশি পরিবর্তন এসেছে, এত বেশি কথা সে ভেবেছে, এত বেশি সুখ-দুঃখ অনুভব করেছে, এবং পুবে ও পশ্চিমে এত বেশি দেশ দেখেছে, যে বল্ড হিলসে পৌঁছে যখন দেখল, সেখানকার জীবনযাত্রা ঠিক আগেকার মতোই আছে, তার এতটুকু পরিবর্তন ঘটেনি, তখন এই অভিজ্ঞতা তার কাছে যেমন বিস্ময়কর তেমনই অপ্রত্যাশিত বলে মনে হল। পাথরের থামওয়ালা ফটকের ভিতর দিয়ে ঢুকে তরু-বীথির ভিতর দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে তার মনে হল সে যেন একটা ঘুমন্ত স্বপ্নপুরীতে প্রবেশ করছে। সেই একই গাম্ভীর্য, একই পরিচ্ছন্নতা, সর্বত্র একই নিস্তব্ধতা, বাড়ির ভিতরে সেই একই আসবাবপত্র, একই দেয়াল, শব্দ ও গন্ধ, আর সেই একই ভীরু সব মুখ, শুধু তাদের বয়স কিছু বেড়েছে। প্রিন্সেস মারি যা ছিল তাই আছে, ভয় ও দুঃখভোগের ভিতর দিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলি কাটিয়ে চলেছে। মাদময়জেল বুরিয়ে সেই একই ছটফটে, আত্মতুষ্ট নারী, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সে আনন্দের ভিতর দিয়ে কাটাচ্ছে, আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও মনে আছে আনন্দের প্রত্যাশা। শুধু তার আত্মবিশ্বাসটা আরো বেড়েছে। যে শিক্ষকটিকে সে নিজে সুইজারল্যান্ড থেকে নিয়ে এসেছিল সেই দেসাল্লেস নামক ভদ্রলোক রুশ ছটের একটা কোট পরে ভাঙা রুশ ভাষায় চাকরদের সঙ্গে কথা বলছে, সেই একই সংকীর্ণ বুদ্ধির অধিকারী, বিবেকবান ও পণ্ডিতমন্য শিক্ষক। একটা দাঁত পড়ে যাওয়ায় বুড়ো প্রিন্সের চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু চরিত্রে সেই একই আছে, শুধু আরো একটু খিটখিটে ও সন্দেহবাদী হয়ে পড়েছে। একমাত্র পরিবর্তন হয়েছে ছোট্ট নিকলাসের। বড় হয়েছে, আরো গোলাপি হয়েছে, চুল ঘন কালো ও কোকড়া হয়েছে, হাসবার সময় উপরের ঠোঁটটা একটু ঠেলে ওঠে, ঠিক ছোট প্রিন্সেসের মতো। কিন্তু বাইরে আগেকার মতো থাকলেও এইসব মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। গোটা সংসারটা দুটো বিরোধী শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে। এক শিবিরে আছে বুড়ো প্রিন্স, মাদময়জেল বুরিয়ে ও স্থপতি, অন্য শিবিরে আছে প্রিন্সেস মারি, দেসাল্লেস, ছোট্ট নিকলাস এবং বুড়ি নার্স ও দাসীরা।
