মাত্র এক সপ্তাহ হল অভিযান শুরু হয়েছে, এরই মধ্যে আপনারা ভিলনা রক্ষা করতেও পারেননি। আপনাদের দুই ভাগে বিচ্ছিন্ন করে পোলিশ অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। আপনাদের সৈন্যদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বলাশেভকে যা বলে দেওয়া হয়েছিল তা সে ভুলে গেল, এই কথার ফুলঝুরি ঠিক বুঝতে না পেরে বলে উঠল, কিন্তু ইয়োর ম্যাজেস্ট্রি, সৈন্যদল তো উৎসাহে উজ্জীবিত…।
নেপোলিয়ন তাকে বাধা দিল, আমি সব জানি। আমি সব জানি। আপনাদের ব্যাটেলিয়ানের সংখ্যা কত তাও জানি, ঠিক যেমন জানি আমার ব্যাটেলিয়ানের সংখ্যা। আপনাদের তো দুলক্ষ সৈন্যও নেই, আর আমার সৈন্য-সংখ্যা তার তিন গুণ। আমি আপনাকে বলছি, ভিলার এপারেই আছে আমার পাঁচ লক্ষ ত্রিশ হাজার সৈন্য। তুর্কিরা আপনাদের কোনো কাজে লাগবে না, তাদের কোনো মূল্যই নেই, আর আপনাদের সঙ্গে সন্ধি করে তারা সেটাই প্রমাণ করেছে। আর সুইডদের কথা-পাগলা রাজাদের দ্বারা শাসিত হওয়াই তাদের বিধিলিপি। তাদের রাজা ছিল পাগল, তাই তার জায়গায় এনে বসাল আর একজনকে-বার্নাদোতকে -অচিরেই সেও পাগল হয়ে গেল-কারণ পাগল না হলে কেউ রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে না।
ঘৃণায় দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে নেপোলিয়ন আর একবার নস্যিদানিটা নাকের কাছে তুলে ধরল।
নেপোলিয়ন প্রতিটি মন্তব্যের কি জবাব হয় তা বলাশেভ জানে, বারবার সেকথা বলতে চেষ্টাও করল, কিন্তু প্রতিবারই নেপোলিয়ন তাকে বাধা দিতে লাগল। নেপোলিয়ন এমন একটা অবস্থায় এসেছে যে সে যা বলছে সেটাই যে ঠিক সেকথা নিজেকে বোঝাবার জন্যই তাকে অনবরত কথা বলে যেতে হচ্ছে। বলাশেভ ক্রমেই অস্বস্তি বোধ করছে : দূত হিসেবে তার আশঙ্কা হচ্ছে যে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, এসব কথার জবাব দেওয়া দরকার, আবার মানুষ হিসেবে নেপোলিয়নের এই অকারণ ক্রোধের সামনে সে যেন কুঁকড়ে যাচ্ছে। সে জানে, নেপোলিয়নের এসব কথার কোনো অর্থই নেই, সম্বিত ফিরে এলে সে নিজেই এজন্য লজ্জাবোধ করবে। বলাশেভ চোখ নিচু করে নেপোলিয়নের শক্ত পা দুটোর গতিবিধি দেখতে লাগল, তার চোখের দৃষ্টিকে এড়িয়ে চলতে চাইল।
নেপোলিয়ন বলতে লাগল, কিন্তু আপনাদের বন্ধুদের তোয়াক্কা আমি করি না। আমারও বন্ধু আছে-পোলরা। তারাও সংখ্যায় আশি হাজার, তারা লড়াই করে সিংহের মতো! অচিরেই তারা সংখ্যায় দুই লক্ষ হবে।
হয়তো নিজের ওই নির্জলা মিথ্যায় নিজেই বিব্রত হয়ে এবং বলাশেভ এখনো ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে দেখে, হঠাৎ সম্পূর্ণ ঘুরে গিয়ে নেপোলিয়ন বলাশেভের মুখের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, এবং সাদা হাত দুটো ঘোরাতে ঘোরাতে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল :
ঠিক জানবেন, আপনারা যদি প্রশিয়াকে আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলেন তাহলে সে দেশকে আমি ইওরোপে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলে দেব! রাগে নেপোলিয়নের মুখ বিবর্ণ ও বিকৃত, এক হাত দিয়ে আর একটা হাত ঠুকছে। হ্যাঁ, আমি আপনাদের দিনা ও নিপারের ওপারে ছুঁড়ে ফেলে দেব, এবং অন্যায়ভাবে অন্ধের মতো ইওরোপ যে প্রাচীরটাকে (অর্থাৎ একটি বড় পোলিশ রাজ্য) ধ্বংস হতে দিয়েছিল সেটাকে নতুন করে গড়ে তুলব। হ্যাঁ, আপনাদের ভাগ্যে তাই ঘটবে। আমার সঙ্গে শত্রুতা করে এই তো আপনাদের লাভ! নিঃশব্দে সে বারকয়েক ঘরের এদিক থেকে ওদিকে হাঁটতে লাগল।
নস্যিদানিটা ওয়েস্টকোটের পকেটে ভরল, আবার বের করল, বারকয়েক নাকের কাছে তুলে ধরল, তারপর বলাশেভের সামনে থামল। একটু চুপ করে থেকে ব্যঙ্গের দৃষ্টিতে সোজা বলাশেভের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল :
একটা জবাব দেওয়া অবশ্য কর্তব্য মনে করেই বলাশেভ বলল যে, রাশিয়ার দৃষ্টিতে কিন্তু অবস্থাটা এত শোচনীয় বলে মনে হচ্ছে না। রাশিয়া আশা করছে, যুদ্ধের ফল খুব ভালোই হবে। নেপোলিয়ন মাথা নাড়ল, যেন বলতে চাইল, আমি জানি একথা বলা আপনার কর্তব্য, কিন্তু আপনি নিজেই কথাটা বিশ্বাস করেন না। আমি আপনাকে আমার মতেই আনতে পেরেছি।
বলাশেভের কথা শেষ হলে নেপোলিয়ন আবার নস্যিদানিটা বের করল, এক টান নিল, তারপর ইঙ্গিতস্বরূপ দুইবার মেঝেতে পা ঠুকল। দরজা খুলে গেল, জনৈক অভ্যর্থনাকারী সসম্মানে নত হয়ে সম্রাটের টুপি ও দস্তানা তার হাতে তুলে দিল, আর একজন এনে দিল একটা রুমাল। তাদের দিকে না তাকিয়ে নেপোলিয়ন বলাশেভের দিকে ঘুরে দাঁড়াল :
আমার হয়ে সম্রাট আলেক্সান্দারকে আশ্বাস দিয়ে বলবেন যে আমি আগের মতোই তার প্রতি অনুরক্ত আছি, আমি তাকে ভালোভাবেই চিনি, তাঁর মহৎ গুণাবলীকে খুবই শ্রদ্ধা করি। আর আপনাকে আটকে রাখব না সেনাপতি, সম্রাটকে লেখা আমার চিঠি আপনি পাবেন।
নেপোলিয়ন দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল। অভ্যর্থনা-ঘরের প্রতিটি লোক ছুটে এসে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগল।
.
অধ্যায়–৭
যেসব কথা নেপোলিয়ন তাকে বলেছে-সেইসব ক্রুদ্ধ আস্ফালন এবং নীরস গলায় উচ্চারিত শেষ কথাগুলি : আর আপনাকে আটকে রাখব না সেনাপতি, আমার চিঠি আপনি পাবেন, তা থেকে বলাশেভের ধারণা হয়েছিল যে নেপোলিয়ন আর তার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছুক নয়, একজন অপমানিত দূত হিসেবে তাকে এড়িয়েই চলবে। কিন্তু দুরক-এর মারফৎ সেইদিনই সম্রাটের সঙ্গে ডিনারের নিমন্ত্রণ পেয়ে বলাশেভ খুবই অবাক হয়ে গেল।
