বেসিয়েরে, কলাইকুর্ত ও বেথিয়েরও ডিনারে উপস্থিত ছিল।
ভিলনার ভিতর দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে আসার পরে সম্রাটের মেজাজ এখন খুব ভালো। সেখানে জনতা তাকে ভিড় করে সোসাহে অভ্যর্থনা জানিয়েছে, তাকে অনুসরণ করেছে। যে পথ দিয়ে সে এসেছে তার দুই দিককার জানালায় পতাকা ও তার প্রতীক-চিহ্ন প্রদর্শিত হয়েছে, পোলিশ-মহিলারা তাকে লক্ষ্য করে রুমাল উড়িয়েছে।
ডিনারে বলাশেভকে পাশে বসিয়ে নেপোলিয়ন যে তার সঙ্গে মধুর ব্যবহার করল তাই নয়, এমন ব্যবহার করল যেন সে তারই অন্যতম সভাসদ, তার প্রতি সহানুভূতিশীল, এবং তার সাফল্যে আনন্দ করতে প্রস্তুত। আলোচনা প্রসঙ্গে সে মস্কোর কথা উল্লেখ করল, রুশ রাজধানী সম্পর্কে বলাশেভকে নানা প্রশ্ন করল।
মস্কোর অধিবাসী-সংখ্যা কত? কত বাড়িঘর আছে। একথা কি সত্য যে মস্কোকে পবিত্র মস্কো বলা হয়? মস্কোতে কতগুলি গির্জা আছে?
দুশর বেশি গির্জা আছে শুনে বলল, এত গির্জা কেন?
রুশরা খুব ধার্মিক বলাশেভ জবাব দিল।
কিন্তু মঠ ও গির্জার সংখ্যাধিক্য তো জনসাধারণের অনুন্নত অবস্থারই লক্ষণ, কথাটা বলে প্রশংসা পাবার আশায় নেপোলিয়ন কলাইকুর্তের দিকে তাকাল।
বলাশেভ শ্রদ্ধার সঙ্গে ফরাসি সম্রাটের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করল।
বলল, সব দেশেরই একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে।
কিন্তু ইওরোপের আর কোথাও তো এরকমটা নেই, নেপোলিয়ন বলল।
বলাশেভ পাল্টা জবাব দিল, ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি আমাকে ক্ষমা করবেন, রাশিয়া ছাড়া স্পেনেও অনেক গির্জা ও মঠ আছে।
বলাশেভের এই উক্তির মধ্যে সম্প্রতি স্পেনে ফরাসিদের পরাজয়ের ইঙ্গিত থাকায় উপস্থিত কেউই কথাটা খেয়াল করল না। নেপোলিয়নও তার কথায় কান না দিয়ে শুধাল, সেখান থেকে মস্কো যাবার সোজা রাস্তা কোনটা। ডিনারের সময় বলাশেভ আগাগোড়াই বেশ সতর্ক ছিল, সে জবাব দিল, সব রাস্তা যেমন রোশে যায়, তেমনই সব রাস্তাই মস্কোতে যায় : রাস্তা অনেক আছে, তার মধ্যে পলতার ভিতর দিয়ে যাবার যে রাস্তাটা দ্বাদশ চার্লস বেছে নিয়েছিল সেটাও আছে। মুখের মতো জবাব দিয়ে পারায় খুশিতে বলাশেভের মুখটা লাল হয়ে উঠল। কিন্তু কলাইকুর্ত সঙ্গে সঙ্গে অন্য প্রসঙ্গ তুলে পিটার্সবুর্গ থেকে মস্কো যাবার রাস্তার দুর্গতি এবং তার পিটার্সবুর্গের স্মৃতির কথা বলতে শুরু করে দিল।
ডিনারের পরে কফি খেতে তারা নেপোলিয়নের পড়ার ঘরে গেল। চারদিন আগে এটাই ছিল সম্রাট আলেক্সান্দারের পড়ার ঘর। নেপোলিয়ন বসল, সেভার্স কফি-পেয়ালাটা নাচাতে নাচাতে পাশের চেয়ারটায় বলাশেভকে বসতে বলল। ডিনার-পরবর্তীকালের মৌজে থাকায় এখন বলাশেভকেও তার বন্ধু ও অনুরাগী বলে মনে হল। ঈষৎ ব্যঙ্গাত্মক খুশির হাসি হেসে তাকে বলল, এই ঘরেই নাকি সম্রাট আলেক্সান্দার থাকতেন? কী আশ্চর্য, তাই না সেনাপতি?
বলাশেভ কোনো জবাব দিতে পারল না, নিঃশব্দে মাথাটা নিচু করল।
সেই একই ব্যঙ্গাত্মক আত্মপ্রত্যয়শীল হসির সঙ্গে নেপোলিয়ন বলতে লাগল, হ্যাঁ। চারদিন আগে এই ঘরেই উইন্তনিজেরোদ ও স্তিন আলোচনায় বসেছিল। সম্রাট আলেক্সান্দার কেন যে আমার ব্যক্তিগত শত্রুদের দ্বারা পরিবৃত হয়ে আছেন সেটাই আমি বুঝতে পারি না। বুঝতে…পারি না। একথা কি তিনি একবারও ভাবেননি যে আমিও ঠিক তাই করতে পারি? জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সে বলাশেভের দিকে তাকাল, সকালবেলাকার রাগটা যেন আবার তার মনে পড়ে গেল।
পেয়ালাটা ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নেপোলিয়ন বলল, তিনি জেনে রাখুন যে সেই কাজই আমি করব। তার সব উতেমবেৰ্গ, বাদেন ও উইমারের আত্মীয়দের আমি জার্মেনি থেকে তাড়িয়ে দেব…া। তাড়িয়ে দেব। তিনি যেন রাশিয়াতে তাদের জন্য একটা আশ্রয়-শিবির বানিয়ে রাখেন!
বলাশেভ এমনভাবে মাথাটা নোয়াল যেন সে বলতে চাইল যে এবার সে বিদায় নিতে চায়। কিন্তু নেপোলিয়ন সেটা বুঝতে পারল না। সমানেই কথা বলে চলল।
কেনই বা সম্রাট আলেক্সান্দার নিজের হাতে সৈন্য-পরিচালনার ভার নিয়েছেন। তাতে কি লাভ হবে? যুদ্ধ আমার কাজ, আর কাজ রাজ্যশাসন করা, সৈন্য পরিচালনা নয়! কেন তিনি এ দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়েছেন?
নেপোলিয়ন আবার নস্যিদানিটা বের করল, নিঃশব্দে বারকয়েক পায়চারি করল, তারপর অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাৎ বলাশেভের কাছে এগিয়ে গেল এবং যেন এমন একটা কাজ করছে যেটা শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, বলাশেভের পক্ষে প্রীতিদায়কও বটে এমনিভাবে আত্মপ্রত্যয়ের হাসি হেসে চল্লিশ বছর বয়সের রুশ সেনাপতির মুখের কাছে হাতটা তুলে তার কানটা ধরে মৃদু টান দিল, ঠোঁটে তখন মৃদু হাসির রেখা।
সম্রাট কারো কান ধরে টানলে ফরাসি রাজ-দরবারে সেটাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও অনুগ্রহের লক্ষণ বলে মনে করা হয়।
ওহে সম্রাট আলেক্সান্দারের ভক্ত ও সভাসদ, আপনি কিছু বলছেন না কেন? নেপোলিয়ন বলল, যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য কারো ভক্ত ও সভাসদ হওয়াটাই হাস্যকর। বলাশেভের অভিবাদনের জবাবে মাথাটাকে ঈষৎ নুইয়ে বলল, সেনাপতির ঘোড়া তৈরি তো? তাকে আমার ঘোড়াটাই দাও। অনেকদূর পথ পাড়ি দিতে হবে!
বলাশেভ যে চিঠিটা নিয়ে গেল আলেক্সান্দারকে লেখা নেপোলিয়নের সেটাই শেষ চিঠি। সাক্ষাৎকারের বিবরণ সবিস্তারেই রুশ সম্রাটকে জানানো হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল…
